কিন্তু হেই লগে আমরাও তো খাওন না পাইয়া মইরা যাইমু। আমাগ তিন-চাইর মাসের খোরাক আছে ভাটি না অয় উজান মুলুকতন। আমাগো তো বাঁচনের কোনো পথ দ্যাখতে আছি না।
হ, বড় খারাপ দিন আইতে আছে। এখন যদি আমন ধান পাকার আগে চরটা দখল করা যায়, তয় কিছুটা বাঁচার আশা আছে।
হ ঠিকই কইছ। রমিজ মিরধা বলে। কিন্তু জঙ্গুরুল্লার দলরে ক্যামনে হটান যায়? আপনেরাই বুদ্ধি দ্যান, কেমন কইর্যা—
আমরা তো কোনো কূলকিনারা পাইতেছি না। বলে মেহের মুনশি।
শোনেন, আমারে মুনশিগঞ্জ জেলেরতন পাঠাইছিল ঢাকা জেলে। আমি ঢাকা জেলেরতন খালাস পাইয়া আইছি। জঙ্গুরুল্লার দল আমার ছাড়া পাওয়ার কথা তাড়াতাড়ি জানতে পারব না। সেই জন্যই আপনেগ চুপে-চাপে আইতে কইছি। তারা তো তিনমাস হিসাব কইর্যা রাখছে। তাগ হিসাব মতন অগ্রাণ মাসের পাঁচ-ছয় তারিখে আমি ছাড়া পাইমু। কিন্তু আমি চব্বিশদিন আগেই ছাড়া পাইয়া আইছি। জেলখানায় ভালো মতন চললে, হুকুম মতন কাম করলে জেল মাফ পাওয়া যায়। জঙ্গুরুল্লারা তো এই খবর রাখে না। তাই চাকইর্যা এখন একটাও নাই চরে।
হ, তোমার ছাড়া পাওয়ার খবর পাইলে আবার চাকইরা আইন্যা রাখব চরে।
তখন কিন্তু চর দখল করা মুশকিল অইয়া পড়ব। আমি কাইল একটা দিন বাড়িতে আছি। পরশু দূরে একখানে চইল্যা যাইমু। জেলখানায় পালং থানার একজনের কাছে ভালো চাকইর্যার সন্ধান পাইছি। মেঘু আর আলেফের মতো চাকইর্যা দিয়া কাম ফতে অইব না। আমি দুই-তিন দিনের মইদ্য ঐ চাকইর্যা লইয়া আইমু। আমি যে ছাড়া পাইয়া আইছি এই কথা যেন একটা কাউয়ায়ও জানতে না পারে।
ও মিয়ারা হোনলা নি? খবরদার! এই কথা জানাজানি অইলে কিন্তু কোনো কাম অইব না।
বোঝলা তো মিয়ারা? রমিজ মিরধা বলে। নিজের কপালের লগে বেবাকের কপাল পোড়াইও না। যার মোখ দিয়া এই কতা বাইর অইব সে তার বাপের জর্মের না। সে একটা জারুয়া। এই কইয়া দিলাম।
শোনেন, অনেক টাকার দরকার। ফজল বলে। আমি আমাগ বেবাক গয়না বন্ধক দিমু। আপনারা নিজেগ সাধ্যমত টাকা জোগাড় কইর্যা কাইলই নিয়া আসেন। নগদ টাকা
থাকলে গয়না বন্ধক দেওন লাগব। চর ফতে অইলে সব আবার ফিরত পাইবেন।
হ, চরের জমি খাইতে অইলে টাকা খরচ করন লাগব। মেহের মুনশি বলে। আপনারা সবাই রাজি তো?
ফজল তার কাজে-কর্মে, ব্যবহারে এদের আস্থা অর্জন করেছে। সকলের অগাধ বিশ্বাস তার ওপর। মাছ ধরার ব্যবস্থা করে গরিব কোলশরিকদের যেভাবে সে সাহায্য করেছিল তা কেউ ভোলেনি। তাই তার প্রস্তাবে সবাই রাজি হয়।
ফজল বলে, আপনারা বাড়ি যান। মুনশি ভাই, আর মির ভাই এই রাত্রের মইদ্যে টাকা অথবা গয়না যোগাড় করেন। ঐগুলা লইয়া কাইল ভোরে আমার এইখানে চইল্যা আসবেন।
একে একে সবাই নিজ নিজ বাড়ির দিকে রওনা হয়।
.
পরের দিন। ভোরবেলা বরুবিবি রসুইঘরে চালের গুঁড়োয় পানি মিশিয়ে চিতই পিঠার গোলা তৈরি করছিল।
ফজল দরজার মুখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, কি করতে আছ, মা।
কয়ডা চিতই পিডা বানাইমু। তুই আবার বাইরে চইল্যা যাইস না।
না, যাইমু না। তুমি আত ধুইয়া গয়নার পোটলাডা নামাইয়া দ্যাও তো মা।
গয়নার পোটলা! বউর গয়নার?
হ।
ঐ পোটলা দিয়া তুই কি করবি?
কাম আছে। অনেক টাকার দরকার।
উঁহু! এই গয়নাতে রূপজানের। উনি মরার সময় কইয়া গেছেন–ঐ গয়না রূপজানের মহরানার হক।
শোন মা, আমারতন জবরদস্তি কইর্যা তালাক নিছে। ঐ সময় আরশেদ মোল্লা মহরানার দাবি ছাইড়্যা দিছে।
আরশেদ মোল্লা দাবি ছাইড়া দেউক। কিন্তু উনি তো কইয়া গেছেন–গয়নাগুলা রূপজানের মহরানার হক।
ঠিক আছে, ঐগুলো রূপজানেরই থাকব। এখন টাকার বড় দরকার। ঐগুলা বন্ধক দিয়া কিছু টাকা আনতে অইব।
না রে বাজান, হেষে যদি ছাড়াইতে পারস?
ছাড়াইতে পারমু না ক্যান্? তোমারে কথা দিলাম, চাইর মাসের মইদ্যে ওগুলা ছাড়াইয়া আইন্যা যারডা তারে ফিরাইয়া দিমু।
অনেক পীড়াপীড়ির পর বরুবিবি রাজি হয়। সে হাত ধুয়ে ঘরে যায়। সিন্দুক খুলে গয়নার পুটলি বের করে। ফজলের হাতে ওটা দিয়ে সে বলে, দ্যাখরে বাজান, এইগুলা খুয়াইয়া ফেলাইলে কিন্তুক দায়িকের তলে থাকবি। মহরানার দেনা আর শোধ করতে পারবি না।
গয়নার পুটলি নিয়ে ফজল নিজের ঘরে যায়। চৌকির ওপর বসে সে পুটলি খোলে, একটা-একটা করে দেখে গয়নাগুলো। ওগুলো নাড়াচাড়া করার সময় গয়না পরিহিতা রূপজানের ছবি বারবার ভেসে ওঠে তার মনে।
ফজলের মনে প্রশ্ন জাগে, রূপজান গয়নাগুলো কেন ফেরত দিয়েছিল। তবে কি সে জোর-জবরদস্তির তালাক মেনে নিয়েছে? না, অসম্ভব। এ তালাক সে মেনে নিতে পারে না। গয়না বিক্রি করে তার মামলার তদবির করার জন্য সে কাদিরকে দিয়ে ওগুলো ফেরত পাঠিয়েছিল। কাদির তো তাই বলেছিল ওগুলো ফেরত দেয়ার সময়। সে তো বানিয়ে বলেনি কিছু। রূপজান যা বলে দিয়েছিল তা-ই সে বলেছে।
গয়নাগুলোয় হাত বুলাতে বুলাতে সে মনে মনে বলে, হায় রে অভাব! এই অভাবের তাড়নায় রূপজানের শরীল খালি কইর্যা একবার বন্ধক দিতে অইছিল এই গয়নাগুলা। এখন আবার বন্ধক দিতে অইব।
কেমনে যেন সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় ব্যথিয়ে ওঠে তার বুকের ভেতরটা।
মিয়া ভাই।
আমিনার ডাকে সংবিৎ ফিরে পায় ফজল, কে রে আমিনা? আয়।
