একটা থালায় করে চিতই পিঠা, নারকেল কোরা ও ঝোলা গুড় নিয়ে আসে আমিনা।
কিরে, তাল নাই? তালের মওসুম কি শেষ?
এইডাতো কাতি মাস। এহন কি আর তাল পাওয়া যাইব? হাশাইলের হাটে পাওয়া যাইতে পারে দুই একটা।
এই বচ্ছর তাল চোখে দেখি নাই। গুড় ও নারকেল সহযোগে চিতই পিঠায় এক কামড় দিয়ে ফজল বলে, চিতই পিঠার লগে তালের পায়েস! ওহ্ যা মজা!
ভাবি তো নাই। তাল গোলাইব কে?
ক্যান্ তুই? পারবিনা গোলাইতে?
উঁহু। তাল গোলান কি যেমুন-তেমুন কষ্ট। আমিনা গান গাইত গাইতে রসুইঘরের দিকে চলে যায়–
তাল গোলাগোল যেমুন তেমুন,
আঁইট্যা দ্যাখলে ভয় করে,
তার চুল-দাড়িরে ভয় করে,
অ ভাইজান, আমি তাল খাইনা ডরে।
ফজলের মনের চোখে ভেসে ওঠে, রূপজান সবল সুডৌল হাত দিয়ে তালের আঁটি দলাইমলাই করে ঘন গোলা বের করছে আর গুনগুন করে গান গাইছে–
তাল গোলাগোল যেমুন তেমুন,
আঁইট্যা দ্যাখলে ভয় করে,
তার চুল-দাড়িরে ভয় করে,
অ বু’জান, আমি তাল খাইনা ডরে গো,
তাল খাইনা ডরে।
তালের আঁইটায় চুল-দাড়ি
খামচা দ্যাও আর দ্যাও বাড়ি
ডলা দিয়া বাইর করগো রস
অ বউ, বেতাইল্লারে এমনে করো বশ গো,
এমনে করো বশ।
হাতে-ধরা চিতই পিঠা মুখে দিতে ভুলে যায় ফজল। তার কল্পনা রূপজানকে নিয়ে আসে তার চোখের সামনে। তাল গোলাতে গোলাতে রূপজান তার দিকে চেয়ে মুচকি হাসছে আর গান গাইছে–
তালের গোলা বেতাল করে,
জ্বাল দিলে যে উতরে পড়ে,
অ বু’জান, হইল কি কারবার গো,
হইল কি কারবার।
তাল পড়লে উত্রাইয়া,
পড়িস না গো চিত্তরাইয়া,
অ বউ, নিভু জ্বালে তালে তালে
নাড়া দে বারবার গো,
নাড়া দে বারবার।
অ দুদু।
নূরুর ডাকে কল্পনার ছবি মুছে যায় হঠাৎ।
কি রে নূরু, ডাক দিলি ক্যান্?
রমিজ মিরধা আর মেহের মুনশি আইছে।
কাছারি ঘরে বইতে দে। পান-তামুক দে। আমি আইতে আছি।
পিঠা খাওয়া শেষ করে গয়নার পুঁটলি নিয়ে ফজল কাছারি ঘরে যায়।
সালাম বিনিময়ের পর মেহের মুনশি বলে নগদ টাকা অনেকেই দিতে পারে নাই। বারোজনের কাছে পাইছি দুইশ’ পঞ্চাশ টাকা। পনেরো জন দিছে গয়না। বাকি কোলশরিকরা কিছু দিতে পারে নাই।
দিব কইতন? রমিজ মিরধা বলে। বউ-পোলাপান লইয়া ওরা বড় কষ্টে আছে।
তাতো বুঝলাম। ফজল বলে, কিন্তু অনেক টাকার দরকার। গয়না বন্ধক দিয়া কি অত, টাকা জোগাড় করন যাইব?
কত টাকা লাগব, আন্দাজ করছনি? মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে।
তা প্রায় দুই হাজার টাকা লাগব।
তা বেবাক গয়না বন্দুক দিলে অইয়া যাইব মনে অয়। বলে রমিজ মিরধা।
কি কি গয়না আনছেন, দেখি? কারন কোন কোন গয়না আনছেন, তার ফর্দ বানাইছেন তো?
হ বানাইছি। মেহের মুনশি বলে।
মেহের মুনশি নগদ দুশ’ পঞ্চাশ টাকা দেয় ফজলের হাতে। তারপর পুটলিবাঁধা গয়না ও ফর্দ রাখে ফজলের সামনে।
ফজল পুটলি খুলে গয়নাগুলো ফর্দের সাথে মিলিয়ে নেয়। গয়নার মধ্যে রয়েছে করণফুল, কানপাশা, মাকড়ি, মুড়কি, চুড়ি, বাজু, দানাকবচ। সবগুলো গয়না ও রূপজানের গয়নার পুটলি মেহের মুনশির হাতে তুলে দিয়ে ফজল বলে, এইগুলা লইয়া আপনারা দুইজন হাশাইল বাজারে চইল্যা যান। জগু পোদ্দারের দোকানে বন্ধক রাইখ্যা টাকা লইয়া আসেন। আমিই যাইতাম, কিন্তু জঙ্গুরুল্লার কোনো লোক দেইখ্যা ফালাইলে বেবাক গোলমাল অইয়া যাইব।
ঠিক আছে। তোমার যাওনের দরকার নাই। রমিজ মিরধা বলে। আমরাই ঠিকঠাক মত ওজন করাইয়া ট্যাহা লইয়া আইতে আছি।
হ, ঠিক মতন আলাদা আলাদা ওজন করাইয়া কার গয়নার কত ওজন তা ফর্দে লেইখ্যা রাইখেন। দেড় হাজার টাকা কমে রাজি অইবেন না।
গয়না অইব চল্লিশ ভরির কাছাকাছি। মেহের মুনশি বলে। দেড় হাজার টাকা দিব না ক্যান?
না দিলে বিষ্ণু পাল আছে, ছিদাম কুণ্ডু আছে। ওনাদের কাছে যাইবেন।
ঠিক আছে, তুমি চিন্তা কইর্য না।
আইজ সন্ধ্যার পর আপনাগ দুইজনরে লইয়া একটু বসতে অইব। মাইরটা কেমনে কি ভাবে চালাইতে অইব তা আপনাগ সাথে পরামিশ কইর্যা ঠিক করণ লাগব।
সের দশেক মরিচের গুড়া লইয়া আইমু, কি কও? রমিজ মিরধা বলে। ছাইয়ের লগে মিশাইয়া–
এখনতো কার্তিক মাস। বাতাসের জোর নাই। এখন ছাই উড়াইয়া কাম অইব না।
হ, ঠিকই। মেহের মুনশি বলে। মরিচের গুঁড়ায় পয়সা নষ্ট করণের দরকার নাই।
তাদের বিদায় দিয়ে ফজল নিজের ঘরে যায়। নূরুর হাতের-লেখার খাতা থেকে এক টুকরা সাদা কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে সে খুনের চরের নক্সা আঁকে। কোন দিক থেকে কখন কিভাবে আক্রমণ করলে জঞ্জুরুল্লার দলকে তাড়িয়ে দেয়া যাবে তার পরিকল্পনা ঘুরতে থাকে তার মগজের মধ্যে।
.
২২.
জোর যার মুলুক তার–সর্বজনবিদিত এ প্রবচনটি পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়ে চর অঞ্চলে যে রূপ নিয়েছে তা হচ্ছে–
জোর যার চর তার।
জোর কার, চর কার?
হাতিয়ার সাথী যার।
ঢাল, কাতরা, লাঠি, শড়কি, লেজা, চ্যাঙ্গা, গুলের বাঁশ ইত্যাদি হাতিয়ারগুলো চরবাসীদের সাথী। পুলিসের ভয়ে চর ছেড়ে পালাবার সময় ফজলদের দলের অনেকেই তাদের সাথী হারিয়ে বিপাকে পড়ে গিয়েছিল। হাতিয়ার ছাড়া চরে বসত করা যায় না। তাই কয়েক মাসের মধ্যে কষ্টেসৃষ্টে তারা তাদের হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে আবার।
ফজলও জানে দলের সবাই হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সে ছিল ফেরার, তারপর আবার জেলে। তাই হাতিয়ারগুলো দেখার সুযোগ পায়নি সে এতদিন। প্রত্যেকের হাতিয়ার ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। তার নির্দেশ মতো বিকেল বেলা নৌকার উওরায় লুকিয়ে সবাই নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে আসে ফজলের কাছে। হাতিয়ারগুলো মোটামুটি ভালোই বানিয়েছে বলে মনে হয় ফজলের। তবে কয়েকটা শড়কি ও লেজার হাতলে এর মধ্যেই ঘুণ লেগে গেছে। বাবাত্তি বাঁশ দিয়ে বানিয়েছে বলেই এ অবস্থা। হাতলগুলো বদলাতে হবে। দুটো গুলেল বাঁশের টঙ্কার কানে বাজে না তেমন। এগুলো বাতিল করে তিন দিনের মধ্যে নতুন বানিয়ে নিতে হবে। ঢাল অতি আবশ্যকীয় বস্তু। আস্ত বেত দিয়ে প্রত্যেকেই তৈরি করেছে নিজ নিজ ঢাল। ছোট বড় মিলিয়ে সংখ্যায় একশ’ চৌত্রিশটা। বারোটা বাদে সবগুলোয় কষ-কুঁড়োর মাজন লাগানো হয়েছে ঠিক মত। গাব বা উইর্যাম গোটার কষের সাথে পরিমাণ মতো চালের কুঁড়ো মিশিয়ে তৈরি হয় এ মাজন। এ মাজন কয়েক পোচ দিতে পারলে ঢাল খুব শক্ত-পোক্ত হয়, ঘুণ বাসা বাঁধতে পারে না। মাজন লাগাবার জন্য বারোটা ঢালের মালিকদের তিনদিনের সময় দেয় ফজল। ঘন গিঠযুক্ত চিকন পাকাঁপোক্ত বাঁশ দিয়ে তৈরি করতে হয় যার যার নিজের হাতের পাঁচ-হাতি লাঠি। ফজল এক একটা লাঠির দু’দিক ধরে হাঁটুর সাথে চাপ দিয়ে পরীক্ষা করে। চারটে লাঠি মটমটাৎ করে ভেঙেই গেল পরীক্ষার সময়। এ লাঠিয়ালদের নতুন লাঠি বানাবার জন্য সময় দেয়া হয় দুদিন। রামদা পাওয়া গেল মাত্র ছয়খানা। রামদা নিয়ে ডাকাতি করে ডাকাতরা। তাই পরিচিত লোহারু ছাড়া কেউ এ অস্ত্র বানিয়ে দিতে রাজি হয় না। ফজল বুড়ো আঙুলের মাথা দিয়ে ধার পরীক্ষা করে রামদাগুলোর। সবগুলোতেই পাইন দেয়া দরকার। কিন্তু দিঘিরপাড় বা হাশাইলের লোহারুর দোকানে এগুলো নিয়ে যাওয়া যাবে না। গেলেই সাথে সাথে রটে যাবে তাদের প্রস্তুতির খবর। এগুলো বালিগচার ওপর ‘করাইত্যা’ বালিতে ঘষে ধার উঠাবার চেষ্টা করতে হবে। ধার না উঠলেও চিন্তা নেই। কারণ রামদা দিয়ে তো মানুষ কাটতে যাচ্ছে না তারা। দাগুলোকে ঘষে চকচকে ঝকঝকে বানাতে হবে। দেখলেই যেন বিপক্ষীয় লড়িয়েদের পিলে চমকে যায়। রামদা কম থাকলেও ফজলের ভাবনার কিছু নেই। সে তো রামদাওয়ালা চাকরিয়া আনতেই যাচ্ছে দক্ষিণপাড়।
