জঙ্গুরুল্লার নির্দেশমত জিলিপি খাওয়ানো হয়েছে রূপজানকে। সুবাসিত তেল মাখিয়ে রোজ চুল বেঁধে দিচ্ছে তার মা। দিনে তিনবার টোনার কথা বেশ জোর গলায় বলা হচ্ছে তার কাছে। কিন্তু তার মনের কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সে আগের মতোই অচল অটল।
রাতে বিছানায় শুয়ে রূপজান ঘুমের ভান করে থাকে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে উঠে বসে থাকে। ঘুমিয়ে পড়লেই স্বপ্ন দেখার ভয় আছে। আত্মাটা দেহ ছেড়ে চলে যাবে পীরের কাছে।
সে সারারাত জেগে থাকে। রাতের ঘুম সে পুষিয়ে নেয় দিনের বেলা ঘুমিয়ে।
রাতের নিঃসীম অন্ধকারে রূপজানের ব্যাকুল মন খুঁজে বেড়ায় ফজলকে। জেলের ভেতর সে এখন নিশ্চয় ঘুমিয়ে আছে। সে কি তাকে স্বপ্নে দেখে এখন। টোনা করে সে যদি আনতে পারত ফজলের আত্মাটাকে। আত্মাটা পাহারা দিতে পারত তার নিজের আত্মাটাকে।
বাড়ির সবাই তাকে বুঝিয়েছিল, ফজল ডাকাত। ডাকাতির মামলায় তার চৌদ্দ বছর জেল হবে। কেন সে তার জন্য নিজের জীবনটা নষ্ট করবে?
রূপজান তাদের কথা বিশ্বাস করেনি। ফজল ডাকাতি করতে পারে না–সে জানত। সেটাই এখন প্রমাণিত হয়েছে। সে ওভাবে জেল থেকে না পালালেই ভালো করত। জেল পালানোর অপরাধে সাজা খাটতে হতো না। যাক, মাত্র তিন মাসেরই তো ব্যাপার। দেখতে দেখতে জেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। ফিরে আসবে ফজল।
কিন্তু ফিরে এলে তার কি লাভ? সে-তো তাকে তালাক দিয়ে গেছে। আর তো সে তাকে ঘরে নিতে পারবে না।
তবুও ফজল জেল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক মনে মনে সে এ প্রার্থনা করে দিনরাত।
আরশেদ মোল্লার প্রার্থনা কিন্তু তা নয়। ফজলের জেলের ভাত যত দেরিতে ফুরোয় এই তার কামনা। মাত্র কয়েক দিন হলো রূপজানকে জিলিপি খাওয়ানো হয়েছে। এর আছর হতে সময় লাগবে। কিন্তু বেশি সময় নিলে তো মহামুশকিল হয়ে যাবে। ফজল ফিরে এলে একটা কিছু গোলমাল বাঁধিয়ে দিতে পারে–এই তার ভয়।
পদ্মার স্রোতের মতো সময় বয়ে যাচ্ছে। একমাস পার হয়ে গেছে এর মধ্যে। কিন্তু একটুকুও পরিবর্তন হয়নি রূপজানের। তার মা টোনার প্ররোচন-বাক্য উচ্চারণ করলেই সে কানে আঙুল দেয়, পা উঁচিয়ে মেঝের ওপর লাথি মারে আর বলে, টোনার কপালে লাথি, টোনার মুখে লাখি।
ছি মা, অমুন করিস না। আল্লাহ্ গুনা লেখব, চুপ কর। তোর বাজান হুনলে কাইট্যা ফালাইব। সোনাইবিবির কণ্ঠে অনুনয়ের সুর।
রূপজান চুপ করে না। সে এবার বাঁ পা দিয়ে বারবার লাথি মারে মেঝের ওপর। আর দাঁত কিড়মিড় করে বলে, টোনার মাজায় বাইয়া ঠ্যাঙ্গের লাথি। একশো একটা লাথি।
সোনাইবিবিও চায়না জাদু-টোনার আছর পড়ুক রূপজানের ওপর। কিন্তু স্বামীর আদেশ অমান্য করার সাহস নেই তার। তাই দিনে তিনবার সে টোনার কথা শোনায় রূপজানকে। প্রত্যেক বারই কানে আঙুল দেয় রূপজান। থুক ফেলে, লাথি মারে মেঝেতে। সোনাইবিবির চোখ থেকে ধারা নামে। বুক ভেঙে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।
পীরবাবার তুকতাকে কাজ হচ্ছে না কেন বুঝতে পারে না আরশেদ মোল্লা। এদিকে দিন যে আর বেশি বাকি নেই। কার্তিক মাস শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরেই বেরিয়ে যাবে ষণ্ডাটা। এখন উপায়?
আরশেদ মোল্লা পরামর্শের জন্য ছোটে জঙ্গুরুল্লার বাড়ি।
পীরবাবার তুকতাকে রূপজানের মন টলেনি শুনে ভাবনায় পড়ে জঙ্গুরুল্লাও। আরো কড়া, আরো তেজালো বশীকরণমন্ত্র নিশ্চয়ই জানা আছে পীরবাবার। কিন্তু আর যে বেশি সময় নেই। ফজল জেল থেকে বেরিয়ে এসে গোলমাল বাঁধাবে, তার জন্য মোটেও ভাবে না সে। ফজলতো একটা পিঁপড়ে তার কাছে। খালি একটু চোখের ইশারা ব্যস এক ডলায় খতম। তার ভাবনা শুধু পীরবাবার জন্য। এই চান্দের মাসের পনেরো তারিখে তার মেয়ের শাদি-মোবারক। আর মাত্র তেরো দিন বাকি আছে। পাঁচ দিন পরে তিনি নিজের ‘ওয়াতন’ ফুলপুর চলে যাবেন। সুতরাং তিন-চার দিনের মধ্যেই শুভ কাজটা সমাধা করা দরকার।
শোন মোল্লা, মাইয়ার মনের দিগে চাইয়া থাকলে কোনো কাম অইব না। জঙ্গুরুল্লা বলে। বিয়ার কলমা পড়লে আর পুরুষ মাইনষের হাত লাগলে সব ঠিক অইয়া যাইব।
আমার মনে অয় চদরী সাব, মাইয়ারে কবুল করান যাইব না। আপনে জুয়ান দেইখ্যা একটা পোলা ঠিক করেন।
দ্যাখো মোল্লা, আমার যেমুন কথা তেমুন কাম। পীরবাবারে তোমার মাইয়া দিমু বুইল্লা নিয়াত কইর্যা রাখছি। এই নিয়াত ভাঙতে পারমু না।
কিন্তু চদরীসাব, মাইয়া কবুল না করলে কি করবেন?
কবুল করাইতে অইব। যদি এই শাদি না অয় তবে আর জমির ধারে কাছে যাইতে পারবা না। কইয়া দিলাম।
আরশেদ মোল্লা কুঁকড়ে যায়। সে হাতজোড় করে বলে, এট্টু রহম করেন, চদরীসাব। বেকচরের অর্ধেক জমি গাঙে খাইয়া ফালাইছে। আপনের জমিই এখন ভরসা। জমি লইয়া গেলে খাইমু কী?
কী খাইবা, আমি কী জানি। জমি খাইতে অইলে আমার কথা মতন কাম করণ লাগব।
হ, আপনে যা শুকুম দিবেন সেই মতন কাম করমু।
জঙ্গুরুল্লা হেসে বলে, তুমি হুকুমরে শুর্দু কইর্যা শুকুম কইলা বুঝিন? আসলে হুকুম কথাড়াই শুর্দু, বোঝলা মিয়া? ভর্দ লোকেরা শুকুম কয় না, হুকুম কয়। আমার এই হুকুমের কথা মনে রাইখ্য সব সময়।
একটু থেমে আবার বলে জঞ্জুরুল্লা, পীরবাবার গায়ের রং দ্যাখছো? এক্কেরে হবরী ক্যালার মতন। তিনার লগে কি আন্দুরা-বানদুরা কালাকষ্টি মাইয়ার শাদি দেওন যায়? তিনার রঙের লগে মিশ খাইব তোমার মাইয়ার রং। এহন বোঝতে পারছ–কিয়ের লেইগ্যা আমি এত তেলামাখি করতে লাগছি তোমারে?
