সে অজু করে নামাজের জন্য দাঁড়ায়। অজু করা সত্ত্বেও কেমন না-পাক মনে হয় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সারা শরীর ছেয়ে রয়েছে কেমন এক অশুচিতা।
একটা মাত্র ভালো শাড়ি আছে তার। গোলাপী রঙের সেই শাড়িটাই তার পরনে। আজই ওটা বাক্স থেকে নামিয়ে ধোয়া হয়েছিল। এ পরিষ্কার শাড়িটাই তার কাছে নাপাক মনে হয়।
জরিনা শাড়িটা খুলে তালিমারা একটা শাড়ি পরে। আবার অজু করতে বসে প্রথমেই সে চোখের কাজল পানি দিয়ে ঘষে মুছে ফেলে। নখ দিয়ে আঁচড়ে তোলে কপালের টিপ। যত্ন করে বাঁধা খোঁপাটাও খুলে ফেলে সে।
নামাজের শেষে সে মোনাজাত করে, আল্লাহ তুমি রহিম, তুমি রহমান। আমার গুনা তুমি মাপ কাইর্যা দ্যাও আল্লা। আমার শরীলের গুনা, মনের গুনা, চউখের গুনা মাপ কইর্যা দিও আল্লাহ্। রাববানা আতেনা ফিদুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখেরাতে হাসানাতাও
ওয়াকেনা আজাব আন্-নার। আমিন।
অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে চরের বুকে। জরিনা বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। চলন্ত নৌকার পালগুলো অস্পষ্ট হতে হতে দূরের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। চাঁদহীন আকাশে তারার মহোৎসব।
আজ আর রান্না-বান্নার প্রয়োজন নেই। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সে ধান ভেনেছে। গাজিবাড়ি। দুপুরে সেখানেই খেয়েছে। আজ রাতে তার না খেলেও চলবে।
জরিনা ঘরে গিয়ে কুপি নিবিয়ে শুয়ে পড়ে। গত তিনচার দিন কুপি জ্বালিয়ে সে অনেক রাত পর্যন্ত বসে কাটিয়েছে। নষ্ট করেছে যুদ্ধের বাজারের দুষ্প্রাপ্য কেরোসিন। সে কয়দিনের উনা ঘুমের জন্য এখন দুনা ঘুমের প্রয়োজন। আজ আবার সারাদিন খুব খাটুনি গেছে। এ অবস্থায় শুতে না শুতেই চোখ বুজে আসার কথা। কিন্তু চোখ বুজেও ঘুম আনতে পারছে না জরিনা। সে নামাজে বসে মনের যেসব গুনা, অবাঞ্ছিত ভাবনা-চিন্তা, কামনা-বাসনা বিসর্জন দিয়ে এসেছিল, তাড়িয়ে দিয়েছিল উড়তে সক্ষম পাখির ছানার মতো, সেগুলো এখন ফিরে আসতে চাইছে মনের নীড়ে।
এশার নামাজের আজান শুনে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে জরিনা। কুপি জ্বালে। অজু করে নামাজে দাঁড়ায়। নামাজ শেষ করে মোনাজাতের জন্য হাত উঠায়, আল্লা সব গুনা মাপ করো।
আল্লা। শরীলের গুনা মনের গুনা, চউখের গুনা–সব গুনা–’
টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট।
জরিনার প্রার্থনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। সে তাড়াতাড়ি কুপিটা নিবিয়ে আবার শুরু করে, আল্লা আমার সব গুনা মাপ করো। রাব্বানা আতেনা ফিদদুনিয়া
টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট….
রাব্বানা আতেনা ফিদ্দুনিয়া-মোনাজাতের পরেরটুকু আর মনে আসছে না তার। কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। কোনো রকমে সে ‘আমিন’ বলে মোনাজাতের হাত বুলায় চোখে ও কপালে।
টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট।
জরিনা কানে আঙুল দেয়। কিন্তু তবুও সে স্পষ্ট শুনছে, বারবার শুনছে হট্টিটির ডাক। তার মনের তারে ঝঙ্কার দিয়ে উঠছে যে টি-টি ডাক, তাই বুঝি শুনছে সে।
জরিনা ঘর থেকে বেরোয়। ডাকটা অনেক কাছে শোনা যাচ্ছে এখন। সে তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা বন্ধ করে রান্নাঘরের পেছনে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
টিঁ-টিঁ-টিঁ আর শোনা যাচ্ছে না এখন। তবে কি ফজল চলে গেল? ভাবে জরিনা। যাক চলে যাক। আল্লায় যেন তার মুখ আর না দেখায়।
অস্পষ্ট পায়ের শব্দ শোনা যায়। জরিনা রান্নাঘরের কোণের দিকে গিয়ে উঁকি মারে। একটা মূর্তি উঠানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক ঠায়।
কিছুক্ষণ পরে মূর্তিটা নড়েচড়ে ওঠে। এগিয়ে গিয়ে দরজার ওপর টোকা দেয় কয়েকবার। কোনো সাড়া না পেয়ে ভেজানো দরজাটা খোলে। ম্যাচবাতি জ্বালিয়ে দেখে ঘরে কেউ নেই। মেঝেতে বিছানা পাতা। বালিশের পাশে একটা গোলাপি রঙের শাড়ি পড়ে রয়েছে।
সে দরজাটা ভেজিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ায়। চারদিকে চোখ বুলিয়ে বিড়ি ধরায়। সে সময়ে দেশলাইর আলোয় এক লহমার জন্য ফজলের মুখ দেখতে পায় জরিনা। তার অন্তরের। স্নেহ-মমতা শাসন-শৃঙ্খলা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফজল রওনা হয়। জরিনার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে সাথে বুকটা যেন তার রিক্ত হয়ে যায়।
কিছুদূর গিয়েই ফজল ফিরে আসে। তার পায়ের মৃদু শব্দে জরিনার বুকের হাহাকার থামে।
ফজল ঘরে গিয়ে ম্যাচবাতি জ্বালিয়ে কুপি ধরায়। ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে সে বুঝতে পারে, খাবার হাঁড়ি-পাতিল এ ঘরে রাখা হয় না।
কুপি হাতে সে রান্নাঘরে যায়। সব হাঁড়ি-পাতিল চুলোর পাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। এক কোণে একটা পানির কলসি। তার পাশে একটা মাটির বৌকা বাঁশের চালুনি দিয়ে ঢাকা। ওটাও বোধহয় পানিভরা।
ফজল চালুনিটা সরিয়ে হাত দেয় বৌকার ভেতর। সাথে সাথেই ভয়ে সরিয়ে আনে হাতটা।
ব্যথায় উৎপীড়িত মুখেও হঠাৎ হাসি ফোটে জরিনার। রান্নাঘরের পেছন থেকে বেড়ার ফাঁক দিয়ে সে সব কিছুই দেখছিল।
ফজল কুপিটি বৌকার মুখের কাছে নিয়ে দেখতে পায় চিংড়ি মাছ গিজগিজ করছে পানির ভেতর। সে বোকার মত হেসে ওঠে। ভাগ্যিস পান্তাবুড়ির মতো শিং মাছ জিইয়ে রাখেনি জরিনা।
কুপিটা নিবিয়ে সে বেড়া হেলান দিয়ে বসে থাকে। আহাদালীর ছোট্ট ডিঙি বেয়ে সে এসেছে। কেউ না দেখে সেজন্য ধানখেতের ভেতর ওটাকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। এখন ওটা তুলে এত রাত্রে কার বাড়ি গিয়ে সে আশ্রয় নেবে?
