সুদের হার তো বড় বেশি! কদম শিকারি বলে।
হ সুদের হার বেশিই। রজিম মিরধা বলে। শোন ফজল মিয়া, ত্বরাত্বরিই ট্যাহা শোধ দিতে অইব। সুদের পোলা-মাইয়া নাতি-পুতি বিয়ানের সময় দেওন যাইব না। ওগুলা বিয়াইতে শুরু করলে কিন্তুক উফায় নাই। তহন গয়নাগুলা বেবাক খুয়াইতে অইব।
হ তাড়াতাড়িই টাকা শোধ দিয়া গয়না ছাড়াইয়া আনতে অইব। দেরি করণ যাইব না।
মেহের মুনশির কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা গুনে নিয়ে ফজল অন্দরে যায়। সিন্দুকে টাকাগুলো রেখে আবার কাছারি ঘরে ফিরে আসে।
অনেকক্ষণ ধরে তারা সলা-পরামর্শ করে। মেহের মুনশি, রমিজ মিরধা ও কদম শিকারি হামলা করার যে সব কায়দা-কৌশলের কথা বলে তা সবই পুরানো, বহুল ব্যবহৃত দাদা-পরদাদার আমলের পদ্ধতি। ওতে খুন-জখম এড়ানো সম্ভব নয়। খুন-জখম না করে বিপক্ষ। দলকে কিভাবে নাস্তানাবুদ করে চর থেকে হটিয়ে দেয়া যায় তার ফন্দি-ফিকিরের জন্য ফজল অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছে। জেলে থাকতে অনেকের সাথে আলোচনা করেছে। অনেক ভেবে-চিন্তে পরিকল্পনা একটা করে রেখেছে সে, গেঁথে রেখেছে মনের মধ্যে। কিন্তু এখনি, এত আগে তা প্রকাশ করা সমীচীন নয়। কারণ সে মনে করে, এদের কানাকানি থেকে বাইরে জানাজানি হবে আর জানাজানি হলেই সব আয়োজন হবে বিলকুল বরবাদ। সে শুধু বলে দুইজন বুড়া বাদে সবাইকে হাতিয়ার হাতে নিতে অইব। আমাগ মোট মানুষের সংখ্যা উঠন্তি চ্যাংড়া লইয়া একশ বত্রিশ জন। এই সব মানুষের লিস্টি তৈরি করতে অইব। পয়লা পরথম বাছাই করেন ল্যাগবেগা হ্যাংম্যাইঙ্গা গুলারে। তারপর বাছাই করেন চ্যাংড়া লেদুফেদু গুলারে। ঢাল-কাতরা, লাঠি-শড়কি লইয়া ওরা মুখামুখি লড়তে পারব না। ওগ হাতে দিতে অইব গুলাইল বাশ। দূরের তন ওরা গুলাইল মারব। যারা গুলাইল মারতে জানে না, এই কয় দিনের মইদ্যে তাগগা শিখাইয়া লইতে অইব। কলাগাছের মাজায় চান্দের মতো গোল দাগ দিয়া চানমারির ব্যবস্থা করবেন। মাটির গুলি মাইরা মাইর্যা ওরা মারতে শিখব।
একটু থেমে ফজল আবার বলে, তুরফানের কাছে যারা লাঠি খেলা শিখছিল, আলেফ সরদার আর মেঘু পালোয়ানের কাছে যারা শড়কি চালান শিখছিল, তারা এই কয়দিন খুব কইর্যা অভ্যাস করব। চাকইর্যা আইলে চাকইর্যাগ লগে পরামিশ কইর্যা ঠিক করণ লাগব। কোন ভাবে হামলা করলে কাম ফতে অইব। আপনারা
ক্যাডারে? বাইরে মানুষের চলাফেরার শব্দ পেয়ে হাঁক দেয় মেহের মুনশি।
আমরা।
আমরা ক্যাডা?
চান্দু, বক্কর–আমরা ঘাসি লইয়া ফজল ভাইর লগে যাইমু।
তোমরা এই রাইতে আইয়া পড়ছ? ফজল জিজ্ঞেস করে।
হ, ঘুমাইয়া গেলে যদি জাগন না পাই।
ভালো করছ। দাঁড়, বাদাম, গুন, লগি সব ঠিকঠাক মতো নায়ে উডাও। তোমরাও নায়ের মইদ্যে ঘুমাইয়া থাক গিয়া। পোয়াত্যা তারা ওডনের আগে রওনা দিতে অইব। আর তিনজন কই?
তারা এহনই আইয়া পড়ব।
আইচ্ছা যাও।
ফজল তার আগের কথার জের টেনে বলে, আপনারা লিস্টিগুলা কইর্যা রাইখেন। আইজ আর আলোচনার দরকার নাই। চাকইর্যারা আইলেই ফাইনাল’ আলোচনা অইব।
সবাইকে বিদায় দিয়ে ফজল অন্দরে গিয়ে দেখে তার মা বারান্দায় তার জন্য খাবার সাজিয়ে বসে বসে তসবি গুনছে।
.
২৩.
ভোর রাত্রেই পাঁচজন বাইছা নিয়ে নৌকায় চড়ে রওনা হয়েছিল ফজল। বাদাম উড়িয়ে, দাঁড় মেরে, গুন টেনে, পদ্মা উজিয়ে, কীর্তিনাশা ভাটিয়ে তারা যখন পালং পৌঁছে তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। লোকের কাছ থেকে বাসুদেবপুরের পথের খবর নিয়ে তারা নৌকাটাকে একটা বড় খালের ভেতর দিয়ে বেয়ে নিয়ে যায়। মাইল দুয়েক গিয়ে একটা শুকনো সরু খালের মুখে নৌকাটাকে বাধে।
চলতি নৌকায় রান্নার ঝামেলা অনেক। তাই গুড় আর কলা দিয়ে মুড়ি খেয়ে কোনো রকমে পেটকে বুঝ দিয়ে এতদূর এসেছে তারা। এসব চাকুমচুকুম আর গছানো যাবে না পেটকে। চাল, ডাল, মুরগি আলু, তেল, নুন, পেঁয়াজ, মরিচ ইত্যাদি বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল ফজল। তিনজনের ওপর রান্নার ভার দিয়ে বক্কর আর টিটুকে নিয়ে ফজল নৌকা থেকে নামে। ফজলের হাতে রশির ঝুলনায় একটা সন্দেশের হাঁড়ি।
ফজল জেল থেকেই শুনে এসেছিল রামদয়াল সরদার খুব মেজাজি লোক। তাই তাকে খুশি করার জন্য পথে নৌকা থামিয়ে সে নড়িয়ার সুপ্রসিদ্ধ সন্দেশ কিনে নিয়ে এসেছে।
লোকের কাছ জিজ্ঞেস করে খাল পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা রামদয়াল সরদারের বাড়ি পৌঁছে।
লুঙ্গি-পরা অপরিচিত লোক এসেছে শুনে বিরক্তির সাথে রামদয়াল ঘর থেকে উঠানে নামে। আগন্তুকদের দিকে তাকিয়ে তার বিরক্তিভরা গম্ভীর দৃষ্টি হঠাৎ প্রসন্ন হয়ে ওঠে। ফজলের হাত থেকে সন্দেশের হাঁড়িটা নিতে নিতে সে বলে, এগুলা আবার ক্যান্ আনছ, বাবা? হাঁড়িটা পর্শ করো নাই তো?
না, না দড়ির ঝুলনা ধইর্যা আনছি।
উঠানে মাদুর বিছিয়ে তাদের বসতে দেয়া হয়।
রামদয়াল সরদারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। তার দোহারা পেশিবহুল মজবুত শরীরে ভাটার টান লাগলেও গায়ের কুচকুচে কষ্টিকালো রংয়ের জন্যই বোধ হয় তা চোখে পড়ে না।
রামদয়াল সরদার তার আসল নাম নয়। তার আসল নাম পাঁচকড়ি মণ্ডল। জমি দখলের ‘কাইজ্যায়’ তার দল রামদা নিয়ে লড়াই করত। রামদাওয়ালা সরদারই লোকের মুখে মুখে বিবর্তিত হয়ে রামদয়াল সরদার হয়েছে। এই নামেই সে পরিচিত আজকাল। আসল নামে আর কেউ চিনে না তাকে। সে নিজেও বোধ হয় ভুলে গেছে তার আসল নাম।
