‘মা-র মা-র’ করে এগিয়ে আসছে ফজলের দল। জঙ্গুরুল্লার পলায়মান কিছু লোক গরুগুলোকে তাড়া দিয়ে নদীতে নামায়। গরুগুলো সাঁতার দিলে ওগুলোর লেজ ধরে একেক জন ভাটির টানে ভেসে যায় চরমান্দ্রার দিকে।
ফজলের একটা দল ঘোঁজার কিনারায় এসে বিপক্ষ দলের নৌকা লক্ষ্য করে গুলের বাঁশ থেকে কয়েকটা গুলি মারে। আর একদল পুব কিনারায় গিয়ে দুয়েকটা গুলি মারে গরুর লেজ ধরা লোকগুলোর দিকে।
গুলি মারার উদ্দেশ্য ভয় দেখানো। তারা বোঝে, পরাজিত পলায়মান শত্রুর পেছনে বেশি গুলি খরচ করা নিরর্থক।
ফজলের দলের সবাই ঘোঁজার কাছে এসে জমায়েত হয়। ফজল হাঁক দেয়, আল্লাহু আকবর।
দলের সবাই গলা ফাটিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার দেয়, আল্লাহু আকবর।
ফজল দলের চল্লিশ জনকে পাহারার জন্য চরের চার কিনারায় পাঠিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ শোনা যায়, ঐ গেল–গেল–গেল, ধর্–ধর্—ধর্।
সবাই তাকিয়ে দেখে দক্ষিণ দিকে যারা পাহারা দিতে যাচ্ছিল তারা ধাওয়া করছে দুটো লোকের পেছনে। প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে লোক দুটো পুবদিকে।
জাবেদ লশকর প্রকৃতির তাগিদ সেরে ঐ দিক থেকেই আসছিল। সে দেখে, দু’জনের একজন আরশেদ মোল্লা। সে মোল্লাকে তাড়া করে দৌড়ে যায় তার পিছু পিছু। নদীতে নেমে কিছুটা পানি ভেঙে মোল্লা সাঁতার দেয়। লশকরও সাঁতার দিয়ে গলা পানিতে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে। সে মোল্লাকে চুব দিয়ে আবার টেনে তোলে।
আরশেদ মোল্লা কাঁপছে থরথর করে। অন্য লোকটা সাঁতার কেটে ভাটি পানিতে ভেসে যাচ্ছে চরমান্দ্রার দিকে।
হালা, আমাগ বউ আটকাইছস। তোরে চুবাইয়া মাইরা ফালাইমু। জাবেদ লশকর আবার চুব দেয় আরশেদ মোল্লাকে। তাকে টেনে তুলে সে আবার বলে, ফজলরে পুলিস দিয়ে ধরাইয়া দিছিলি, হা-লা। এহন দ্যাখ কেমুন মজা।
ও চাচা। ফজলের গলা। সে তাকায় ফজলের দিকে। ফজল দূর থেকে হাত নেড়ে মানা করছে আর চুব দিতে, ছেড়ে দিতে বলছে হাতের ইশারায়।
ফজল ধরতে গেলে তার ছেলের বয়সী। সে তাকে চাচা বলে ডাকে। তবুও ফজল মাতব্বর। সে তার আদেশ অমান্য করতে সাহস করে না। সে বিরক্তির সাথে মনে মনে বলে, যেই না হালার বউর বাপ! তার লেইগ্যা দরদ এক্করে বাইয়া পড়ে। এমুন হউররে একশ একটা চুব দেওন দরকার।
আরশেদ মোল্লাকে টেনে তুলে সে বলে, অ্যাই হালার ভাই হালা। দিমুনি আরেকটা চুব?
অনেকক্ষণ চুব দিয়ে ঠেসে ধরায় দম ফাপড় হয়ে আসছে আরশেদ মোল্লার হাঁসফাস করতে করতে সে বলে, আপনের আতে ধরি। আর চুব দিয়েন না?
তোর মাইয়াখান কানে আঁইট্যা দিয়া যাইতে পারবি? ক, শিগগির। নাইলে আবার চুব দিলাম।
আরশেদ মোল্লা কাঁদো-কাঁদো স্বরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, হ, দিয়া যাইমু।
ওয়াদা করলি তো?
হ, ওয়াদা করলাম।
দ্যাখ ওয়াদা যদি খেলাপ করসরে, তয় তোর পেডের ঝুলি বাইর কইরা দিমু যেইখানে পাই।
ওয়াদা ঠিক থাকব বিয়াইসাব।
ওরে আমার বিয়াইরে! হালা কমজাত কমিন। তোরে বিয়াই কইতেও ঘিন্না লাগে।
আপনের দুইডা আতে ধরি। আমারে ছাইড়া দ্যান।
ছাইড়া দিলে হাঁতরাইয়া যাইতে পারবি?
ফজলের লোকজন নদীর কিনারায় এসে জড় হয়।
কদম শিকারি বলে, হালারে লইয়া আহহ। গর্দানডার উপরে দুইডা চটকানা দিয়া জিগাই, হালায় এমুন আকামের কাম ক্যান্ করছিল? ক্যান্ মাইয়া আটকাইছিল? ক্যান্ পা না ধোয়ার লগে দোস্তালি পাতাইছিল? ক্যান্ ফজলরে পুলিস দিয়া ধরাইয়া দিছিল?
জাবেদ লশকর হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায় আরশেদ মোল্লাকে।
হালার লুঙ্গিতে বুঝিন আঁউকড়া লাগে নাই। বলে কদম শিকারি। মনে অয় চোত্রার ঘষাও লাগে নাই। এই বক্কর, দ্যাখতো চোরা পাতা আছেনি। হালার লুঙ্গি উড়াইয়া পাছায় আর কুচকিতে ঘইষ্যা দেই।
একজন বলে, মনে অয় এই দুই ব্যাডা আঁউকড়া লাগনে দৌড় দিয়া পলাইতে পারে নাই। ধানখেতের মইদ্যে হুতি দিয়া পলাইয়া আঁউকড়া ছাড়াইতে আছিল।
হ, ওরা যেইখানে পলাইছিল, হেইখানে ধানখেতের মইদ্যে তিন-চাইড্ডা আঁউকড়া দেখছি আমি। আর একজন বলে।
আরশেদ মোল্লার রান পরীক্ষা করে দেখে কদম শিকারি ও জাবেদ লশকর। সত্যি রানটা আঁকড়ির আঁচড়ে সাংঘাতিকভাবে ছড়ে গেছে।
ফজল ছেড়ে দিতে বলেছে। সুতরাং আরশেদ মোল্লাকে আর আটকে রাখা ঠিক নয়। ওদের দলের যে নৌকাটা ডুবে গিয়েছিল সেটাকে পানি থেকে তুলে তাতে উঠিয়ে দেয়া হয় আরশেদ মোল্লাকে। নৌকার মাথি ধরে ধাক্কা দিতে দিতে জাবেদ লশকর বলে, মাইয়া দিয়া যাবি, ওয়াদা করছস। ওয়াদা যেন ঠিক থাকে। নাইলে কিন্তু চউখ দুইডা ঘুইট্যা দিমু যেইহানে পাই।
২৫-২৮. কদম শিকারি
কদম শিকারি পকেট ঘড়িটা বুঝিয়ে দেয় ফজলের হাতে। সে দেখে পৌনে পাঁচটা বাজে। বেলা ডুবতে দেরি আছে এখনো।
পাহারারত চল্লিশজন ছাড়া আর সবাই জড় হয় ফজলের চারপাশে। তারা মাটিতে গামছা বিছিয়ে বসে। সবার মনে খুশির প্লাবন। হাসিতে ঝলমল করছে সবার চোখ-মুখ।
কই চাচা লস্করের পো? আমাগ পোলাপাইন্যা কাণ্ড-কারখানা কেমুন দ্যাখলেন? হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে ফজল।
হ মিয়া, একখান খেইল দেহাইছ। জাবেদ লশকর বলে।
আমাগ শরীলে একটা আঁচড়ও লাগে নাই। বিপক্ষের কোনো মানুষও খুন-জখম অয় নাই।
রক্তারক্তি ছাড়া এমুন মারামারি আমার জীবনে কোনোদিন দেহি নাই। রজিম মিরধা বলে।
