শোনেন, আঁউকড়াগুলা বেবাক টোকাইয়া রাখেন। চোত্রাগাছ গুলারে লাগাইয়া দ্যান এক জায়গায়। ভবিষ্যতে এগুলা কামে লাগব।
আমাগ নায়ের মইদ্যে ওগ বিস্তর গুলি পইড়া রইছে। কদম শিকারি বলে।
হ, ওগুলা টোকাইয়া একখানে করেন। আরো কিছু গুলি যোগাড় করতে অইব। ওরা কিন্তু দখলে আসার চেষ্টা করব। চাকইর্যা লইয়া হামলা করব। ওগ নাও দ্যাখলেই আমাগ নৌকার দল গুলাইল লইয়া ওগ এক পাশে গিয়া গুলি মারতে শুরু করব। আমরাও চরেরতন গুলি ছাড়মু। দুই দিগের গুলি ওরা ঢাল দিয়া ফিরাইতে পারব না। চাকইর্যারা কিন্তু বেশির ভাগ বইস্যা বইস্যা আউগ্গায়, হাতিয়ার চালায়। ওগ কাবু করণের লেইগ্যা আঁকড়ার ঝাঁপটা মারতে অইব ওগ মাথায় আর পিঠে।
আমাগ কিছু চাকইর্যা আইন্যা রাখন দরকার। রমিজ মিরধা বলে। ট্যাহাতো আছেই।
না। আর চাকইর্যা আননের দরকার নাই। ফজল বলে খামাখা টাকা খরচ করতে যাইমু কোন দুকখে? আমরা নিজেরাই ওগ হটাইয়া দিতে পারমু। কি কও জুয়ানরা পারবা না?
হ, পারমু। সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে কিশোর ও জোয়ানরা। জয়ের জোশে তারা উদ্দীপ্ত।
আপনারা আগে চাকইর্যার পিছে বেশুমার টাকা ঢালছেন। আর আমরা? আমরা অল্প খরচে কাম ফতে করছি।
কত ট্যাহা খরচ অইছে? জাবেদ লশকর জিজ্ঞেস করে।
খুব অল্প। রামদাও, ঢাল, টর্চলাইট আর এইডা ওইডা কিনতেই যা খরচ অইছে। কাইলই জগু পোদ্দারের দোকানে যাইবেন। গয়নাগুলা বেবাক ছাড়াইয়া লইয়া আইবেন।
হ, এইডা একটা কামের কাম অইব। মেহের মুনশি বলে।
হ, সুদ বড় জোর এক মাসের নিতে পারে। রমিজ মিরধা বলে।
এক মাসের সুদ আর আসল দিয়া গয়নাগুলা ফর্দের লগে মিলাইয়া ওজন কইর্যা লইয়্যা আইবেন। ফজল বলে।
হ, কাইলই গিয়া লইয়া আইমু। মেহের মুনশি বলে। বউ-ঝিগ দায়-দাবির তলে আর থাকন লাগব না।
কিন্তু মিয়া, এই চরে থাকতে গেলে খরচ লাগব না? ট্যাহা পাইবা কই? রমিজ মিরধা বলে।
টাকার লেইগ্যা ভাবনা নাই। ফজল বলে। আমাগ বানাগুলাতো আছেই। সবাইরে লাগাইয়া দ্যান মাছ ধরতে। বেড়ের মাছ বেইচ্যা খরচ চালাইতে অইব। আমাগ চাই, দোয়াইর, খাদইন, পারন, ঝাঁকিজাল, ধর্মজাল, ইলশাজাল, মইজাল–মাছ ধরনের যত সরঞ্জাম ঐবার থুইয়া গেছিলাম, ওগুলা ওরা এই চরেই থুইয়া গেছে। বেবাক বিচরাইয়া বাইর করেন। এগুলা দিয়া মাছ ধরনের ব্যবস্থা করেন?
তুমি কি আমাগ বেবাকটিরে জাউল্যা বানাইয়া দিতে চাওনি? শ্লেষ-মেশানো কণ্ঠে জাবেদ লশকর বলে।
কি যে কথা কন! পা-না-ধোয়ার কোলশরিকরা মাছ বেচে নাই? ওরাও তো বেড়ের মাছ বেইচ্যা সংসার চালাইছে। জঙ্গুরুল্লাও তো ঐ টাকার ভাগ নিছে। জাইত যাওনের ভয় খালি আপনাগ!
ফজলের সমর্থনে প্রায় সবাই গুঞ্জন করে ওঠে।
ফজল আবার বলে, আর শোনেন, ওরা কি কি জিনিস থুইয়া গেছে তার লিস্টি করেন। ঐগুলার মধ্যে আমাগ জিনিস, আমাগ হাতিয়ারও পাওয়া যাইব–যেগুলা আমরা ঐবার ফালাইয়া গেছিলাম। ঐগুলা আর ওগ তামাম হাতিয়ার আমরা রাইখ্যা দিমু। থালা-বাসন, লোটা-বদনা যা কিছু থুইয়া গেছে, সেগুলা কিন্তু রাখন যাইব না।
ক্যান্? ওরাতো আমাগ জিনিস ফিরত দেয় নাই। কোলশরিকদের কয়েকজন প্রতিবাদ করে।
ঐগুলার মালিকতো আপনাগ মতন গরিব কোলশরিকরা। ঐগুলা যদি জঙ্গুরুল্লার অইত, তয় ফিরত দেওনের কথা কইতাম না। আমরা খুদ খাইয়া পেট নষ্ট করতে যাইমু ক্যান? ঐগুলা একখানে কইর্যা রাইতের আন্ধারে ওগ চরে ফালাইয়া দিয়া আইবেন। আপনারা কয়েকজন চইল্যা যান। আন্ধার হওয়ার আগে সবগুলা ভাওর ঘর তালাশ কইর্যা দেখেন, কোন ঘরে কি আছে। পোলাপানরা তালাশ করুক ধানখেতে। ওগ হাতিয়ার, আমাগ আঁউকড়া–বেবাক বিচরাইয়া লইয়া আসুক। মারামারির সময় ধানের গাছ কিছু নষ্ট অইছে। আর যেন নষ্ট না হয়।
.
মাগরেবের নামাজের পর আবার সবাই জড় হয় ফজলের ভাওর ঘরের সামনে। তারা বিপক্ষ দলের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে আসে।
হারিকেনের আলোয় ফজল ও আরো কয়েকজন মিলে ফেরতযোগ্য জিনিসগুলো বেছে বেছে আলাদা করে। চাল-ডাল ইত্যাদি খাবার জিনিস ফেরত দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না তারা। কারণ তারাও পুলিসের ভয়ে পালাবার সময় অনেক খাবার জিনিস ফেলে গিয়েছিল এ চরে। চাল-ডাল-মশলাদি–যা ওরা রেখে গেছে তাতে বেশ কয়েকদিন চলে যাবে সকলের।
চর দখলের আনন্দে সবাই মেতে ছিল এতক্ষণ। খাবার কথা কারো মনেই হয়নি। চাল ডাল দেখে হঠাৎ খিদের তাড়না অনুভব করে সবাই। এক সাথে এত লোকের রান্না করার মতো বড় ডেগ নেই এখানে। ফজল দশটা চুলোয় দশ পাতিল খিচুড়ি রান্নার ব্যবস্থা করে। দিয়ে আবার এসে আলোচনায় বসে।
জাবেদ লশকর বলে, জঙ্গুরুল্লার মতন খুঁটগাড়ি আদায় করণ লাগব।
হ, ঘোঁজায় নানা মুলুকের নাও আইস্যা পাড়া গাড়ে। ধলাই সরদার বলে। খুঁটগাড়ি আদায় করতে পারলে অনেক ট্যাহা আমদানি অইব।
উঁহু। আমরা খুঁটগাড়ি আদায় করমু না। ফজল বলে।
ক্যান। এত বড় একখান আয়ের সুযোগ—
ঘোঁজায় নৌকা রাখে আশ্রয়ের লেইগ্যা। আশ্রয়ের বদলে কিছু আদায় করা ঠিক অইব না। আমরা যদি খুঁটগাড়ি আদায় করতে শুরু করি, তয় নৌকা আর একটাও এই ঘোঁজায় আসব না। মাঝিরা অন্য চরের কোনা-কাঞ্ছিতে গিয়া নাও রাখব। আপনাগ কাছেই তো শুনছি। রউজ্যার কাণ্ড। যদি ওর মতন ডাকাতি করতে পারেন, তবে ডাকাতির ভয়ে কিছু নৌকা আসতে পারে এই ঘোঁজায়।
