অনেক দূরে দেখা যায় একটা উঁচু তালগাছ। আশপাশের উঁচু গাছগুলোর মাথা তালগাছটার হাঁটু-বরাবর।
এই বক্কর, এই টিটু, ঐ চাইয়া দ্যাখ ভোজেশ্বরের আসমাইন্যা তালগাছটা। এমুন উঁচা তালগাছ আর দেখি নাই কোনো মুলুকে। দুফরের আগে কিন্তু ঐখানে যাওন লাগব। আইজ সোমবার, ভোজেশ্বরের হাট।
হাটেরতন কিছু কিনবেন নি? জিজ্ঞেস করে বক্কর।
হ, অনেক কিছু কিনতে অইব।
পথে চান্দনী গ্রাম বরাবর নদীর ঢোনে নৌকা বাধে তারা। তিনজনকে নিয়ে ফজল নৌকা থেকে নামে। একটা কাটারি, একটা চাঙারি ও কিছু রশি নেয় সাথে ।
গ্রামের সরু পথ ধরে তারা হাঁটে। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে ফজল বলে, তোরা চোত্রা গাছ চিনস? গুঁড়িচোত্রা? রামচোত্রা?
তিনজনের কেউ চেনে না চোত্রা গাছ।
চিনবি কইতন? চরে এই গাছ অয়না। তোরা নামও শোনস নাই কোনো দিন?
হ, হুনছি। টিটু বলে। ঐ পাতা গায়ে লাগলে চুটমুট করে, জ্বালা করে, খাউজ্যায়।
হ, বইয়ের ভাষায় এগুলার নাম বিছুটি।
গ্রামের দুটো বেতঝোপ থেকে গুনে গুনে দুইশ আঁকড়ি যোগাড় করে ফজল। বেতঝোঁপের মালিককে আঁকড়ি পিছু এক পয়সা করে দিতে হয়। ওগুলোকে একখানে সাজিয়ে তারা রশি দিয়ে শক্ত করে বাধে।
খুঁজতে খুঁজতে রাস্তার পাশের এক জঙ্গলে রামচোত্রাও পাওয়া যায়। হাতে রুমাল বেঁধে ফজল অনেকগুলো গাছ উপড়ে তোলে শিকড়ের মাটিসহ। চাঙারির ভেতর ওগুলো খাড়া করে সাজিয়ে চাঙাড়িটা তুলে দেয় একজনের মাথায়।
নদীর ঢোনে ফিরে এসেই তারা নৌকা ছেড়ে দেয়। ভোজেশ্বর পৌঁছে তারা নদীর পাড়ের বাঁশহাটা থেকে সরু লম্বা ও শুকনো দেখে পঁচিশটা তল্লা বাঁশ কেনে। বাঁশগুলোকে নৌকার দুধারে পানিতরাশ বরাবর তারা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়। তারপর টিটুকে নৌকায় রেখে ফজল বাকি চারজনকে নিয়ে হাটের বিভিন্ন পট্টিতে ঘোরে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য। তিন ব্যাটারীর চারটে টর্চলাইট; দশসের টাডি সুপারি; দশসের ঝাঁকিজালের কাঠি; তিনসের মাথা তামাক, কুড়ি প্যাকেট বিড়ি ও একসের সুতলি কিনে হাটের ভিড় ঠেলে তারা তাড়াতাড়ি নৌকায় ফিরে আসে। টিটুকে নৌকায় না দেখে ফজল হাঁক দেয়, টিটু গেলি কইরে?”
টিটুর কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।
চান্দু থলে-ভরা জালের কাঠি নিয়ে নৌকায় ওঠে সকলের আগে।
ও মাগো!
থলে ফেলে লাফ দিয়ে নেমে যায় চান্দু।
ফ্যাঁক-ফ্যাঁক করে হাসতে হাসতে দৈত্যের মুখোশ-পরা টিটু ছই-এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
সবাই এবার জোরে হেসে ওঠে–কেউ খলখলিয়ে কেউ ফাঁককেঁকিয়ে। ভয়ঙ্কর বিকট চেহারার দৈত্য ভেঙচি দিয়ে রয়েছে। দাঁতাল শুয়োরের দাঁতের মতো দুটো বড় দাঁত বেরিয়ে আছে। রক্ত লেগে আছে সে দাঁতে। নওল ষাড়ের শিংএয়ের মতো দুটো খাড়া শিং-এও রক্তের দাগ।
মুখোশটা দেখেই ফজলের মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি খেলে যায়। সে বলে, মোখাড়া পালি কই, এই টিটু?
টিটু মুখ থেকে শক্ত কাগজে তৈরি মুখোশটা খুলে বলে, অ্যাক ব্যাডা বেচতে আনছিল। অ্যাক আনা দিয়া কিনছি।
ও ব্যাডা গেল কই?
হাটের কোন দিয়ে গেছে কে জানে?
অ্যাই, তোরা পাঁচজনে পাঁচ দিকে যা ব্যাডারে হাঁটের তন বিচরাইয়া আনন চাই। ওরে কইস, পঞ্চাশটা কিনমু।
ফজল ভাবে, মুখোশটা খুবই কাজের জিনিস। হঠাৎ দেখলে ভয় পাওয়ার কথা। মুখোশ দেখে ভয় না পেলেও মুখোশের আড়ালের মানুষকে নিশ্চয়ই ভয় পাবে। চিনতে না পেরে মনে। করবে ওস্তাদ লাঠিয়ালরাই মুখোশ পরেছে তাদের পরিচয় গোপন করার জন্য। মুখোশ না থাকলে বিপক্ষদল দেখবে পাকা লাঠিয়াল একজনও নেই। সব হাঙাল-বাঙাল আর চ্যাংড়ার দল। ওদের মনের জোর বেড়ে যাবে। তখন লড়াই জেতা মুশকিল হয়ে যেতে পারে।
কিছুক্ষণ পর মুখোশ-পরা ফেরিওয়ালাকে ওরা নিয়ে আসে। দর কষাকষি করে ফজল পাইকারী দরে ভয়াল চেহারার দৈত্য-দানবের পঞ্চাশটা মুখোশ কেনে আড়াই টাকায়।
আর কোনো কাজ বাকি নেই পথে। তারা পাল তুলে নৌকা ছেড়ে দেয়। হাল ধরে বসে থাকে বক্কর।
দূর থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসে ফজলের কানে। গানের কথা কিছুই বোঝা যায় না। তবুও সুরের স্পর্শে বিহ্বল হয় তার মন।
তাদের সামনে অনেক দূরে একটা দো-মাল্লাই নৌকা। নৌকাটা ভাটিয়ে তাদের দিকে আসছে। মনে হয়, ওটাতেই বাজছে কলের গান। দুটো নৌকার মাঝের দূরত্ব কমে আসতেই গানের কথা স্পষ্ট শোনা যায় ।
‘ঐ যে ভরা নদীর বাঁকে,
কাশের বনের ফাঁকে ফাঁকে,
দেখা যায় যে ঘরখানি।
সেথায় বধূ থাকে গো,
সেথায় বধূ থাকে।‘
গানের কথা ও সুর গুঞ্জরণ তোলে তার মনে। তার চোখ বুজে আসে। কল্পনার পাখায় ভর দিয়ে তার মন উড়ে চলে যায় ভরা নদীর বাঁকে। মনের চোখ খুঁজে বেড়ায় তার প্রিয় মুখ।
নৌকাটা তাদের পাশ দিয়ে ভাটির টানে অনেক দূর চলে গেছে। গান আর শোনা যায় না এখন। কিন্তু ফজলের মনে গানটা তখনো বেজে চলেছে। তার মনের চোখ তখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে–কখনো রূপজানের, কখনো জরিনার মুখ।
ও মিয়াভাই, বড় গাঙ্গে আইয়া পড়ছি।
বক্করের ডাকে সংবিৎ ফিরে পায় ফজল। সে চোখ খোলে। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। সামনের দিকে তাকিয়ে সে বলে, আল্লার নাম লইয়া পাড়ি দে।
সন্ধ্যার মৃতপ্রায় আলোর দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, খুব ভালো সময়েই পৌঁছেছে তারা। রাতের অন্ধকারে কেউ দেখতে পাবে না, আর দেখলেও চিনতে পারবে না তাদের।
