খুনের চরের বৃত্তান্ত শেষ করে ফজল তার এখানে আসার উদ্দেশ্য রামদয়ালকে জানায়। রামদয়ালের মুখ সমবেদনায় বিষণ্ণ। আফসোসসূচক শ-শ্চ শব্দ করে সে বলে, বড় অদিনে আইছ বাবা। আমার দল তো আর নাই। দল তো কবে ভাইঙ্গা গেছে।
ফজলের মাথায় যেন হঠাৎ বাজ পড়ে। সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রামদয়ালের মুখের দিকে।
ফজলের অসহায় বিহ্বল দৃষ্টি লক্ষ্য করে রামদয়াল আবার বলে, আমাগ আর কেও জিগায় না আইজকাইল। আগে বরিশাল, ভোলা, চানপুর, মেন্দীগঞ্জে, হিজলা আরো কত জায়গা থিকা লইয়া যাইত আমাগ। আড়িয়াল খাঁ আর মেঘনার কত কত চর দখল কইর্যা দিয়া আইছি। তোমাগ পদ্মার চরে যাই নাই কোনোদিন। এহন চরুয়ারা নিজেরা নিজেরাই লড়াই করে, দশ-পাঁচটা খুন-জখম অয়, হাজতে যায়, জেল খাডে। আমাগ আতে খুন-জখম বড় একটা অইত না।
একটু থেমে আবার বলে, আগে আশ্বিন-কাতি মাসে বাড়ির ভাত খাইতে পারতাম না। আইজ এই চর, কাইল অই চর দখলের লেইগ্যা মাইনষে আতে-পায়ে ধরত। গেল কয়েক বচ্ছর ধইর্যা আর কেও নিতে আহে না। দুই একটা যা আইত, উচিত পয়সা দিত না। এমনে কি আর সংসার চলে? আমাগ অনেকেরই জমাজমি নাই। দলের মানুষ প্যাডের ধান্দায় নানান জা’গায়, নানান কাজে চইল্যা গেছে। বারো-তেরো জন তো বউ-পোলা-মাইয়া লইয়া গেছে। আসাম মুলুকে। ওরা আর ফিরা আইব না কোনো দিন। চার-পাঁচ জন গেছে করাত কামে। তিনজন সইন কইর্যা যুদ্ধে গেছে। কয়েকজন হাটে হাটে তরি-তরকারি বেচে। দুইজন এক মাল্লাই বায়। কয়েকজন করে কুড়ালের কাম। তারা গাছ কাডে, চলা ফাড়ে। কয়েকজন ওড়া কোদাল লইয়া কই যে গেছে ভগমান জানে।
দশ-বারো জন তো পাওয়া যাইব? হতাশার ধকল কাটিয়ে ফজল বলে।
নারে বাপু, তাও নাই। দুই-তিনজন যারাও আছে, তারা কেও জ্বরে কাহিল, কেও বদনা লইয়া দৌড়াদৌড়ি করে।
ফজল হেসে ওঠে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো সে হাসি। সে বলে, দলের মানুষ তো নাই, কিন্তু রামদাওগুলাতো আছে?
রামদাও দিয়া কি করবা?
আমাগ রামদাও নাই। আপনাগ রামদাওগুলা বেইচ্যা ফালান আমার কাছে।
রামদাও লইয়া পারবা না বাপু তোমরা লাড়াই করতে। খামাখা—
আপনে যদি দেখাইয়া দ্যান, এট্টু শিখাইয়া দ্যান তয় পারমু আপনের আশীর্বাদে।
রামদয়াল বিস্মিত চোখে তাকায় ফজলের দিকে। তার চোখ খুঁটে খুঁটে দেখে ফজলের সিনা, বাহু, আঙুল। সে ফজলের সাথী দুজনকেও দেখে খুঁটে খুঁটে। তারাও হাতে-পায়ে গায়ে-গতরে প্রায় ফজলের মতই বলিষ্ঠ।
রামদয়াল হঠাৎ খপ করে ফজলের ডান হাত ধরে ফেলে বলে, আসো দেখি পাঞ্জা লড়ি। দেখি কেমুন জোর আছে শরীলে।
দু’জনে দু’জনের কজী ধরে মাটিতে কবজি রেখে পাঞ্জার লড়াই শুরু করে। যদিও শেষ পর্যন্ত রামদয়ালই জিতে, তবুও ফজলের হাত মাটিতে নোয়াতে তাকে গায়েব সব কুয়ত ঢালতে হয়।
আপনেরে ওস্তাদ মানলাম, গুরু মানলাম। ফজল অনুনয় করে বলে। শিখাইয়া দ্যান আমাগো।
গুরু মানলে দক্ষিণা দিতে অয়। দক্ষিণা কই?
ফজল জামার পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দেয় রামদয়ালের দিকে।
দশ টাকা! দেড় মণ চালের দাম! যুদ্ধের জন্য হঠাৎ দাম না বাড়লে তো তিন মণই পাওয়া যেত।
রামদয়াল নোটটা ট্র্যাকে খুঁজে উঠে দাঁড়ায়। উত্তর দিকে কিছুদূর গিয়ে সে একটা জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পরে রামদয়াল জঙ্গল থেকে ফিরে আসে। তার একহাতে একটা লম্বা রামদা, অন্যহাতে সদ্য-কাটা একটা তল্লা বাঁশ।
এই জুয়ান, কি যেন নাম তোমার? রামদয়াল জিজ্ঞেস করে।
ফজল।
রামদয়াল রামদাটা ফজলের হাতে দিয়ে বলে, এই বাঁশটা এক কোপে দুইখণ্ড করতে অইব।
ফজল রামদাটা নিয়ে ওটার ধার পরীক্ষা করে বলে, ধার তো তেমন নাই।
ঠিক আছে, তুমি কোপ মারো। আমি ঠিকই বোঝতে পারব।
রামদয়াল বাঁশটার গোড়ার দিক এগিয়ে দেয় ফজলের দিকে।
সে লাফ মেরে ‘ইয়া আলী’ হুঙ্কার দিয়ে কোপ মারে। বাঁশটা দু’টুকরো হয়ে যায়। রামদয়ালের চোখে-মুখে বিস্ময়। সে বলে, সাবাস, তুমি পারবা হে। গুরুর নাম রাখতে পারবা।
রামদয়াল ফজলের সাথী বকর আর টিটুরও পরীক্ষা নেয়। তারা এক কোপে বাঁশটার বারো আনারও বেশি কাটতে সক্ষম হয়।
রামদয়াল বলে, তোমরাও চেষ্টা করলে পারবা।
সে ঘরে গিয়ে দুটো ঢাল ও একটা শড়কি নামিয়ে নিয়ে আসে।
একটা ঢাল ও শড়কি ফজলের হাতে দিয়ে বলে, তুমি ঢাল ও শড়কি লইয়া আমারে আক্রমণ করবা। আমি ঢাল আর রামদা দিয়া তোমারে ফিরাইমু।
রামদয়াল ও ফজল যার যার হাতিয়ার নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়।
রামদয়াল ইশারা দিতেই ফজল শড়কি নিয়ে আক্রমণ করে। রামদয়াল ঢাল দিয়ে শড়কির আঘাত প্রতিহত করেই ডান দিকে সরে বাঁদিকে সামান্য ঘুরে লাফ দিয়ে জয় মা কালী’ বলে কোপ মারে শড়কির হাতলে। বাঁশের শুকনো হাতল পুরোপুরি দু’টুকরো হয় না। কোপ খাওয়া হাতলের নিচের অংশের সাথে শড়কির ফলাটা লল্লুড় করে। এতেই বেশি অসুবিধেয় পড়ে ফজল। তার হাতের অস্ত্রটা এখন না-শড়কি, না-লাঠি। কোনো ভাবেই সে ওটাকে চালাতে পারে না। ওদিকে রামদয়াল রামদা উঁচিয়ে মার মার করে তেড়ে আসে। ফজল পিছু হটে দৌড় দিয়ে পালাতে বাধ্য হয়।
রামদয়াল হাসতে হাসতে বলে, এইডা অইল রামদার লাড়াই। শড়কির আতল পুরাপুরি না কাটলেই বেশি ভালো। শড়কিডা দিয়া তহন শড়কির কাম তো না-ই, লাডির কামও চলব না।
