আল্লা-রসুল বলে ভাইরে মোমিন। আল্লা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। বক্কর ও অন্যান্য বাইছারা জাকইর দেয়।
অনুকূল স্রোত। ভাটির টানে নৌকাটা যাতে পুবদিকে জঙ্গুরুল্লার এলাকায় চলে না যায় সেজন্য পালটাকে একই অবস্থায় রেখে তারা উত্তরমুখি পাড়ি ধরে।
পাল আর দাঁড়ের টানে উত্তর দিকে চলতে চলতে, ভাটির টানে পুবদিকে সরতে সরতে নৌকাটা ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফজলদের বাড়ির ঘাটে পৌঁছে যায়।
.
২৪.
পরের দিন ভোরে ফজল ঘুম থেকে উঠেই ঘাসিতে ঘুমিয়ে থাকা বক্কর ও চান্দুকে ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেয় পুলকি মাতব্বরদের ডেকে আনতে। সে নিজে চাঙারিসহ রামচোত্রা গাছগুলো কলাগাছের ঝোঁপের মধ্যে ছায়ায় রেখে আসে। মাঝে মাঝে পানির ছিটে দিলে গাছগুলো তাজা থাকবে।
ফজল এবার হাট থেকে কিনে আনা তল্লা বাঁশগুলোর আইক্কা ছাড়ায় দা দিয়ে, গিঠগুলো চেঁচে পরিষ্কার করে। ফজলের বাঁশ চাচা শেষ না হতেই মেহের মুনশি, রমিজ মিরধা, জাবেদ লশকর ও কদম শিকারি চলে আসে।
খবরিয়াদের কাছেই তারা শুনেছিল, চাকরিয়া একজনও আসেনি, ই তারা বিষণ্ণ মুখে জানতে চায় চাকরিয়া না আসার কারণ।
দলটা ভাইঙ্গা গেছে। ফজল বলে। দলের সরদার আছে। সে-ও বুড়া। দলের লোকজন এদিগে ওদিগে নানান কাজে চইল্যা গেছে।
এহন কি করতে চাও? মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে। মেঘু আর আলেফ সরদারের লেইগ্যা খবরিয়া পাঠান দরকার।
কোনো দরকার নাই। আমরাই পারমু কাম ফতে করতে।
চারজন পুলকি-মাতব্বর হাঁ করে চেয়ে থাকে ফজলের দিকে।
আপনারা ঘাবড়াইয়েন না। ওগ খবর নিছেন? ওরা আমাগ সাজাসাজির খবর পায় নাই তো?
না। ওরা চাকইর্যা আনে নাই তো?
না। ওরা জানেই না, তুমি জেলেরতন খালাস পাইয়া আইছ। রমিজ মিরধা বলে। তোমার অবর্তমানে আমরা চরদখলের হামতাম করতে যাইমু না, ওরা জানে। তার লেইগ্যা, ওরা খুব নির্ভাবনায় আছে। চাকইর্যা অ্যাকটাও নাই ওগ দলে।
শোনেন। কাইলই হামলা করণ লাগব। আর বেশি দেরি করলে ওরা সব জাইন্যা ফালাইব। লিস্টি করছেন?
হ। মেহের মুনশি নিমার পকেট থেকে কাগজ বের করে ফজলের হাতে দেয়।
উত্তম, ভালো, মধ্যম, ল্যাগবেগা, চ্যাংড়া–এই পাঁচ শ্রেণীর ভাগ করা হয়েছে দলের একশ বত্রিশ জনকে।
‘উত্তম’ শ্রেণীতে আছে আঠারো জন। ফজলের সাথে ঘাসি বেয়ে গিয়েছিল যে পাঁচজন তারাও আছে এ তালিকায়।
ফজল ‘ভালো’দের তালিকা থেকে বেছে দু’জনকে তুলে নেয় ‘উত্তম’দের তালিকায়। এই কুড়ি জনকে সে ডাকতে পাঠিয়ে দেয়।
ভালো তেইশ জন আর মধ্যম চৌত্রিশ জন যাবে মেহের মুনশির বাড়ি। সেখানে তারা শড়কি আর লাঠি চালাবার কসরত করবে মেহের মুনশি আর জাবেদ লস্করের পরিচালনায়। গুলেল বাঁশের চাঁদমারির জন্য যাবে কদম শিকারির বাড়ি।
পুলকি-মাতব্বরদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিয়ে ফজল বলে, কাইল ভোরে সবাই একশ বত্রিশ জন যার যার হাতিয়ার লইয়া এইখানে হাজির অইব। দ্যাখবেন কেও যে ভয়ে না পলায়। আমাগ লাল বড় দামড়াডা জবাই করমু। বেলা এগারোটার মইদ্যে এইখানে খাওয়া-দাওয়া সইর্যা তৈরি অইব। ঘড়ি লাগব দুইটা। একটা তো আছে বাজানের পকেট ঘড়ি। আর একটা পাই কই?
আমার পোলার আছে একটা টেবিল ঘড়ি। রমিজ মিরধা বলে।
ঠিক আছে। এইটা দিয়াই কাম চালান যাইব।
এই চিক্কন লম্বা বাঁশগুলান দিয়া কি করবা? মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে।
এখন আর কইমু না। কাইলই দ্যাখতে পাইবেন।
পুলকি মাতব্বররা চলে যাওয়ার পর ফজল নাশতা খেয়ে বাঁশের গিঠ চাচতে লেগে যায় আবার। তার হাতের কাজ শেষ হওয়ার আগেই উত্তম কুড়ি জন এসে হাজির হয়।
ভালো লেচালাবার কসরত করুন শিকারির বাড়ি।
ফজলের নির্দেশে নৌকার ডওরা থেকে রামদার বাক্স আর ঢাল নিয়ে আসে চান্দু, বক্কর আর টিটু। ফজল কয়েকটা পুরানো লগি যোগাড় করে। চান্দুর হাতে লগি আর ঢাল দিয়ে বলে, মনে কর এই লগিটা একটা শড়কি। আমি ইশারা দিলেই এইটা লইয়া তুই আমারে আক্রমণ করবি। আর সব্বাই তোরা মনোযোগ দিয়া দেখবি। তোগ সব্বাইর কিন্তু শিখতে অইব রামদার লড়াই।
ফজল বাঁ হাতে ঢাল আর ডান হাতে রামদা নিয়ে চান্দুকে ইশারা করে আক্রমণের জন্য। চান্দু আক্রমণ করে। ফজল লগিটাকে ঢাল দিয়ে ফিরিয়ে রামদয়ালের কায়দায় লাফ দিয়ে ‘ইয়া আলী’ বলে কোপ মারে লগির ওপর। লগিটা দুটুকরো হয়ে যায়।
ফজল বলে, এইডা অইল রামদার লড়াই। শড়কির হাতল দুই টুকরো না অইলেও ক্ষতি নাই। বারো আনা কাটলেই বরং ভালো। কোপ খাওয়া শড়কির হাতল দিয়া তখন শড়কির কামও চলব না, লাঠির কামও চলব না।
দুপুর পর্যন্ত কুড়ি জনকে তালিম দেয় ফজল। তারা ঢাল দিয়ে কল্পিত শড়কির কোপ ফিরিয়ে রামদা দিয়ে হাওয়ায় কোপ মেরে মেরে অভ্যাস করে।
দুপুরের খাওয়া খেয়ে কিছুক্ষণ জিরোবার পর আবার শুরু হয় মহড়া। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। ফজল পরীক্ষা নেয় সকলের। তার মূল্যায়ন অনুসারে ছয়জন প্রথম বিভাগে, দশ জন দ্বিতীয় বিভাগে, আর চারজন তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। তাদের প্রত্যেককে একটা করে রামদা বুঝিয়ে দেয় সে। সেই সাথে ঢালও দেয় একটা করে। রামদা বালিগচার ওপর কিভাবে ধার করে নিতে হবে, তাও সে বুঝিয়ে দেয়।
কাইল বেলা ওঠার আগে তোমরা সবাই চইল্যা আসবা। ফজল নির্দেশ দেয়। বড় দামড়াটা জবাই কইর্যা, কুইট্যা-কাইট্যা তাড়াতাড়ি রান্নার ব্যবস্থা করতে অইব।
