চাকরিয়া প্রথমদিকে ছিল পঞ্চাশজন। ফজলকে পুলিস দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার পরও ছিল জনতিরিশেক। এরফান মাতব্বরের মৃত্যুর পর সব চাকরিয়া বিদায় করে দিয়েছিল জঙ্গুরুল্লা। ফজল জেল থেকে পালিয়ে আসার পর তিরিশ জনকে এনে রেখেছিল কিছুদিন। ফজলের। জেল হওয়ার পর আবার তাদের বিদায় দিয়েছে। ফজল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এসেছে শুনলে আবার চাকরিয়াদের ডাক পড়বে।
ফজলদের তৈরি বানার বেড় দিয়ে মাছ ধরছে জঙ্গুরুল্লার কোলশরিকরা। অনেক মাছ। সেগুলো নিকারির সেঁকে নিয়ে বিক্রি করে রোজ কমসে কম কুড়ি টাকা পায়। ঐ টাকার চার আনা ভাগ দিতে হয় জহরুল্লাকে।
টাকা আয়ের একটা নতুন পথ বার করেছে জঙ্গুরুল্লা। খুনের চরের উত্তর-পূর্ব কোণে। বিস্তৃত জায়গা জুড়ে যে ঘোঁজাটা, সেখানে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন জায়গার ছোট, বড়, খালি, মালবোঝাই নৌকা এসে পাড়া গাড়ে বিশ্রাম ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। জঙ্গুরুল্লা খুঁটিগাড়ি আদায়ের জন্য সে ঘোঁজা বন্দোবস্ত দিয়েছে রউজ্যা ডাকাতের কাছে। সে একশ থেকে দুশ মনি নৌকার জন্য আটআনা, দুশ থেকে চারশ-মনি নৌকার জন্য এক টাকা, চারশ-মনির ওপর হলে দুটাকা করে খুঁটিগাড়ি আদায় করে। জঙ্গুরুল্লাকে সে প্রতিমাসে দেয় তিনশ টাকা।
এত পয়সার আমদানি! এত নৌকা আসে কইতন? নৌকাতো বেশিভাগ আটক করছে সরকার। ফজল অবাক হয়ে বলে।
কিছু কিছু নৌকা লম্বর দিয়া ছাইড়া দিছে। রমিজ মিরধা বলে।
সে আর কয়ডা? ধান-চাউলের নৌকাও তো চলে না। নতুন আইন অইছে–এক জেলার ধান-চাউল অন্য জেলায় যাইতে পারব না।
ধান-চাউলের নৌকা ছাড়া আরো তো নৌকা আছে। মেহের মুনশি বলে। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস ভইর্যা চলছে আমের নাও আর কাঁডালের নাও। বাজে মালের নাও চলে বারোমাস। মওসুমের কতকত জিনিসরশুন, পেঁয়াজ, হলদি, মরিচ, তেজপাতা, নারকেল, সুপারি, হাজারো মাল এক জেলারতন আরেক জেলায় যায় এই নদী দিয়া।
আগের দিন অইলেতো টাকা দিয়া সিন্দুক বোঝাই কইর্যা ফেলাইত জঙ্গুরুল্লা।
হ ঠিক কথাই কইছ। রমিজ মিরধা বলে। আগের দিন অইলে রোজ আদায় অইত কমসে কম একশ ট্যাহা।
কিন্তু নৌকাওয়ালারা ঐ ঘোঁজায় নৌকা বান্দে ক্যান্। আরো তো কত ঘেঁজা আছে। সেখানে বিনে পয়সায় নৌকা রাখতে পারে।
অন্য ঘোঁজায় গেলে ডাকাতি অইতে পারে।কদম শিকারি বলে। এই আট-নয় মাসের মইদ্যে ছয়-সাতটা নৌকায় ডাকাতি অইছে! তারা পয়সা বাঁচাইতে গিয়া নাও রাখছিল অন্য ঘোঁজায়।
আসলে রউজ্যাই ডাকাতি করায় ওর লোকজন দিয়া। রমিজ মিরধা বলে। ডাকাতির ভয়ে বেবাক নৌকা খুনের চরের ঘোঁজায় আইস্যা খুঁটগাড়ি দিয়া খুঁডা গাড়ে।
ধান-চাউলের দাম কি বাজারে?
দাম অনেক বাইড়া গেছে। সোয়া দুই ট্যাহা মনের ধানের দাম চাইর ট্যাহা আর তিন ট্যাহা মনের চাউল ছয় ট্যাহা।
এই বছর বাচন কষ্ট আছে। কদম শিকারি বলে।
ধান বেশি অয় ভাটি অঞ্চল খুলনা বরিশালে আর উজান দেশ সিলেট ময়মনসিংয়ে। উত্তর বঙ্গের দিনাজপুরেও ধান বেশি অয়। ঐ সব জেলারতন ধান-চাউল আইতে দেয় না বুইল্যাইতো দাম এত বাড়তে আছে।
ধান-চাউল আইতে দেয় না ক্যান?
কি জানি, ব্রিটিশ সরকারের কি মতলব। জাপান বর্মা মুলুক দখল করছে। আসামের দিগে আগাইয়া যাইতেছে। ব্রিটিশ এইবার যুদ্ধের ঘাঁটি বানাইব এই দেশে। তারা সৈন্য আর যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়া আসছে। আরো অনেক আসব । এই সব লক্ষ লক্ষ সৈন্যদের খাওয়ান লাগব তো! তাই মিলিটারির জন্য ধান-চাউল মজুত করতেছে ব্রিটিশ সরকার।
হ আমিও হুনছি। মেহের মুনশি বলে। দিঘিরপাড়ের কেরাসিন তেলের পাইকার বলাই কুণ্ডু মাল আনতে গেছিল নারায়ণগঞ্জ। মাল পায় নাই। কেরাসিন তেল বোলে আর পাওয়া যাইব না। সে দেইখ্যা আইছে–শীতলক্ষাপড়ের আর চারগোপের পাটের গুদাম–ডেভিড কোম্পানীর ঐ সব বড় বড় পাটের গুদাম মিলিটারি দখল করছে। গাধাবোট, সুলুপ, ফেলাট, মাডুয়া নাও বোঝাই অইয়া ধান-চাউল আইতে আছে বিভিন্ন জেলারতন। মালগাড়ি ভইরা চাউল আহে দিনাজপুরতন। ওইগুলা জমা করতে আছে ঐ সব গুদামে।
বিদেশতন গমও নাকি আসতেছে জাহাজ বোঝাই কইরা। ফজল বলে। এইবার যে মাইনষের কপালে কি আছে, বলা যায় না। বর্মা মুলুকতন আগে চাউল আসত। মোটা পেশু চাউল। বর্মা এখন জাপানের দখলে। তাই ওইখানতন আর চাউল আসব না। সাংঘাতিক মুসিবত সামনে।
একটা কতা জিগাই মাতবরের পো। ধনু শিকদার বলে। আমরা হগল বচ্ছর ভাটি মুলুকে না অয় উজান দ্যাশে যাই ধান দাইতে। এইবারও মহাজন ঠিক করছি। কাতি মাসের এই কয়দিন পর ভাটি মুলুকে যাত্রা করতে চাই। দাওয়ালি নাও যাইতে দিব তো?
খালি নাও লইয়া যাইতে পারবেন। কিন্তু আসার সময় ধান লইয়া আইতে পারবেন না।
কষ্ট কইর্যা ধান কাটমু, মাড়াই করমু। হেই মিন্নতের ধানের ভাগ যদি না আনতে পারি, তয় মিন্নত কইর্যা লাভ কি? ক্ষোভ ও হতাশা ধনু শিকদারের কণ্ঠে।
আমরা ঢাকা-ফরিদপুরের দাওয়ালরা যদি না যাই তয়তো ভাটি আর উজান মুলুকের খেতের ধান খেতেই নষ্ট অইব। বলে আহাদালী।
তাতে অইবই। ব্রিটিশ সরকারের কি এখন এই দিগে খেয়াল আছে? তারা এখন যুদ্ধ লইয়া পেরেশান। ক্যামনে জাপানরে হটাইয়া নিজেগ রাজ্য উদ্ধার করব। ভারত ছাড় আন্দোলনের অনেক নেতা এখন জেলে। তারা আলোচনা করতে আছিল : আমাগ প্রধানমন্ত্রী হক সায়েবরে না জিগাইয়া ছোট লাট মিলিটারিগ লগে যুক্তি কইর্যা কয়েকটা জেলার ধান চাউল সরাইয়া দিছে বাংলার বাইরে, জাপান আইয়া পড়লে খাদ্যের অভাবে যাতে মুশকিলে পড়ে, লড়াই করতে না পারে। এই নিয়া হক সায়েবের সাথে ছোট লাটের বিরোধ চলতে আছে। রাজবন্দিরা আরো কইতেছিল–গুদামে গুদামে মিলিটারিরা ধান-চাউল জমা করতে আছে খালি তাগ খাওয়ার লেইগ্যা না। জাপান আইয়া পড়লে ওনারা বেবাক পোড়াইয়া দিয়া ভাইগ্যা যাইব। জাপানিরা খাদ্যের অভাবে আর লড়াই করতে পারব না।
