না হুজুর, চর দখলের ঘটনা না।
তবে ঘটনাটা কি?
হুজুর, এই তালেবালীর ঘরে আগুন লাগাইছে।
আগুন লাগিয়েছে! কারা লাগিয়েছে, দেখেছ তোমরা?
হ, হুজুর।
আচ্ছা।
বড় দারোগা দু’জন সেপাই ডাকেন। দবির গোরাপি ও জাফরকে দেখিয়ে বলেন, তোমরা দুজন এদের নিয়ে যাও। একজন যাও পুকুরের উত্তর পাড় আর একজন যাও দক্ষিণ দিকে পুলের ওপর। এদের সাথে গপগপ করো গিয়ে। আমি একজন একজন করে ডাকব।
বড় দারোগা ঘটনার বিবরণ শোনেন তালেবালীর কাছ থেকে। তাকে জেরা করেন অনেকক্ষণ ধরে। তারপর জাফর ও দবির গোরাপিকে এক এক করে জেরা করেন। জেরা শেষ হলে তিনি বলেন, কি মিয়ারা, মামলাটা ঠিকমত সাজিয়ে আনতে পারোনি? বাদী বলছে তার পশ্চিম-ভিটি ঘরে বগি পাট ছিল পাঁচমন। ঘর আর সব পাট পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সে ফজল ও আরো চারজন আসামির নাম বলেছে। আরো চার-পাঁচ জন ছিল, তাদের চিনতে পারেনি। সে দুটো নৌকায় আসামিদের পালিয়ে যেতে দেখেছে। তার কাছে টর্চলাইট ছিল না। রাতের অন্ধকারে সে আসামিদের চিনল কেমন করে? দবির গোরাপি বলছে–তালেবালীর ঘরে দশমন নালতে পাট ছিল। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ডাক চিৎকার শুনে সে টর্চ নিয়ে বেরিয়েছিল। সে একটা নৌকায় আসামিদের পালিয়ে যেতে দেখেছে। সে ফজল ও আরো চারজন আসামির নাম বলেছে। কি তাজ্জবের কথা! তালেবালী যাদের দেখেছে দবির গোরাপিও ঠিক তাদেরই দেখেছে। আর কাউকে চিনতে পারেনি। দুজনের চোখ যেন পরামর্শ করেই ঐ কয়জন আসামিদের ওপর দৃষ্টি ফেলেছিল। তালেবালী বলছে–নয়-দশ জন আসামির মধ্যে দু’জনের দাড়ি ছিল। অথচ দবির গোরাপি বলছে–চারজনের দাড়ি ছিল। তালেবালী যে আউশ ধান পেয়েছিল তা ভাদ্র মাসেই খেয়ে শেষ করেছে। ভাদ্রমাস থেকেই সে চাল কিনে খাচ্ছে। আর দবির গোরাপি যে আউশ ধান পেয়েছিল তা এখনও খেয়ে শেষ করতে পারেনি। অথচ দবির গোরাপি পাট বেচে দিয়েছে ভাদ্র মাসেই। তার ঘরে পাট নেই। অন্য দিকে তালেবালীর টানাটানির সংসার। সে পাট মজুদ রেখেছে বেশি দাম পাওয়ার জন্য। ব্যাপারটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারপর জাফর বলছে ঘটনার বিবরণ ও সাতজন আসামির নাম সে তালেবালীর কাছে শুনেছে। বাড়তি দু’জনের নাম জাফর পেল কোথায়? তালেবালী তত কুল্লে চিনেছে পাঁচজনকে। কী মিয়া জাফর, দু’জনের নাম পেলে কোথায়?
হুজুর, তালেবালী আমার কাছে সাতজনের নামই কইছিল। ভয়ে জাফরের গলা কাঁপছে। তার শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে।
বড় দারোগা হক দেন, অ্যাই কে আছ?
দু’জন সেপাই এসে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ায়।
বড় দারোগা নির্দেশ দেন, এই তিনজনকে হাজতে ঢুকাও। মিথ্যা এজাহার দিতে আসার মজাটা দেখাচ্ছি।
জাফর হাতজোড় করে, হুজুর, কী কইতে কী কইয়া ফালাইছি–
আমিও কী করতে কী করে ফেলি, টের পাবে এবার। মিথ্যাকে খোলস পরিয়ে সত্য বানানো যায় না। অ্যাই, তোমরা দাঁড়িয়ে আছ কেন? নিয়ে যাও এদের হাজতে।
জাফর ও দবির গোরাপি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা ভয়ে কাঁপছে থরথর করে।
তালেবালী বড় দারোগার পা জড়িয়ে ধরে বলে, হুজুর মাপ কইরা দ্যান। মাইনষের কথায় আর কান দিমু না, আর কোনো দিন থানায় আইমু না।
পা ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য বড় দারোগা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। বলেন, আরে ছাড়ো, ছাড়ো, পা ছাড়ো। এই সেপাইরা, দাঁড়িয়ে দেখছ কি?
সেপাই দু’জন তালেবালীর হাত ধরে টেনে তোলে।
যাও, এই শয়তানের বাচ্চা তিনটাকে আমার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দাও থানা থেকে।
গলাধাক্কা দেয়ার আর প্রয়োজন হয় না। তিনজনই দ্রুত থানা থেকে বেরিয়ে যায়।
.
২৭.
চর অঞ্চলের লোক যা কোনোদিন করেনি, করতে সাহস পায়নি, তাই করছে জঙ্গুরুল্লা চৌধুরী। সে চৌধুরীর চরে নিজের বাড়ি থেকে অল্প দূরে দক্ষিণ দিকে তার পীরবাবার জন্য দেয়াল ঘেরা তিন কামরার পাকা বাড়ি তৈরি করছে। দেয়ালের বাইরে তৈরি করছে খানকাশরিফ।
প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্য সে কোনো দিনই ইটের বাড়ি বানাতে সাহস করেনি। সে প্রায়ই বলত, ইট মানেই মাটি। এই মাটির ঘরেরতন টিনের ঘর অনেক ভালো। রাইস্যা গাঙ থাবা দিলে টিনের ঘর ভাইঙ্গা-চুইর্যা আরেক খানে গিয়া আবার বসত করণ যায়। আর ইটের ঘর? ইটের ঘর ভাঙলেই বেবাক মাটি। ভাঙ্গন শুরু অইলে এই মাটির ঘর চিৎ-কাইত অইয়া রসাতল অইয়া যাইব।
পীরবাবা বুজুর্গ আদমি, আল্লার খাস বান্দা, পিয়ারা দোস্ত। তার খানকাশরিফ, তার মহল খোদ আল্লাই হেফাজত করবেন–এই দৃঢ় বিশ্বাসই জঙ্গুরুল্লার বুকে হিম্মত দিয়েছে ইটের বাড়ি তৈরি করবার। পীরবাবাকে তো আর তাদের মতো টিনের ঘরে মাটির মেঝেতে বাস করার কথা বলা যায় না।
তার আরো বিশ্বাস-পীরবাবা এ চরে বসত করলে রাক্ষুসে নদী এ চরের ওপর তার সর্বনাশ থাবা দিতে সাহস করবে না।
বিকেল বেলা সূর্যের দিকে পিঠ দিয়ে জলচৌকির ওপর বসে জঙ্গুরুল্লা রাজমিস্ত্রিদের কাজ দেখাশুনা করছিল আর হুঁকো টানতে টানতে ভাবছিল অনেক কিছু।
খুনের চর হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই কার্তিক মাসের পরেই অগ্রহায়ণ মাসের শেষ নাগাদ এই চরের ধান পাকবে। তার আগেই কলে-কৌশলে চরটা আবার দখল করতে হবে। যুদ্ধের দরুন ধান-চালের দাম লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে। গোলার ধান আরো কয়েক মাস রেখে দিলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। আমনের মরশুমে দুই-তিন হাজার মণ চাল কিনে রাখলে অনেক মুনাফা হবে। চাল রাখার জন্য একটা গুদামঘর বানানো দরকার। কিন্তু টিন পাওয়া যাচ্ছে না। টাটা কোম্পানী এখন নাকি যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরি করতে ব্যস্ত। টিন আর তৈরি করছে না। অনেকে অভাবে পড়ে ঘর বিক্রি করছে। দু-চারটে ঘর কিনতে পারলে গুদামের জন্য প্রয়োজনীয় টিন পাওয়া যাবে। পীরবাবা আর মাসখানেক পরেই এসে পড়বেন। তাই বাড়ি তৈরির কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। আরশেদ মোল্লার মেয়ের সাথে পীরবাবার শাদিমোবারক সহি-সালামতে সম্পন্ন করতে পারলেই তার মনে লালিত অনেক দিনের আরজু পুরো হয়। কিন্তু তার আগে ফজলকে আবার জেলে ঢোকাতে হবে। গুলি-খাওয়া বাঘ খাঁচায়। ঢুকাতে না পারলে স্বস্তি নেই। ও বাইরে থাকলে চর দখল করা কঠিন হবে। আর শুভ কাজের সময় সে কী যে করে বসে বলা যায় না।
