উকিল ধরে শেষে আদালতে আত্মসমর্পণই করে ফজল।
আবার হাজতবাস। তবে কিছু দিনের মধ্যে তার বিচার শুরু হয়। ডাকাতি মামলায় অনর্থক গ্রেফতার, বিনা অপরাধে দীর্ঘদিন হাজতবাস, স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ ইত্যাদি কারণগুলো তার জেলভাঙার অপরাধের গুরুত্ব অনেকখানি কমিয়ে দেয়। এটাও প্রমাণিত হয়–সে জেল ভাঙেনি। জেল ভেঙেছিল বিপ্লবী রাজনৈতিক দল। সে শুধু সুযোগ বুঝে পালিয়েছিল। বিচারক এসব বিবেচনা করে তার রায় দেন। মাত্র তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে।
ফজলের সাজা হয়েছে শুনে আরশেদ মোল্লা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে তার।
ফজল জেল থেকে পালিয়ে এসেছে শুনে সে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। রূপজানকে সে ভাগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এই ছিল তার ভয়। মেয়ের মতিগতিও ভালো মনে হয়নি। পানি আনার নাম করে সে নদীর ঘাটে গিয়ে প্রায়ই চুপচাপ বসে থাকত। তাকে চোখে-চোখে রাখতে হতো সব সময়। ঐদিন পুলিস দিয়ে ধরিয়ে না দিলে ফজল তাকে নিশ্চিয় ভাগিয়ে নিয়ে যেত। রূপজানও তৈরি ছিল, ঘর থেকে বেরুবার চেষ্টাও করেছিল। ভাগ্যিস উঠানে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল সে, আর ঠিক সময়ে পুলিস এসে পড়েছিল।
রূপজান এখনো প্রায়ই নদীর ঘাটে গিয়ে বসে থাকে। তবে পালিয়ে যাওয়ার ভয় আর নেই। এবার দিন-তারিখ ঠিক করে শুভ কাজটা সমাধা করতে পারলেই সব ঝঞ্ঝাট চুকে যায়।
ফুলপুরী পীরবাবা আরো কিছুদিন থাকবেন এ অঞ্চলে। জঙ্গুরুল্লাও তাগিদ দিচ্ছে। বারবার। কিন্তু রূপজানকে কিছুতেই রাজি করানো যাচ্ছে না। সে তার মা-কে সোজা বলে দিয়েছে, আমারে বিয়া দিতে পারবা না। পারবা আমার লাশটারে বিয়া দিতে। বেশি জোরাজুরি করলে গলায় দড়ি দিমু।
মহাভাবনায় পড়ে যায় আরশেদ মোল্লা। নিরুপায় হয়ে সে জঙ্গুরুল্লার কাছে গিয়ে সব খুলে বলে। জঙ্গুরুল্লা শুনে হো-হো করে হেসে ওঠে। বলে, তুমিও যেমুন! মাইয়া রাজি অয়না ক্যান্? পীরবাবার পাকনা দাড়ি দেইখ্যা বুঝিন পছন্দ অয়না মাইয়ার?
হ ঠিকই ধরছেন।
আরে মিয়া, তুমি তো একটা জাহিল। রসুলে করিমের বয়স যখন পঞ্চাশের উপরে তখন তিনি হজরত আয়েশাকে বিয়া করেন। তুমি জানো, বিবি আয়েশার বয়স তখন কত?
তেনারাতো আল্লার পিয়ারা। তেনাগো লগে আমাগো লগে তুলনা অয়?
আরে রসুলে করিম যা কইর্যা গেছেন সেই মতন কাম করা তো সুন্নত–অনেক সওয়াবের কাম। পীরবাবা আল্লার পিয়ারা দোস্ত। তার লগে মাইয়া বিয়া দিলে গুষ্টিশুদ্ধ বেহেশতে যাইতে পারবা।
কিন্তুক মাইয়ারে যে রাজি করাইতে পারলাম না। সে কয়–আমার লাশটারে বিয়া দিতে পারবা।
সবুর করা। এট্টু বসো তুমি। আমি জিগাইয়া আসি পীরবাবারে। তিনার কাছে এই ব্যারামেরও ওষুধ আছে।
কিছুক্ষণ পরে জঙ্গুরুল্লা ফিরে আসে। বলে, শোন, মোল্লা, তুমি বাজারে যাও। এক মূলের সোয়াসের জিলাফি আর এক শিশি সুবাসিত তেল নিয়া আসো। দরাদরি কইর্য না কিন্তুক। যা দাম চাইব তাই দিয়া কিনবা। তেলের নামডা যে কি কইল বাবা? হ হ মনে পড়ছে, রওগনে আম্বর। ঐ ডা না পাইলে যে কোনো সুবাসিত তেল আনলেই চলব।
পরের দিনই আরশেদ মোল্লা জিলাপি আর একশিশি কামিনীকুসুম কেশ তৈল নিয়ে আসে জঙ্গুরুল্লার বাড়ি।
জঙ্গুরুল্লা ওগুলো নিয়ে যায় পীরবাবার বজরায়। তিনি মন্ত্রতন্ত্র পড়ে ওগুলোতে ফুঁ দিয়ে ফেরত দেন। উপদেশও দেন কিছু।
জঙ্গুরুল্লা জিনিসগুলো আরশেদ মোল্লার হাতে দিয়ে বলে, এই জিলাফি খাওয়াইবা মাইয়ারে। আর এই তেল সে মাথায় দিব। তারপর দ্যাখবা মিয়া, ক্যামনে নাচতে নাচতে তোমার মাইয়া আইয়া পড়ে পীরবাবার ঘরে।
এতগুলা জিলাফি একলা মাইয়ারে দিলেতো সন্দ করব।
না মিয়া, খালি মাইয়ারে দিবা ক্যান্? তোমার বউ-পোলা-মাইয়া বেবাকগুলারে খাওয়াইবা।
এইডা কি কতা কইলেন চদরীসাব? হেষে আমার কবিলার উপরেও যদি টোনার আছর অয়?
জঙ্গুরুল্লা খিকখিক করে হেসে ওঠে। কোনো রকমে হাসি চেপে সে বলে, ও তোমার বুঝিন ডর লাগছে? তুমি মনে করছ তোমার কবিলা নাচতে নাচতে আইয়া পড়ব মন্তরের ঠেলায়। উঁহু, হেইডা চিন্তা কইর্য না। তোমার মাইয়ার নাম লইয়া মন্তর পড়া অইছে এই জিলাফি আর তেলের উপরে। আর কোনো মাইনষের উপরে আচর অইব না।
ঠিক কইলেন তো?
আরে হ হ হুগনা ওলানের তন দুধ দোয়ানের কারো এমুন আহেঙ্কাত নাই। এইবার যাও। বিছমিল্লাহ বুইল্লাথুরি না-না, বিছমিল্লাহ কওনের দরকার নাই। বিছমিল্লাহ কইয়া মোখে দিলে বেবাক বিষ পানি অইয়া যায়। জাদু-টোনার মন্তর-তন্তর ফুক্কা অইয়া যাইতে পারে, বোলা মিয়া?
আরশেদ মোল্লা জিলিপির পুটলি ও তেলের শিশি হাতে নেয়।
আর শোন, পীরবাবা আর একটা কথা কইয়া দিছেন। জিলাফি খাওনের তিনদিন পর যখন জিলাফির মন্তর গিয়া ঢুকব শরীলের মইদ্যে তখন মাইয়ারে টোনার কথা জানাইতে অইব। তোমার বিবিরে তালিম দিয়া দিও। এমুন কইরা কইতে অইব ‘পীরবাবা তোরে টোনা করছে, রাইতে খোয়বে পীরবাবার কাছে চইল্যা যাবি। তুই ঘুমাইলে তোর রুহু চইল্যা যাইব পীরবাবার কাছে। এই কথাগুলা দিনে তিনবার–ফজর, জহুর আর এশার নামাজের পর। কওন লাগব। মনে থাকব তো?
হ থাকব। এহন যাই।
জঙ্গুরুল্লাকে ‘আসলামালেকুম’ দিয়ে আরশেদ মোল্লা বাড়ির দিকে রওনা হয়।
