গভীর ঘুমে অচেতন ফজল। তার প্রশস্ত রোমশ বুক ওঠা-নামা করছে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে। লুঙ্গির গেরো শিথিল হয়ে নেমে গেছে নাভির নিচে। দুটি উরুর অনেকটা উদলা লুঙ্গি ওপরে উঠে যাওয়ায়। জরিনা লক্ষ্য করে মুখের রঙের চেয়ে অনেক ফরসা উরুর রঙ। সর্বক্ষণ কাপড়ে ঢাকা থাকার ফলে রোদে পুড়ে উরুর রঙ তামাটে হতে পারেনি। টেকির কাতলার মতো মোটা মজবুত দুই উরু।
কপালের চুলের গোছাটি ঘুরিয়ে মাথার ওপর তুলবার জন্য জরিনার আঙুল নিশপিশ করে। কিন্তু সে সংযত করে নিজেকে।
জরিনা একটা কাঁপুনি অনুভব করে তার বুকের মধ্যে। কাঁপুনিটা ছড়িয়ে যায় সারা শরীরে। তার মনের বন্য বাসনা পলিমাটির বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চায়।
জরিনা চোখ বোজে, মনে মনে কি যেন আওড়ায়। সে বুকে ফুঁ দেয়, ডানে বায়ে ফুঁ দেয়।
ঢেউ থামে। দিশেহারা বাসনা ধীরে ধীরে উৎসে ফিরে যায়।
কিছুক্ষণ পরে চোখ মেলে জরিনা। ফজল একই অবস্থায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে।
পাটগাছের আগায় আঁশ বাঁধিয়ে ঝুলছে একটা শুয়াপোকা। নিজের শরীর থেকে নির্গত আঁশের সাথে ওটা ঝুলছে, দুলছে বাতাসে আর নেমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
কি বিশ্রী কদাকার জীব। জরিনার শরীরের রোম খাড়া হয়ে ওঠে। হলদে বিছাটা মাটিতে পড়েই শুয়াভরা শরীর দুলিয়ে চলতে শুরু করে ফজলের দিকে।
ইস্! খুশির আর সীমা নাই! জরিনা মনে মনে বলে। অমন সোন্দর শরীলে উঠতে দিমু তোমারে!
তারই দেয়া কেরোসিন তেলের বোতলটা হাতের কাছেই রয়েছে। ওটার তলা দিয়ে সে পোকটাকে পিষে দেয় মাটির সাথে।
পাটগাছের পাতায় পাতায় অসংখ্য গুঁয়াপোকা। প্রজাপতি ডিম পাড়ে পাটপাতার ওপর। ডিম থেকে ফুটে বেরোয় শুয়াপোকা। পাটের কচিপাতা খেয়ে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে ওরা। কয়েকটা পোকা নিজের শরীর থেকে নিঃসৃত আঁশ দিয়ে পাটপাতা মুড়িয়ে গুটি তৈরি করছে।
স্বেচ্ছাবন্দি বয়োজ্যেষ্ঠ য়াপোকারা মুক্তির সাধনায় ধ্যানমগ্ন গুটির ভেতর। একটার মুক্তিলাভ ঘটে জরিনার চোখের সামনেই। গুটি ভেঙে একটা হলদে প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। পাতা আঁকড়ে ধরে ওটা পাখা দোলাচ্ছে। জরিনা চেয়ে থাকে ওটার দিকে।
আহা কি সুন্দর!
এমনি হলদে রঙের একটা শাড়ি দেখেছিল সে রূপজানের পরনে। শাড়ির আঁচলটা বাতাসে ফুরফুর করে উড়ছিল প্রজাপতির পাখার মতোই। তার মনে হয় এই হলদে প্রজাপতিটার মতোই সুন্দরী রূপজান।
ফজলের দিকে আবার চোখ নেমে আসে জরিনার। ঘুম তার এত গভীর যে একবারও পাশ ফিরে শোয়নি সে এতক্ষণের মধ্যে।
তার মাথার কাছেই পিড়াপিড়িয়ে হাঁটছে একটা কদাকার শুঁয়াপোকা।
জরিনা বোতলের তলা দিয়ে এটাকেও পিষে ফেলে।
এ পোকার শুয়ায় নাকি বিষ আছে। শুয়া শরীরের কোথাও লেগে গেলে ফুলে যায়, শেষে পেকে পুঁজ হয়।
জরিনা একটা পাটগাছের আগা ভাঙে। মাথার পাতাগুলো রেখে বাকিগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেয়। এবার এটাকে বোতলের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। কেরোসিন-ভেজা পাতাগুলো সে এবার বুলিয়ে দেয় মাদুরের কিনারায়। বারবার কেরোসিনে ডুবিয়ে সে মাদুরের চারপাশটা ভিজিয়ে। দেয়। কেরোসিনের দুর্গন্ধে ফজলের কাছে এগুতে পারবে না কদাকার পোকাগুলো।
স্বস্তি বোধ করে জরিনা। কিন্তু নবজাত প্রজাপতির একটা উড়ে এসে বসে ফজলের ঊরুর ওপর। ওটাকে তাড়াবার জন্য সে হাত বাড়ায়। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হয়, রূপজানই বুঝি প্রজাপতির রূপধরে এসে বসেছে ফজলের গায়ে। সে হাত টেনে নেয়, পলকহীন চোখ মেলে চেয়ে থাকে প্রজাপতিটার দিকে। কি সুন্দর! ওটার তুলনায় নিজেকে মনে হয় একটা শুয়াপোকা। ফজলের গায়ে বসবার অধিকার নেই শুয়াপোকার।
কদাকার ওয়াপোকা গুটির কবরে গিয়ে সুন্দর প্রজাপতির রূপ লাভ করে। সে যদি কবরে যায় তার কি দশা হবে? সে কি এমন সুন্দর রূপ নিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে? আসতে পারবে এ সুন্দর পৃথিবীতে যেখানে চাঁদ আছে, সূর্য আছে, বাতাস আছে, পানি আছে, আর আছে ফজল?
অসম্ভব। কবর থেকে কোনো মানুষই ফিরে আসে না এ মাটির পৃথিবীতে। কবরে মাটিচাপা দেয়ার পরেই আসবে দুই ফেরেশতা মনকির আর নকির। গুনাগারের আজাব চলতে থাকবে কবরের ভেতর। তারপর আল্লার বিচার। বিচারের পর গুনাগারকে ফেলবে হাবিয়া দোজখে, জাহান্নামে।
জরিনা আরো ভাবে, সে সবচেয়ে বড় গুনাগার। শরীরের গুনা, মনের গুনা, চোখের গুনা সে করেছে। অন্য সব গুনা মাফ হলেও হতে পারে, কিন্তু শরীরের গুনা কবিরা গুনা। এ গুনার মাফ নেই। সে শুনেছে, সারা জীবনভর আল্লার নাম জপ করলেও শরীরের গুনার শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না। আর কি সাংঘাতিক সে শাস্তি। দুই সাপ এসে কামড়ে ধরবে দুই স্তন। ফেরেশতারা গুজু মারবে কুচকির ওপর।
জরিনা আর ভাবতে পারে না। সে ফজলের দিকে তাকায়। শরীরের গুনা করেছে। ফজলও। তারও নিস্তার নেই। একই হাবিয়া দোজখে যেতে হবে দু’জনকে।
হঠাৎ জরিনার বেদনাভারাক্রান্ত মনটা হালকা মনে হয়। ফজল হবে তার দোজখের সাথী। রূপজান সতী-সাধ্বী, নিষ্পাপ। সে যাবে বেহেশতে। আখেরাতে সে সাথী হবে পারবে
ফজলের। এ দুনিয়াতেও ফজলকে আর সাথী হিসেবে পাবে না সে। তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে।
প্রজাপতিটা এখনো বসে আছে ফজলের ঊরুর ওপর।
নাহ, ওটার বসবার অধিকার নেই ফজলের গায়ে।
জরিনা আঙুলের টোকা দিতেই প্রজাপতিটা নরম অপটু পাখা নেড়ে টলতে টলতে উড়ে চলে যায়।
