হঠাৎ আরশেদ মোল্লা ও তার মেয়ের খোঁজ খবর নেয়ার প্রয়োজন বোধ করে জঙ্গুরুল্লা। মোল্লাকে সে দেখেনি অনেকদিন। খুনের চর থেকে বিতাড়িত কোলশরিকদের মাঝেও তাকে দেখেছে বলে মনে পড়ে না তার। কোরবান ঢালী তার সামনেই বসে ছিল। তাকেই জিজ্ঞেস করে সে, মাইরের দিন আরশেদ মোল্লা কি চরে আছিল?
হ আছিল। ভ্যাদাডা পলাইতে পারছিল না? ওরে চুবাইয়া এক্কেরে আধামরা কইর্যা ফালাইছিল।
অ্যাঁ, কও কি! এই কথাডাতো আমারে কয় নাই কেও।
আমি ও জানতাম না হুজুর, আইজই হুনছি।
কে চুবাইল? জামাই বুঝিন হউরের লাগুড় পাইয়া শোধ নিছে? চুবাইয়া হ্যাঁ-দফা ঘড়াইয়া দিছে?
কে চুবাইছে, হুনি নাই।
ভ্যাবলাডা কই এহন? বাইন্দা রাখে নাই তো?
না ওগ আতে পায়ে ধইর্যা, মাইয়া দিয়া আহনের ওয়াদা কইর্যা ছাড়া পাইছে।
অ্যাঁ, কও কি! ওয়াদা কইর্যা আইছে?
হ, আমার কানে কানে কইছে। আপনের কাছে কইতে মানা করছে।
ক্যান্? মানা করছে কিয়ের লেইগ্যা? মাইয়া কি দিয়া আইব নি?
হেইডা কয় নাই। তয় ওয়াদা যহন করছে–
ওয়াদা করছে তো জান বাঁচানের লেইগ্যা। তালাক দেওয়া মাইয়ারে দিয়া আইব ক্যামনে? তুমি শিগগির যাও। আরো পাঁজ-ছয়জন লইয়া যাও। মোল্লারে ধইর্যা উঁচুকাইয়া লইয়া আইবা আমার কাছে। আর শোন, ওর মাইয়াডারেও লইয়া আহো।
কোরবান ঢালী চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মজিদ খালাসি আসে।
কি ও খালাসি, কি খবর লইয়া আইছ?
হুজুর, থানায় ইজাহার নেয় নাই।
ইজাহার নেয় নাই! জঙ্গুরুল্লা রাগে ও উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায়।
তুমি খবর পাইলা কই? তোমারে তো থানায় পাই নাই।
ওনারা ডরে আপনের কাছে আহে নাই। আমারে খবর দিয়া পাডাইছে।
ইজাহার নেয় নাই ক্যান?
বড় দারোগা বিশ্বেস করে নাই।
ক্যান বিশ্বেস করে নাই?
তাতো কিছু ভাইঙ্গা কয় নাই। মনে অয় ঠিকমত মিল দিয়া কইতে পারে নাই।
রাগান্বিত জঞ্জুরুল্লা দাঁতে দাঁত ঘষে। বলে, এই হারামজাদারা কোনো কামের না। এই সামান্য কামডা ঠিক মতন কইর্যা আইতে পারল না। ইচ্ছা করে ওগ ভরতা বানাইয়া খাই। হারামজাদারা–
মাগরেবের আজান শোনা যায়।
জঙ্গুরুল্লা রাগে গরগর করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা হয়।
রাতের খাওয়া সেরে জঙ্গুরুল্লা যখন শোয়ার আয়োজন করছিল তখন বাইরে কোরবান ঢালীর গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। হুজুর, ঘুমাইয়া পড়ছেন নি? আমরা আইছি।
জঙ্গুরুল্লা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, মোল্লারে লইয়া আইছ?
না হুজুর, আরশেদ মোল্লা বাড়ি নাই। কোথায় গেছে বাড়ির কেও কইতে পারে না।
কবে আইব?
তাও কেও কইতে পারে না।
তার মাইয়া লইয়া আইছ?
না হুজুর। আরশেদ মোল্লা নাই, এমুন অবস্থায় তার মাইয়া আনি ক্যামনে?
আইচ্ছা বাড়ি যাও। কাইল সকাল বেলা আমার লগে দেখা কইর্য।
জঙ্গুরুল্লা পালঙ্কের বিছানায় শুয়ে পড়ে।
আরশেদ মোল্লার মাইয়ারে আনতে কইছিল কিয়ের লেইগ্যা? পাশে শোয়া দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শরিফন জিজ্ঞেস করে।
তুমি ওই সব বোঝবা না।
বুঝমু না ক্যান্? সুখের গাঙ্গে বুঝিন রসের জোয়ার লাগছে, রঙ্গের ঢেউ উথালপাথাল করতে আছে?
উঁহু, নাগো, দুখের গাঙ্গে এখন বড় তুফান। ঐ সব কথা বাদ দ্যাও। তুমি আমার রান দুইডারে টিপ্যা দ্যাও জোরে জোরে। রানের মইদ্যে বড় চাবাইতে শুরু করছে।
শরিফন ওঠে। স্বামীর পা টিপতে টিপতে বলে, মাইয়াডা বোলে পরীর মতন খবসুরত?
শরিফনের কথা কানে যায় না জঙ্গুরুল্লার। তার মনে তখন নানা দুশ্চিন্তার ভিড় জমতে শুরু করেছে।
আরশেদ মোল্লা কি সত্যি ওয়াদা পালন করবে? ফজলের ঘরে দিয়ে আসবে তার মেয়েকে? তা কি করে হয়! তালাক দেয়া মেয়ে আগের স্বামীর ঘর করবে কেমন করে? এটা যে শরিয়তের বরখেলাপ।
পীরবাবার জাদু-টোনার কি কোনো আছর পড়েনি মেয়েটার ওপর? ফজলকে জেলে ঢুকাবার একটা বড় সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল। ওকে কি ভাবে আবার জেলে ঢোকানো যায় ।
.
২৮.
সে দিনের সে গানটি ফজলের মনে গেঁথে রয়েছে। সে একাকী বসে থাকলে বা শুয়ে জেগে থাকলে সমস্ত ভাবনা-চিন্তা ছাপিয়ে গানটির গুঞ্জরণ শুরু হয় তার মনের মধ্যে। দেহের সমস্ত তন্ত্রী নেচে ওঠে সুরের ঝঙ্কারে। সে নিজেও গুনগুন করে গায় গানের কয়েকটা কলি। কখনো কলাগাছের ফাঁক দিয়ে রূপজানের বিষণ্ণ মুখ, কখনো কাশবনের ফাঁক দিয়ে জরিনার অশ্রুসজল চোখ ধরা পড়ে তার মনের চোখে। দুজনই তাকে ভালোবাসে। দুজনই তার চোখে এক ও অভিন্ন, যেন এক দেহে লীন হয়ে গেছে দুটি নারী।
ভাওর ঘরে শুয়ে আছে ফজল। তার পাশে ঘুমিয়ে আছে নূরু। পাশের আরেকটা ভাওর ঘরে বরুবিবি ও আমিনা ঘুমিয়ে আছে।
সারাটা দিন খুবই খাটুনি গেছে। ভাটিকান্দি থেকে ঘর-দরজা ভেঙে সে নিয়ে এসেছে খুনের চর। কাল ভোরেই আবার শুরু হবে ঘর তৈরির কাজ। এক দিনের মধ্যে ঘরগুলো খাড়া করতে হবে। এজন্য তিনজন মিস্ত্রি ঠিক করেছে সে। জন চল্লিশেক কোলশরিকও কাজ করবে মিস্ত্রিদের সাথে।
রাত অনেক হয়েছে। গতদিনের খাটা-খাটুনিতে ফজল ক্লান্ত, অবসন্ন। ঘুমে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। কিন্তু তবুও তার মনের ভেতর চলছে গানের গুঞ্জরন,–সেথায় বধূ থাকে।
এক সময়ে গানের গুঞ্জরণ থেমে যায়। ফজল ঘুমিয়ে পড়ে।
…কাশবনের ভেতর দিয়ে কলসি কাঁখে এক যুবতী নারী ললিতগতিতে এগিয়ে আসছে নদীর পাড়ে। তার পরিধানে কমলা রঙের শাড়ি। কে এ নারী? রূপজান, না জরিনা? দূর থেকে চিনতে পারছে না ফজল। সে ডিঙির মাথিতে বসে বৈঠা টানছে। কলসিটা পাড়ে রেখে যুবতীটি কোমরে জড়িয়ে নেয় শাড়ির আঁচল। কলসিটা বাঁহাতে তুলে সে পানিতে নামে। কলসিটায় বুকের ভর দিয়ে সে এবার পা ছড়িয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করে। হঠাৎ তার চিৎকার শুনতে পায় ফজল। সে দেখতে পায়, যুবতীটি কলসির গলা জড়িয়ে ধরে ভেসে থাকবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিসে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। নিশ্চয়ই কুমির টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ফজল জোরে জোরে বেঠা টেনে এগিয়ে যায়। কলসিটা একদিকে কাত হয়ে ছুটছে মাঝনদীর দিকে। মাঝে মাঝে ওটা ডুবে যাচ্ছে। যখন ভেসে উঠছে তখন ওটার গলা জড়িয়ে ধরা কনুই ও একগোছা চুল শুধু দেখতে পায় ফজল। সে বৈঠাটা দু’হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে কুমিরের সম্ভাব্য অবস্থানের দিকে তাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি লাগে ফজলের সারা দেহে। তার মাথাটা ধপ করে পড়ে বালিশের ওপর।
