খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে পেট। ফজল কুপিটা জ্বালায় আবার। সে বৌকার ভেতর থেকে কয়েকটা চিংড়ি মাছ তোলে। জীবন্ত মাছগুলো ছট্কা মেরে ছিটকে পড়ে এদিক ওদিক। সে ওগুলোর খোসা ছাড়ায়। চিত্রা একটা হাঁড়ির ভেতর পানি ঢেলে মাছগুলোকে ভালো করে ধুয়ে নেয়। খুঁজেপেতে একটা চিমটা পাওয়া যায় বেড়ার সাথে গোঁজা। সেটার সাহায্যে একটা মাছ পাটখড়ির আগুনে ঝলসিয়ে সে মুখে দেয়। চিবোতে চিবোতে লবণের খোঁজ করে।
জরিনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তার বুকের ঝড় ছিন্নভিন্ন করে দেয় সব বাধা-বন্ধন। চোখের প্লাবনে ভেসে যায় সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। সে চোখ মুছে ঘোমটা টেনে ধীর পায়ে এসে দাঁড়ায় রান্নাঘরের দরজায়।
ফজল চমকে পেছন ফিরে তাকায়। তার মুখে মলিন হাসি ফুটতে ফুটতে মিলিয়ে যায় জরিনার চোখে পানি দেখে।
দু’জনেই দু’জনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কারো মুখ দিয়েই কোনো কথা বেরোয় না। নিজেকে সামলে নিয়ে ফজল বলে, ঘরে অতিথি আইলে মানুষ খুশি অয়। তোমার চউখে পানি দেইখ্যা মনে অয় তুমি খুশি অও নাই।
জরিনা নিরুত্তর। তার চোখের পানির উৎস কোথায় ফজল জানে। তাই পরিবেশটা স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে সে আবার বলে, তুমি খুশি অও নাই, কেমন?
না।
ফজল জানে এটা তার অন্তরের কথা নয়। সে খুশি হয়েছে এ কথা তার মুখ থেকে শুনবার জন্য সে আবার বলে, সত্য কইর্যা কও, তুমি খুশি আছ?
না।
তবে আমি চইল্যা যাই।
জরিনা কোনো উত্তর দেয় না। চুলোর পাশ থেকে সে ভাতের হাঁড়িটা তুলে নেয়। ঘর থেকে চাল এনে ধুয়ে বসিয়ে দেয় চুলোর উপর।
জানো জরিনা, চাউল বড় মাংগা অইয়া গেছে।
হ, আমিও হুনছি। তিন ট্যাহা মনের চাউল পাঁচ ট্যাহা অইয়া গেছে। চুলো ধরাতে ধরাতে বলে জরিনা।
দাম আরো বাড়ছে। আইজ দর উঠছে সাড়ে পাঁচ টাকায়।
মানুষ এইবার না খাইয়া দপাইয়া মইরা যাইব।
হ, এইবার কী যে উপায় অইব মানুষের, কওন যায় না। দুনিয়াজোড়া লড়াই চলতে আছে। চিনি পাওয়া যায় না। কেরোসিন পাওয়া যায় না–
জরিনা বৌকার ভেতর থেকে আরো কয়েকটা চিংড়ি মাছ তোলে। মাছ কুটতে কুটতে সে বলে, খুব খিদা লাগছে, না?
হ সাংঘাতিক–
খিদার চোডে মাছ পোড়াইয়া খাইতে শুরু করছিলা। পোড়া মাছ তো ভূতের ভোগ লাগে।
হ ভূতই অইয়া গেছি। আইজ পুলিস আইছিল। খুব তালাশ করছে। সারা দিন আছিলাম একটা পাটখেতের মইদ্যে।
ভাত ফুটতে বেশি দেরি লাগব না। তুমি চালের উপরতন কয়েকটা পুঁই এর আগা কাইট্যা আনো।
ফজল পুঁই-এর ডগা কেটে এনে দেয়।
রান্না শেষ হয়। চুলোর পাশে পিড়ি বিছিয়ে ফজলকে খেতে দেয় জরিনা। মাটির বাসনে ভাত বাড়তেই ফজল বলে, আমি আসছি বুইল্যা তুমি তো খুশি অও নাই। নিজের মোখেই তখন না করছ। বেখুশি মাইনষের ভাত তো মোখে দিতে ইচ্ছা করে না।
বেখুশি মাইনষেরে দিয়া ভাত তো রান্দাইয়া ছাড়ছ। এহন মোখে দিতে ইচ্ছা করব না। ক্যান? জরিনা মাছের সালুন দিতে দিতে বলে।
সত্য কইর্যা কও জরিনা, তুমি খুশি অইছ? না কইলে এই উইঠ্যা গেলাম আমি। ফজল সত্যি সত্যি উঠবার উদ্যোগ করে।
হ, খুশি অইছি। এইবার বিছমিল্লাহ করো।
তুমি খাইবা না?
আমি খাইছি। মিছে কথা বলে জরিনা।
আবার অল্প কইর্যা খাও আমার লগে।
যহন দিন আছিল, তহনই একসাথে খাওয়ার সযোগ পাই না। এহন আর–
পেটে খিদে নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করতে ভালো লাগে না ফজলের। সে গোগ্রাসে খেয়ে চলে আর জরিনা বেশি বেশি করে ভাত তরকারি তুলে দিতে থাকে তার পাতে।
মেঝেতে পাতা হোগলার ওপর একটা নকশি কাঁথা বিছিয়ে দেয় জরিনা। তেলচিটে বালিশের ওপর বিছিয়ে দেয় নিজের হাতের তৈরি গেলাপ। তারপর মশারি খাটাতে খাটাতে বলে, এইবার শুইয়া পড়। রাইত দুফর পার অইয়া গেছে।
তোমার বালিশ কই? তুমি শুইবা না?
উঁহু, আমি বইয়া পাহারা দিমু। জানোই তো চোরের বাড়ি। চৌকিদার-পুলিস আইতে পারে যে কোনো সময়।
পুলিস আইতে পারে! আঁতকে ওঠে ফজল। তবে তো এইখানে থাকন ঠিক না!
আগে আইতো ঘন ঘন চোরবক্সরে ধরতে। এহন কৃচিৎ কোনোদিন আহে।
কিন্তু আমি ঘুমাইমু আর তুমি সারা রাইত জাইগ্যা থাকবা? তার চাইতে দুই জনই জাইগ্যা থাকি না ক্যান্। কথা কইতে কইতে রাইত পোয়াইয়া যাইব।
অতীতের গর্ভে ডুবে যাওয়া নানা কথা, নানা স্মৃতি ভেসে উঠছে জরিনার মনেও। কিন্তু জরিনা এদের বেরুবার সুযোগ না দিয়ে বলে, উঁহু কথা কইও না আর। নিসাড় রাইতের কথা অনেক দূর থিকা হুনা যায়।
ফজল আর কথা বলে না।
জরিনা আবার বলে, হোন, পুলিস আইলে যদি পলাইতে না পার, তবে ঐ কোনায় খাড়াইয়া থাকবা। আমি তোমারে হোগলা দিয়া প্যাচাইয়া দিমু। কেও বুঝতেই পারব না।
হেষে দম ফাপর অইয়া মইরা যাইমু না তো!
উঁহু। মরবা না। চোরা ভাদামারে এই রহম কইর্যা বাঁচাইয়া দিছিলাম একদিন।
জরিনা দরজায় খিল লাগিয়ে নিজের জন্য নামাজের মাদুরটা বিছিয়ে নেয়। তারপর কুপটি ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে বসে পড়ে তার ওপর।
ফজল বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে। রূপজানের কোনো খবর এখনো দেয়নি জরিনা। আর দিবে বলেও মনে হয় না। জরিনার বোধ হয় ভালো লাগে না রূপজানের নাম শুনতে। ফজলেরও তাই কেমন বাধোবাধো ঠেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে। শেষে দ্বিধা কাটিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, মোল্লাবাড়ি গেছিলা?
