জরিনার মনের মেঘে উষার অরুণিমা। ফজল হবে তার দোজখের সাথী। কিন্তু এ দুনিয়ায়?
এ দুনিয়ায় ফজল একা। তার সাথী নেই। তার নিজেরও কি সাথী আছে?
ফজলের জন্য তার মনে রয়েছে মমতার এক গভীর সরোবর। তাতে এবার জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। মমতা-সরোবর থেকে নির্গত হচ্ছে মেহগঙ্গা। সমস্ত বাঁধ-বাধা ভেঙে, ডিঙিয়ে দুর্বার স্রোতের অধঃপতন ঘটছে এক অন্ধকার কুহরে।
জরিনা চেয়ে থাকে ফজলের মুখের দিকে। সে মুখমণ্ডল জুড়ে থমথমে বিষাদের ছায়া। জরিনার চোখ ছলছল করে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ফজলের আরো কাছে গিয়ে বসে। তার কপালের ওপর থেকে সে চুলের গোছাটি আঙুল দিয়ে তুলে দেয় মাথার ওপর। কপালে হাত বুলায়।
ফজলের ঘুম ভেঙে যায়। সে চোখ মেলে। জরিনার মাথা ঈষৎ ঝুঁকে আছে তার মুখের ওপর। চেয়ে আছে নির্নিমেষ। মমতামাখা দুটি চোখ। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু ঝরছে।
ফজলের চোখও ছলছল করে ওঠে। তার পিপাসাজর্জর মন মরীচিৎকার পেছনে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। হঠাৎ সে দেখতে পায় স্নেহ-ভালোবাসার এক বিশাল সরোবর। তার পানি স্বচ্ছ কি পঙ্কিল যাচিয়ে দেখে না সে। দেখবার প্রয়োজনও বোধ করে না। সে হাত বাড়িয়ে জরিনাকে কাছে টেনে নেয়। জরিনা বাধা দেয় না।
.
২০.
বগাদিয়ার কোলশরিক কোরবান ঢালীর পুতের বউ সবুরন মোরগের বাকেরও আগে নদীর ঘাটে গিয়েছিল ফরজ গোসল করতে। অনেকক্ষণ পরে ঘুম ভেঙে বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে তার স্বামী সোরমানও যায় গোসল করতে। এত সময়ের মধ্যেও সবুরন ঘরে ফিরে আসেনি আর নদীর ঘাটেও তাকে দেখতে পায় না সোরমান। গোসলের পর পরবার জন্য যে শাড়িটা সে নিয়ে গিয়েছিল সেটা পড়ে রয়েছে পাড়ে তুলে রাখা একটা ওচার ওপর। সোরমানের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। সবুরনকে কুমিরে নিয়ে যায়নি তো!
তার ডাক-চিৎকারে বাড়ির ও আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। কয়েকজন লগি মেরে মেরে নদীর কিনারায় খোঁজ করে। কয়েকটা নৌকা নিয়ে কয়েকজন খোঁজ করে এ-চর ও চর। কিন্তু সবুরনের কোনো হদিস পাওয়া যায় না। সে কোথাও কারো সাথে পালিয়ে যায়নি–এ ব্যাপারে সবাই একমত। বছর খানেক আগে বিয়ে হয়েছে। হেসে-খেলে দিব্যি ঘর-সংসার করছিল মেয়েটি।
পালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণও ঘটেনি। আর পালিয়ে গেলে শাড়িটা নিশ্চয়ই নিয়ে যেত। সে সাঁতার জানে। সুতরাং পানিতে ডুবে মরার কথাও নয়। তবে কি সত্যি সত্যি কুমিরেই নিয়ে গেছে?
কিন্তু একদিন এক রাত পর ভোরবেলা যখন তাকে নদীর সেই একই ঘাটে পাওয়া গেল তখন সবাই বিস্ময়ে হতবাক। সবুরন কেমন যেন সম্মোহিত, বাহ্যজ্ঞানশূন্য। তার মুখে কথা নেই। অনেক সময় ধরে ঘোমটা টেনে সে বসে থাকে এক জায়গায়। কারো প্রশ্নের উত্তর সে দেয় না। সকলের দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটির ওপর জিনের দৃষ্টি পড়েছে এবং জিনই তাকে নিয়ে গিয়েছিল?
খবরটা লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সারা চর অঞ্চলে। লোকের মুখে এ-ও শোনা যায়–সবুরনের শরীরে, শাড়ি-ব্লাউজে মন-মাতানো খোশবু। সে নাকি জিন-পরীর দেশ কোহকাফ-এর খোশবুর নহরে ডুব দিয়ে এসেছে।
জরিনার কাছে খবরটা পায় ফজলও। সে মনে মনে হাসে আর এই ভেবে স্বস্তি বোধ করে যে নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে বউটির ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবন রক্ষা পেয়ে গেল।
ফজলের মনে পড়ে যায় একদিনের কথা। মাস ছয়েক আগে সে মাছ বিক্রি করতে গিয়েছিল তারপাশা, মাছের চালানদারদের কাছে। তারপাশা স্টেশনে অপেক্ষমান কয়েকজন স্টিমার-যাত্রীর মধ্যে তর্ক হচ্ছিল। ফজল মনোযোগ দিয়ে শুনছিল পাশে দাঁড়িয়ে। একজন বলছিল, জিনের কথা কোরানশরিফে লেখা আছে। আর একজন বলছিল, হ্যাঁ লেখা আছে ঠিকই। কিন্তু জিন কী, কেমন, কোথায় থাকে তার কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই। কোরানশরিফের একজন অনুবাদক তার টীকায় লিখেছেন-’কোরান শরিফের কোনো কোনো আয়াতে জিনের উল্লেখে যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তা থেকে মনে হয়, সুচতুর বিদেশী বোঝাবার জন্য জিন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
ফজল মনে মনে বলে, ঠিকই, বউটারে জিনেই ধইর্যা লইয়া গেছিল।
ফজল আরো খবর পায়–ফুলপুরী পীরবাবাকে নিয়ে জঙ্গুরুল্লা আগামী শনিবার বগাদিয়া যাচ্ছে। জিন চালান দিয়ে জিনের দৃষ্টি থেকে পীরবাবা সবুরনকে উদ্ধার করবেন।
.
কোনো সাক্ষী-সাবুদ পায়নি বলে ডাকাতি মামলাটা দাঁড় করাতে পারেনি পুলিস। তাই খারিজ হয়ে গেছে মামলা। কিন্তু জেলভাঙার অভিযোগ আছে ফজলের বিরুদ্ধে। তাকে ধরবার জন্য মাঝে মাঝে হানা দেয় পুলিস।
পালিয়ে পালিয়ে আর কতদিন থাকা যায়? পালাবার আর জায়গাও নেই। জরিনার শাশুড়ি ফিরে এসেছে। সে বাড়িতে যাওয়া যায় না আর। তাকে ধরবার জন্য আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি ঘেরাও করে তল্লাশি চালিয়েছিল পুলিস। এভাবে বেইজ্জত হওয়ায় অনেকেই বিরক্ত হয়ে গেছে তার ওপর। তাদের বাড়িতে আশ্রয়ের জন্য আর যাওয়া যায় না। বর্ষার পানিতে ডুবে গেছে মাঠ-ঘাট। ঝপাঝপ বৃষ্টি নামে যখন তখন। এ দিনে পাটখেতে বা বনবাদাড়ে লুকিয়ে থাকবার উপায় নেই। শিকারির ভয়ে ভীত এ পশুর জীবন আর ভালো লাগে না ফজলের। জেল থেকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে পালিয়েছিল তার একটাও সফল হয়নি। না পারল সে প্রতিশোধ নিতে, না পারল চরটা আবার দখলে আনতে। এভাবে পালিয়ে বেড়ালে কোনো কাজই সমাধা হবে না–সে বুঝতে পারে। অনেক ভেবেচিন্তে মেহের মুনশির সাথে পরামর্শ করে সে মহকুমার আদালতে আত্মসমর্পণ করাই সমীচীন মনে করে।
