হ, এইডাই ঠিক। জাবেদ লশকর বলে। জমিরদ্দির দাঁড়াইশ্যা ডিঙিখান তৈয়ার থাকব সব সময়। পাঁচজন বাইছাও ঠিক কইর্যা রাখন লাগব।
আচ্ছা, আপনাগ রায় মাইন্যা নিলাম। ফজল বলে। আর শোনেন, ভাটিকান্দি ছাইড়্যা আমি চইল্যা আসমু এই চরে। তিন-চারদিনের মইদ্যে ঘর-দরজা ভাইঙ্গা মাল-সামান লইয়া এই চরে আইস্যা বসত করমু। আর কেও যদি এই চরে আইতে চান, আইতে পারেন। দারোগা-পুলিস আসার ইশারা পাইলেই হাতিয়ারগুলা ধানখেতের ভিতর গুঁজাইয়া রাখতে অইব।
অন্য চরে যাদের জমাজমি নেই তারা সবাই এই চরে এসে বসত করাই উচিত কাজ মনে করে। তারাও কয়েক দিনের মধ্যেই ঘর-দরজা ভেঙে বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলে আসবে।
.
২৬.
আগুন দেখে ফজলের দল ঠিকই অনুমান করেছিল–ওটা জঙ্গুরুল্লার কারসাজি। খুনের চর থেকে বিতাড়িত হয়ে কোলশরিকরা জঙ্গুরুল্লার বাড়ি গিয়ে হাজির হয় সন্ধ্যার পর। ওদের দেখে কিছু বলার আগেই সে বুঝতে পারে, খুনের চর বেদখল হয়ে গেছে। রাগের তীব্রতায় তার মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না। তার ক্রুদ্ধ ঘূর্ণায়মান চোখ দুটোয় আগুন জ্বলছে। সে চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে মিইয়ে যায় সবাই। তাদের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করতে থাকে।
কিছুক্ষণ পরে খেঁকিয়ে ওঠে জঙ্গুরুল্লা, হারামজাদা শুয়রের বাচ্চারা, চরের দখল ছাইড়া দিয়া আইছস? খুন কই? জখম কই? একটা হারামজাদার গায়েও তো একটা কোপের দাগ নাই। কিরে লাশ ফালাইয়া থুইয়া আইছস?
দবির গোরাপি ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলে, না হুজুর, কেও খুন অয় নাই।
খুন অয় নাই! তয় তোরা মাইর করস নাই? ওগ দেইখ্যা ডরে চর ছাইড়্যা পলাইয়া আইছস?
না, হুজুর, মাইর করছি।
মাইর করলে খুন-জখমতো অইত? তার আলামত কই? দুই চাইডারে খুন কইর্যা, লাশ লইয়া থানায় গিয়া ইজাহার দেই।
সাহস সঞ্চয় করে দবির গোরাপি ও মজিদ খালাসি মারামারির বিস্তারিত বিবরণ দেয়। জঙ্গুরুল্লা প্রথমে শুনতে চায়না তাদের কথা। প্রতিপক্ষের অভিনব কায়দা-কৌশলের কথা শুনেই সে মনোযোগ দেয়। তাদের বিবরণ শেষ হলে জঙ্গুরুল্লা বলে, হুনছি রামদাওয়ালা চাকইর্যা আছে দক্ষিণে, ভাটির মুলুকে। কিন্তু আঁউকড়া আর চোরাপাতা দিয়া এম্বায় লবজান করার কথা তো শুনি নাই কোনো কালে। চাকইর্যাগ চিনতে পারছনি?
না, ক্যামনে চিনমু। মজিদ খালাসি বলে। কাইলামতো, চাকইর্যারা আর দলের অনেকেই মোখা লাগাইয়া আইছিল।
ফউজ্যারে দ্যাখছ নি? ওকি জেলের তন ছাড়া পাইয়া আইছে?
তারে দেহি নাই। দবির গোরাপি বলে।
তোমরা কেও দ্যাখছ নি মিয়ারা? কোলশরিকদের দিকে চেয়ে বলে মজিদ খালাসি।
ফজলকে কেউ দেখেনি। তবে দু’-তিন জন নাকি তার গলার আওয়াজ শুনেছে।
তোমরা খোঁজ খবর নেও। জঙ্গুরুল্লা বলে। গোরাপি আর খালাসি এইখানে থাইক্য, কথা আছে। তোমরা কয়েকজনরে পাড়াইয়া দ্যাও খবর আনতে–ফউজ্যা জেলেরতন আইছে, না আহে নাই? রাইত দুফরের আগে পাক্কা খবর চাই। আর বাকি সবাই বাড়িত যাও। চর দখলের ব্যবস্থা কইর্যা তোমাগ খবর দিমু।
দবির গোরাপি ও মজিদ খালাসি ফজলের খবর সংগ্রহের জন্য দুখানা নৌকায় ছ’জনকে পাঠিয়ে দেয় দুদিকে। তারা বুঝতে পারে প্রতিপক্ষের জোয়ান পুরুষরা আজ বাড়িতে নেই কেউ। সবাই গেছে খুনের চরে। একদল ঘটক সেজে ফজলের বোনের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে সোজা চলে যাবে ভাটিকান্দি–ফজলদের বাড়ি। কথায় বের করে আনবে ফজলের খবর। অন্য দলটি যাবে জাবেদ লশকরের বাড়ি। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কোনো অছিলায় ফজলের খবর বের করে আনবার চেষ্টা করবে।
দবির গোরাপি ও মজিদ খালাসি ফিরে এসে দেখে জঙ্গুরুল্লা হুঁকোর নল মুখে দিয়ে চোখ বুজে কি যেন ভাবছে। তার পা টিপছে চাকর। তার থমথমে গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস হয় না তাদের।
জঙ্গুরুল্লা হুঁকোয় টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। চোখ মেলে গোরাপি আর খালাসিকে দেখতে পেয়ে বলে, ফউজ্যার খবর আনতে মানুষ পাডাইছ?
হ, দুইদল দুইখানে পাডাইছি। দবির গোরাপি বলে।
শোন, তোমরা আমার ইজ্জতটা এক্কেরে গরবাদ কইর্যা দিছ। চর দখলের মাইরে আমার দল কোনোদিন হারে নাই। আমার দখল করা চরে কোনো ব্যাডা আইতে সাহস করে নাই। আর এইবার কি কারবারডা অইয়া গেল!
এহন কি করতে চান হুজুর? মজিদ খালাসি বলে ।
ওরা মনে অয় বাছাবাছা চাকইর্যা আনছে ভাটি মুলুকতন। আমরা আর মাইর দাঙ্গার মইদ্যে যাইমু না। কলে কলে চাবি দিয়া কল ঘুরাইতে অইব। শোন, ওগ বিরুদ্ধে ঘর পোড়নের মামলা দিমু।
ঘর পোড়নের মামলা!
হ, ঘর পোড়নের মামলা। দশ-বারো জনরে দিমু আসামি। ফউজ্যা জেলেতন আইলে ওরে দিমু এক লম্বর আসামি। তোমরা একটা ঘর ঠিক কর। ঐ ঘরে আগুন দিয়া ঘরের মালিক ডাকচিক্কইর দিব। ঐ ডাক-চিক্কইর শুইন্যা তোমরা এই চর ওই চরের কয়েকজন দেখবা– ঘরে আগুন দিয়া নাও বাইয়া পলাইয়া যাইতেছে ওগ দশ-বারো জন। ইজাহারে আরো কইতে
অইব, ঘরে পাট আছিল।
জঙ্গুরুল্লার পরামর্শে তারই কুমিরডাঙার কোলশরিক তালেবালী নিজের কুড়েঘরে আগুন দেয়।
ফজল জেল থেকে খালাস পেয়ে এসেছে, খবরটা পেলেই জঙ্গরুল্লা রাত দুপুরের পর তালেবালীর সাথে তার বড় ছেলে জাফর ও দবির গোরাপিকে পাঠিয়ে দেয় থানায়।
তারা থানায় পৌঁছে বেলা নটারও পরে। থানার বড় দারোগা জাফরকে দেখেই চিনতে পারেন। বলেন, কি মিয়া নতুন চর জেগেছে বুঝি? কারা দখল করেছে? নাম বলো। সব ক’টার মাজায় রশি বেঁধে নিয়ে আসি।
