হঠাৎ একটা শোরগোল শোনা যায়।
সবাই সচকিত হয়ে এদিক ওদিক তাকায়। তারা দেখতে পায়, চরমান্দ্রার অনেক পুবে, কোনো একটা চরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লেলিহান জিভ লকলক করে উঠছে আকাশে।
তোমরা বোঝতে পারছনি, ব্যাপারখান কি? জাবেদ লশকর বলে। কী মনে অয় তোমাগ?
এইডা জঙ্গুরুল্লার কারসাজি। রমিজ মিরধা বলে। নিজেগ ঘরে আগুন লাগাইয়া আমাগ বিরুদ্ধে থানায় ইজাহার দিব।
তুমি ঠিকই ধরছ। জাবেদ লশকর বলে। জঙ্গুরুল্লা ঐবার নাহক ডাকাতি মামলায় আমাগ আসামি দিয়া চর দখল করছিল। এইবার আবার ঘর পোড়নের মামলা দিয়া পুলিস সুলাইয়া দিব আমাগ ধরতে।
জাবেদ লশকর নিচু গলায় বলে, একটা কাম করলে অয়। কিন্তু বেবাকের সামনে কওন যাইব না।
চলেন ঘরে গিয়া বসি।
ও মিয়ারা তোমরা গিয়া পাত পাইত্যা বস। মনে অয় খিচুড়ি এতক্ষণে রান্দা অইয়া গেছে।
হ, তোমরা যাও। আমরা আইতে আছি।
ফজল একটা হারিকেন হাতে করে পুলকি মাতব্বরদের নিয়ে তাদের ভাওর ঘরে গিয়ে বসে।
বলেন, কি বলতে চাইছিলেন? ফজর উৎসুক হয়ে তাকায় জাবেদ লশকরের দিকে।
সে চাপা গলায় বলে, আমরাও একটা ঘরে আগুন লাগাইয়া ওগ নামে ইজাহার দিমু।
উঁহু, এইডা ঠিক অইব না।
কী যে কও তুমি! জানো না, বিষ দিয়া বিষ মারতে অয়? কাডা দিয়া কাডা খুলতে অয়?
তা তো জানি। কিন্তু ডাহা মিথ্যারে সত্য বইল্যা প্রমাণ করতে পারবেন?
ক্যান্ পারমু না? ওগ পিঠে আমাগ গুলির দাগ আছে না?
হ, কিছু লোকের শরীরে গুলিতো লাগছিলই।
হোন, আমরা এই বুইল্যা ইজাহার দিমু-অমুক, অমুক, অমুক, আরো দশ বারোজন আমাগ ঘরে আগুন লাগায়। আমরা টের পাইয়া যখন গুলাইল মারতে শুরু করি তখন ওরা দুইডা শড়কি ফালাইয়া ভাইগ্যা যায়। আমাগ গুলির দাগ আছে ওগ শরীলে।
ওরা দিব ঘর পোড়ার ইজাহার, আমরাও যদি ঘর পোড়ার পাল্টা ইজাহার দেই তা দারোগা বিশ্বেস করব না। রমিজ মিরধা বলে। তার চাইয়া ডাকাতির মামলা সাজাও। জঙ্গুরুল্লার দুই পোলা ও আরো দশ বারোজন রামদাও শড়কি লইয়া ডাকাতি করতে আইছিল। আমাগ গুলাইলের গুলি খাইয়া একটা রামদাও আর দুইডা শড়কি ফালাইয়া ওরা ভাইগ্যা যায়। ওগ শরীলে আমাগ গুলির দাগ আছে।
ইজাহার দেওয়া সোজা। ফজল বলে। সাক্ষী-সাবুদ দিয়া প্রমাণ করা বড় কঠিন। জোরে কচ্লান দিলে কোন্টা সত্য, কোটা মিথ্যা বাইর অইয়া পড়ে। মাইনষে কইতেই কয়–সাচ্চা গুড় আন্ধার রাইতেও মিডা।
তা অইলে কী করতে চাও? আমাগই খালি পুলিস দিয়া অয়রান করব আর আমরা চুপ কইর্যা সইজ্য করমু।
আমাগ হয়রান করতে ওরাও হয়রান অইয়া যাইব, ওগ টাকার শেরাদ্দ অইব। আমরা এত টাকা খরচও করমু না, আর মাইনষের নাহক হয়রানির মইদ্যেও ফেলমু না। শোনেন, আমাগ কোলশরিক যারা পাতনা দিয়া আছে অন্যের জাগায়, তারা এই রাইতের মইদ্যে বউ পোলাপান, হাঁস-মুরগি, গিরস্থালির বেবাক মাল-সামান লইয়া আইব এই চরে। ভাওর ঘরে গিরস্তালি শুরু করব। যার যার গরু-বাছুর কাইল সকালের মইদ্যে আইন্যা বাইন্ধা থুইব ঐ বাথানে। দারোগা-পুলিস আইলে যেন বুঝাইয়া দিতে পারি, এই চর আমাগ। আমরা ধান। লাগাইছি, কলাগাছ লাগাইছি। বাপ-দাদার আমলতন এই জা’গার চর আমাগ। এইখানে কতবার চর জাগছে, কতবার ভাঙছে। কিন্তু আমরা সব সময় খাজনা চালাইয়া আইছি। আমাগ পর্চা-দাখিলা আছে। জঙ্গুরুল্লার কি আছে? পারব কোনো কাগজ দেখাইতে?
না, ওরা কাগজ দেহাইব কইতন? মেহের মুনশি বলে। হুনছি বিশুগাঁয়ের রায়চদরীগ তিন বচ্ছরের খাজনা দিয়া আমলদারি নিছে জঙ্গুরুল্লা। দেহাইলে ঐ আমলদারি আর খাজনার দাখিল দেহাইতে পারে। কিন্তু আগের আমলের কোনো কাগজ দেহাইতে পারব না।
রায়চৌধুরীগ কান্দার চর তো আছিল অনেক দক্ষিণ-পশ্চিমে। সেই চর তো ভাইঙ্গা গেছে ছয়-সাত বছর আগে। জমিদারগ শয়তানি দ্যাখেন না। নিজেগ চরের নাম-নিশানা নাই। তবু তারা আমলদারি দিছে জঙ্গুরুল্লারে। সে এখন আমাগ চর খাবলা দিয়া নিতে চায়।
হ, জমিদাররা এম্বায়ই যত আউল-ঝাউল লাগায় আর আমরা মারামারি কইর্যা মরি।
শোনেন, দারোগা-পুলিস কাইল পরশুর মইদ্যে আইসা পড়ব মনে হয়। খবরদার কেও যেন চর ছাইড়া না পালায়। কয়জনরে আর ধরব! ফজল বলে।
কিন্তু মিয়া, পুলিস আইলে তুমি এট্টু সইর্যা থাকবা। কদম শিকারি বলে। তোমারে ধইর্যা নিলে এই চর রাখন যাইব না। তুমি পরে আদালতে আজির অইয়া জামিন লইয়া আইতে পারবা।
কদম শিকারির প্রস্তাবে সায় দেয় সবাই। কিন্তু ফজল আমতা আমতা করে। সে বলে, আপনাগ পুলিসে ধইর্যা লইয়া যাইব আর আমি পলাইয়া থাকমু?
হ, পুলিস আইলে তুমি সইর্যা থাকবা। জাবেদ লশকর বলে।
লড়াইয়ের সময় সেনাপতি থাকে বেবাকের পিছনে। তারে রক্ষা করে সিপাই লশকররা। তুমি আমাগ সেনাপতি। তোমারে রক্ষা করণ আমাগ ফরজ।
হ, তুমি রক্ষা পাইলে আমরাও রক্ষা পাইমু। মেহের মুনশি বলে।
দারোগার পানসি দূরের তন দ্যাখলেই চিনা যায়। চাইরদিগে আমাগ পাহারাদার থাকব। তারা নজর রাখব সব সময়।
হ দারোগার নাও দ্যাখলেই চিক্কইর দিব। রমিজ মিরধা বলে। ষাড়েরে যেমুন কইর্যা মাইনষে ডাক দেয় তেমুন কইর্যা ডাক দিব–মোল্লাকে ডাক্ কুরুত্। আবার গামছা উড়াইয়া ইশারাও দিব।
হ, ইশারা ধরনের লেইগ্যা পালা কইর্যা এক জনের পর আরেক জন ভাওর ঘরের কাছে বইয়া চউখ রাখব চাইরদিগে।
