পীর বাবাতো বুড়া মানুষ। ওনার আবার শাদি করণের খায়েশ অইল ক্যান্?
আরে পীরবাবার খায়েশ থাকুক আর না থাকুক, আসলে খায়েশটা অইছে আমার। পীরবাবা বুজুর্গ মানুষ। আল্লার পিয়ারা দোস্ত। তিনারে যদি আমাগ চরে রাখন যায়, তয় বালা-মসিবত আইতে পারব না। দ্যাখো না ক্যান্, রাইস্যা গাঙ ক্যামনে ভাইঙ্গা রসাতল কইরা লইয়া যায় আমাগ চরগুলা। উনি যদি আমাগ লগে আমাগ চরে বসত করেন তয় কোনোদিন চর ভাঙতে পারব না। আমাগ চরডা অনেক পুরান আর বড়। দক্ষিণ-পশ্চিম দিগ দিয়া এট্টু-এট্টু ভাঙতে শুরু করছে। পীরবাবারে আইন্যা এই ভাঙন ঠেকাইতে অইব। তারপর তোমার কানে কানে কই একটা কথা। কারো কাছ ভাঙবা না কিন্তুক। জঙ্গুরুল্লা আরশেদ মোল্লার কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলে, পীরবাবা যখন ইন্তিকাল করবেন তখন ওনারে কবর দিমু আমাগ চরে। তারপর আল্লায় মকসুদ পুরা করলে কবরডারে পোস্তা কইর্যা দিমু। তখন আল্লায়ই হেফাজত করব তার পিয়ারা দোস্তের কবর। এর পর গাঙ ক্যান্, গাঙ্গের বাপেরও পাওর’থাকব না এই চর ভাঙনের।
একটু দম নিয়ে আবার বলে সে, যেই মতন মনে মনে ঠিক কইর্যা রাখছি, হেই মতন ঠিক ঠিক যদি কামডা অইয়া যায়, তা অইলে আরো ফয়দা অইব। তোমার মাইয়ারও কপাল খুইল্যা যাইব তখন, হুঁহ্ হুঁহ!
মাইয়ার কপাল খুলব! আরশেদ মোল্লার কণ্ঠে বিস্ময়। ক্যামনে খুলব?
হেইডাও এহনই জানতে চাও? কইবা না তো কাওর কাছে?
না–না, কইমু না। আপনি কইয়া ফেলেন।
তুমি পীর-দরবেশের মাজার দ্যাখছো?
দেখছি।
কত দ্যাশ-বিদ্যাশের মানুষ যায় মাজারশরিফে। কত সৰ্মান! কত পয়সার আমদানি! পীরবাবারে আমাগ চরে কবর দিতে পারলে আমারও মাজারশরিফ বানাইতে পারমু। তখন মিয়া তোমার মাইয়া ছালা ভইরা ফালাইব টাকা দিয়া।
আরশেদ মোল্লার চোখে-মুখে খুশি ঝিলিক দিয়ে ওঠে।
এখন তুমি কও, পীরবাবারে ক্যামনে ভুলাইয়া রাখন যায়? ক্যামনে আটকাইয়া রাখন। যায় আমাগ চরে?
সোন্দর দেইখ্যা একটা শাদি করাইয়া দিলে–
এইতো এইবার বুইঝ্যা ফালাইছ। যেমুন-তেমুন আনদুরা-বানদুরা মাইয়ার লগে শাদি দিলে কাম অইব না। তার লেইগ্যা মাইয়া চাই বেহেশতের হুরির মতন সোন্দর, খুবসুরত। এইডা চিন্তা কইর্যা আমি তোমার মাইয়া ঠিক করছি। তোমার মাইয়ার মতন সোন্দর ঢক চেহারার মাইয়া আমাগ এই চরে-চঞ্চালে আর একটাও নাই। তোমার মাইয়ারে দ্যাখছে পীরবাবা, বজরা দিয়া যাইতে আছিল, হেই সময় একদিন আমারে কয়, অ্যায়ছা খুবসুরত লারকি হামি কোনোদিন দেখে নাই। হামার মুলুকেও এমুন চুন্দর লাড়কি নাই। এহন বোঝতে পারছ তো? তোমারে বুঝানের লেইগ্যা অনেক কথা খরচ করলাম।
আমিতো বেবাক বোঝলাম। মাইয়াতো বোঝতে চায় না।
বোঝতে চাইব একশবার। ছালা-ছালা টাকার কথা শোনলে এক কথায় কবুল কইরা ফালাইব। তুমি তোমার বিবিরে বুঝাইয়া কইও বেবাক কথা। সে যে মাইয়ার কানে কানে কয় সব।
আইচ্ছা কইমু।
এইবার তা অইলে তুমি শাদির ইন্তিজাম করো।
কবে, দিন-তারিখ কইয়্যা দ্যান।
আইজ রবিবার। তারপর সোম, মঙ্গল, বুধ। হ্যাঁ বুধবারই বিয়ার তারিখ ধার্য করলাম। আরে দ্যাখো তো কি কারবার। যার বিয়া তার দ্যাখতে মানা। আরে আসল কথাডাই ভুইল্যা গেছিলাম। যার শাদি তারে না জিগাইয়া তারিখ ধার্য করণ ঠিক না। আমি পীরবাবার লগে কথা কইয়া দেখি।
বাড়ির ঘাটে বাঁধ আছে ফুলপুরী পীরের বজরা। জঙ্গুরুল্লা বজরার কক্ষে ঢুকে দেখা করে তাঁর সাথে। অনেকক্ষণ পরে সে বেরিয়ে আসে। চোখে-মুখে উৎসাহের যে দীপ্তি নিয়ে সে গিয়েছিল, তা আর নেই এখন। আরশেদ মোল্লা তার অন্ধকার মুখের দিকে চেয়ে থাকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে।
জঙ্গুরুল্লা তার কাঁঠাল কাঠের খাস চেয়ারটায় বসে বলে, জবর একটা ভুল কইর্যা ফালাইছি। মাইয়ার মন এহনো নরম অয় নাই, এইডা কওনে সব্বনাশ অইয়া গেছে। পীরবাবা কয়–তব শাদি নেহি হোগা। তারে অনেক বুঝাইলাম–সব ঠিক অইয়া যাইব। কিন্তু কিছুতেই সে রাজি অইতে চায় না। হেষে অনেক কষ্টে রাজি করাইছি। কিন্তুক শাদি এহন অইব না। উনি যহন শীতকালে আবার তশরিফ নিব, তহন তোমার মাইয়ারে উড়াইয়া দিমু তিনার আতে।
কিন্তু মাইয়া যদি ঐ সময়েও রাজি না অয়?
রাজি করান লাগব। রাজি করানের দাওয়াই দিব পীরবাবা। ওনার ছিনার মধ্যে অনেক এলেম, বেশুমার মারফতি-কেরামতি, মন্তর-তন্তর। অনেক জিন তিনার হুকুমের গোলাম। তোমার মাইয়া বশ করতে জিন চালান দিব এইবার।
ওরে ডাক্কুসরে। না চদরীসাব, জিন-পেরেতের দরকার নাই।
আরে ওনারাতো পীরবাবার পোষা জিন। কোনো লোসকান করব না। এইবার মাইয়া ঠিক অইয়া যাইব। তুমি কোনো চিন্তা কইর্য না। কোনো ডর নাই তোমার। বাজারের বেইল অইয়া গেছে। এইবার বাড়িত যাও।
আরশেদ মোল্লা তার ডিঙি বেয়ে বাড়ি রওনা হয়।
কোনো ডর নাই, কোনো চিন্তা নাই। কিন্তু যার ডরে সে অস্থির সে জেল থেকে বেরিয়ে আসছে কিছুদিনের মধ্যেই। ফজল বেরিয়ে যদি শুনতে পায়–রূপজান তার জন্য সব সময়ে কাঁদে, জাদু-টোনা করেও তাকে ভোলানো যায়নি তার কথা, তবে তো সে তুফান ছুটিয়ে দেবে। লোক-লশকর নিয়ে হাজির হবে তার বাড়ি। ধরে নিয়ে যাবে রূপজানকে।
আরশেদ মোল্লার মাথার মধ্যে কেমন একটা দপদপানি শুরু হয়।
