এবার রামদয়াল ঢাল আর শড়কি এবং ফজল ঢাল আর রামদা নিয়ে মহড়া শুরু করে।
ফজলের সাহস শক্তি ও ক্ষিপ্রতায় মুগ্ধ হয় রামদয়াল। এমন ভালো শাগরেদ সে কখনো পায়নি। সে মনে মনে খুশি হয় এই ভেবে যে সে বুড়ো হয়ে গেছে। মরে যাবে আর কদিন পর। ফজল তার গুরুর নাম রাখতে পারবে।
ফজলের সাথী দু’জন–বক্কর আর টিটুও একে একে যোগ দেয় মহড়ায়। তারাও মোটামুটি ভালোই দেখিয়েছে রামদা’র লড়াই। রামদয়াল লড়াইয়ের আরো কিছু কায়দা কৌশল সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে বলে, তোমরা মাংস বেশি খাও, তাই শক্তি আছে তোমাগ গায়ে, পেঁয়াজ-রশুন খাও, তার তেজ আছে শরীলে। তোমরা অভ্যাস করলে আমাগতন ভালো লাড়াই করতে পারবা।
কয়টা রামদাও দিতে পারবেন? জিজ্ঞেস করে ফজল। ঢালও লাগব ঐ কয়টা। আপনাগ ঢালগুলা বড় আর মজবুত।
রামদাও কুড়ি খানেকের বেশি দেওয়ন যাইব না। ঢালও কুড়িডা দেওয়ন যাইব। কিন্তু কত টাকা দিবা?
আপনে কইয়া দ্যান?
কুড়িখান রামদা’র দাম চাইর টাকা কইর্যা আশি টাকা আর কুড়িখান ঢাল তিন টাকা কইর্যা ষাট টাকা।
গুরুজি, এট্টু কমাইয়া ধরেন। একটা রামদাও দুই টাকায় বানান যায়।
হেই জিনিস আর এই জিনিসে তফাত আছে। এই জিনিস চাইর টাকার কমে বানাইতে পারবা না।
ঠিক আছে, আপনার কথাই রাখলাম। তয় সব মিলাইয়া একশ কুড়ি টাকা দিমু।
রামদয়ালের দল ভেঙে গেছে। রামদা’র প্রয়োজন তাই শেষ হয়ে গেছে। তার বিশেষ প্রয়োজন এখন টাকার। সে একশ কুড়ি টাকায় জিনিসগুলো দিতে রাজি হয়ে যায়। এ টাকায় মহাজনের কাছে বন্ধক দেয়া দেড় বিঘা জমি ছাড়িয়ে নেয়া যাবে।
ফজল আর তার সাথী দুজনকে নিয়ে রামদয়াল উত্তর দিকের জঙ্গলে ঢোকে। একটা বাঁশঝাড়ের পাশে এলোমেলো করে রাখা কঞ্চির স্তূপ। রামদয়াল কঞ্চিগুলোকে সরিয়ে একটা আয়তাকার গর্ত থেকে কাঠের একটা বাক্স উঠিয়ে আনে। বাক্সের ডালা খুলতে খুলতে সে বলে, এগুলা ঘরে রাখলে বিপদ। পুলিস খানাতল্লাশি কইর্যা এগুলা পাইলে কি আর বাঁচনের উপায় আছে? মাজায় দড়ি লাগাইয়া হান্দাইয়া দিব জেলে। ঐ ডরে কব্বরের মইদ্যে গুঁজাইয়া রাখছি। নেও, গইন্যা দ্যাহো কয়ডা আছে।
ফজল গুনে দেখে কুড়িটা আছে রামদা।
বাক্সডা শুদ্দা লইয়া যাও। বাক্সডা দিয়া আর কি করমু? বাক্সের দাম দশটাকা দিও।
ঠিক আছে। দিমু দশ টাকা।
দাওগুলায় পাইন দেওয়া আছে। বালিগচার উপরে বালি দিয়া ধারাইয়া লইও।
সন্ধ্যার পর বাক্সটা নিয়ে নৌকায় ওঠে ফজল ও তার সাথীরা।
রামদয়াল এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে কুড়িটা ঢাল যোগাড় করে নৌকায় দিয়ে যায়। ফজল একশ’ তিরিশ টাকা তার হাতে দিয়ে তার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে।
রামদয়াল তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে, ভগবান তোমার মঙ্গল করুক, তোমার জয় হোক।
রামদয়াল চলে যাওয়ার পর বাক্সটা ও ঢালগুলো তারা ধানখেতের মধ্যে লুকিয়ে রেখে আসে। চৌকিদার-দফাদার বা পুলিস খবর পেয়ে বা বিদেশী নৌকা দেখে সন্দেহ করে নৌকায় তল্লাশি চালালে মুসিবতে পড়তে হবে। সুতরাং সাবধান হওয়া ভালো।
রান্না অনেক আগেই শেষ হয়েছিল। সবাই খেতে শুয়ে পড়ে। ভোর হওয়ার আগে রওনা দিলেই চলবে।
শুয়ে শুয়ে ফজর চিন্তার জাল বুনতে শুরু করে। যাদের জন্য এত পরিশ্রম করে তারা এই দূর দেশে এসেছিল তাদের পাওয়া গেল না। তাদের হাতিয়ার নিয়ে কাম ফতে করা কি সম্ভব হবে? কেন হবে না? নিশ্চয়ই সম্ভব হবে।
সন্দেহের দোলায় নুয়ে পড়া সংকল্প তার আত্মবিশ্বাসের মেরুদণ্ডে ভর দিয়ে এবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
খুনের চর বেদখল হওয়ার পর থেকে, বিশেষ করে জেলে থাকতে ফজল শুধু ভেবেছে আর ভেবেছে। চর দখলের নতুন কায়দা-কৌশল ফন্দি-ফিকির মনে আসতেই তার চোখে ভাসে দুই দলের মারামারির দৃশ্য। অনেকগুলোর মধ্যে তিনটা কৌশল তার মনে সাফল্যের আশা জাগায়। এগুলো নিয়ে সে বাদল আর আক্লাসের সাথে আলোচনাও করেছিল। তারাও কৌশলগুলোর প্রশংসা করে বলেছিল, ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে জয় নিশ্চিত।
চাকরিয়া যোগাড়ের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তার উদ্ভাবিত কায়দা-কৌশলগুলো এবার তার মাথার ভেতর জটলা পাকাতে শুরু করে। শুয়ে শুয়ে সে স্থির করে, ফিরে যাওয়ার পথে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো অবশ্যই সগ্রহ করে নিয়ে যেতে হবে।
ফজলের মনের ভাবনা ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসে। সে ঘুমিয়ে পড়ে এক সময়ে।
একদল লোক লাঠি-শড়কি নিয়ে তাড়া করছে রূপজানকে। সে প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছে নদীর পাড় ধরে। এক পাশ থেকে সে নিজেও দৌড়াচ্ছে শড়কি হাতে। কিন্তু এগুতে পারছে না। হঠাৎ পাড় ভেঙে রূপজান নদীতে পড়ে গেল আর অমনি ঘুমটা ভেঙে গেল তার। সে কাঁপতে থাকে থরথর করে।
একটু পরেই মোরগ বাক দিয়ে ওঠে, কুউ-ক্কুরু-উ-উ–ৎ-কু-উ-উ।
ফজল উঠে সবাইকে জাগিয়ে দেয়। তারা তাড়াতাড়ি ধানখেত থেকে রামদা’র বাক্স ও ঢালগুলো নিয়ে আসে, রেখে দেয় উওরায় পাটাতনের নিচে।
আর একটুও দেরি না করে তারা পাড়া উঠিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়।
খাল উজিয়ে কীর্তিনাশায় পৌঁছতে ভোর হয়ে যায়। উজান পানি। বাতাসও নেই যে পাল তুলে দেবে। দু’জন গুন নিয়ে নেমে যায় ডাঙায়। কাঁধে বেরুয়া ঠেকিয়ে তারা গুন টেনে এগিয়ে যায় নদীর পাড় ধরে।
একটা বাঁক ঘুরতেই ফজল উত্তর দিকে তাকায়। একটা ছোট স্টিমার আসছে উত্তর দিক থেকে। ওটার পেছনে চাক্কি। পানি কমে গেছে, তাই পেছনে চাক্কিওয়ালা জাহাজ চালু হয়েছে।
