আম্মাগো, এহন বুঝি না খাইয়া মরতেই অইব। আপনে এক কাম করেন–আপনের বইনের বাড়ি বেড়াইতে যান কয়ডা দিনের লেইগ্যা। ভাল-ভালাই খাইয়া আহেন। আপনের শরীলডাও ভালো অইব আর এদিগে ঘরে কিছু চাউল-ডাইলও জমা অইব।
বেড়াতে যাওয়ার নামে নাজুবিবির ঠ্যাঙ দুটো ডিলিক দিয়ে ওঠে সব সময়। বউ একা ঘরে থাকবে বলে বেড়াবার শখ চেপে রাখতে হয় তাকে। এখন বউয়ের কাছ থেকেই যখন প্রস্তাব এসেছে বেড়াতে যাওয়ার তখন সে মনে মনে খুশি হয়। মুখে বলে, কিন্তু আমি গেলে তুই ঘরে একলা থাকবি ক্যামনে?
আমার লেইগ্যা চিন্তা কইরেন না। যেই বাড়ি কাম করতে যাইমু, হেইখানেই থাকতে পারমু আমি।
নাজুবিবি পরের দিনই তার বোনের বাড়ি চর-কানকাটা চলে যায়।
জেল-পালানো আসামি রাতের আঁধারেই আসবে–বুঝতে পারে জরিনা। তাই দিনের বেলা যেখানেই থাকুক, যে কাজেই থাকুক, বেলা ডোবার আগেই সে বাড়ি ফিরে আসে।
ফজল কাজির ভাত খুব শখ করে খায়। জরিনা তাই কাজি পেতে রেখেছে। পানিভরা। মাটির হাঁড়িতে ফেলে রাখা হয় যে চাল তারই নাম কাজি। কাজির ভাত খেতে যে সব অনুপান উপকরণের দরকার তারও কিছু কিছু সে যোগাড় করে রেখেছে। লশকর বাড়ি থেকে চেয়ে এনেছে মুঠো খানের মেথি আর কালিজিরা। এগুলো খোলায় টেলে বাটা হবে। নদীতে গোসল করার সময় শাড়ির আঁচল দিয়ে ধরেছে ছোট ছোট মাছ–চেলা আর খরচান্দা। অল্প কয়েকটা মাছ এক দিনেই যা পেয়েছিল। পরের দিন এ মাছ ধরবার সময় ভটভট আওয়াজ তুলে যাচ্ছিল একটা কলের নৌকা। যাচ্ছিল বেশ কিছু দূর দিয়েই। হঠাৎ ওটা মোড় নেয় কিনারার দিকে। জরিনা জাবড়ি দেয় পানির ভেতর। গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দেয় শরীর। আঁচল ঠিক করে গায়ে জড়ায়, ঘোমটা টানে। দুটো ধলা মানুষ শিষ দিচ্ছিল। ঘোমটার ফাঁক দিয়ে সে দেখে পাঁচ কি দশ টাকার কয়েকটা নোট দেখিয়ে কুৎসিত ইশারা করছে একটা বাঁদরমুখো।
জরিনা পাড়ে উঠে একদৌড়ে এসে ঘরে ঢোকে। তারপর থেকে নদীর ঘাটে যাওয়ার আগে চারদিক ভালো করে দেখে নেয় সে।
সেই চেলা আর খরচান্দা মাছ কয়টা শুঁটকি দিয়ে রেখেছে জরিনা। শুঁটকি মাছের ভরতা কব্জির ভাতের এক বিশেষ অনুপূরক।
পুরানো দুটো চাই ছিল ঘরের বেড়ায় টাঙানো। সে দুটোর পেটে সুতোয় গাঁথা ফড়িংয়ের টোপ ভরে সে লটা ঝোঁপের আড়ালে পেতে রাখে রোজ বিকেল বেলা। ভোরে উঠিয়ে তার ভেতর পায় পাঁচ-সাতটা করে ছোট আণ্ডালু চিংড়ি। তিন-চার দিনে অনেকগুলো হয়েছে। সবগুলোই সে জিইয়ে রেখেছে একটা পানিভরা বৌকার ভেতর। রান্নাঘরের চালে বিছিয়ে রয়েছে ফনফনে পুঁই লতা। পুঁই-চিংড়ির চচ্চড়ি ফজলের খুব প্রিয়।
খালাসিবাড়িতে ধান ভেনে সেদ্ধ চালের বদলে আতপ চাল চেয়ে এনেছে জরিনা। এ চাল পাটায় বেটে আর কিছু না হোক কয়েকটা চিতই পিঠা বানিয়ে ফজলের সামনে দিতে পারবে সে। ঘরে গুড় আছে। এখন একটা নারকেল যোগাড় করতে হবে যেভাবে হোক।
তিন-চার দিন পরে আসবে বলেছিল ফজল। কিন্তু সাত দিন পার হয়ে গেছে সে এল না। জরিনার একবার মনে হয়, সে আর আসবে না। পরক্ষণেই আবার মনে হয়–পুলিসের ভয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে হয়তো। সেখান থেকে বেরুতে পারছে না।
জরিনা চাঁই দুটো নিয়ে নদীর পাড়ে যায়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। অস্তগামী সূর্যের গায়ে এক ফালি মেঘ বিধে রয়েছে বর্শার ফলার মত। সে আঘাতে সূর্যের রক্ত যেন ছড়িয়ে পড়েছে টুকরো টুকরো মেঘের ওপর।
শাড়িটাকে কোমরে গুঁজে হাঁটুর ওপর তুলে নেয় জরিনা। তারপর পানিতে নেমে চাইদুটো লটা ঝোঁপের ভেতর পেতে রাখে।
ডাঙায় উঠেই তার চোখে পড়ে একজোড়া বক। বকদুটো পাখা ঝাড়ছে, ঠোঁট দিয়ে একে অন্যের পালকে বিলি দিচ্ছে। আজকের মতো শেষ হয়েছে ওদের মাছ শিকার। এখন রাতের আস্তানায় ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। হঠাৎ কোথা থেকে একটা বগা উড়ে এসে তাড়া করে জোড়ের বগাটাকে। ওটাকে অনেক দূর হটিয়ে দিয়ে সে বগির দিকে আসে এবং গলা বাড়িয়ে ঠোঁট নেড়ে সোহাগ জানায়। বগিটা উড়াল দিয়ে ওর ভীরু দুর্বল সঙ্গীর কাছে চলে যায়। শক্তিশালী বগাটা আবার আক্রমণ করার আগেই বগা আর বগি সোজা দক্ষিণ দিকে উড়ে চলে যায়।
পলকহীন চোখ মেলে জরিনা চেয়ে থাকে উড়ন্ত বক-জোড়ার দিকে। ওরা দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে সে ঘরের দিকে রওনা হয়।
আবার ফজলের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয় তার মন। তাকে পুলিস ধরে নিয়ে যায়নি তো?
জরিনার বুকটা ভারী হয়ে ওঠে। চোখের কোণে চকচক করে পানি।
হঠাৎ তার মনে হয়, বেগানা পুরুষের জন্য এমন করে চিন্তা করা তার অন্যায়। ঘোর অন্যায়। নিজের স্বামীর জন্য সে-তো এমন করে ভাবে না। তার স্বামী ফেরার। পুলিসের ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। কি খায়, কোথায় থাকে, ঠিক-ঠিকানা নেই। তার জন্য তো একফোঁটা পানিও ঝরে না তার চোখ থেকে।
হঠাৎ দরদর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার দু’গাল বেয়ে।
এ অশ্রু কার উদ্দেশে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন বোধ করে না জরিনা। তার মনের অপরাধবোধটাই এখন সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে।
আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে পাশের চর থেকে। শিথিল আঁচল টেনে মাথায় দেয় জরিনা। ঘরে গিয়ে কুপি জ্বালে। নামাজ সে কদাচিৎ পড়ে। কিন্তু আজ হঠাৎ নামাজ পড়ার তাগিদ অনুভব করে সে তার মনের ভেতর।
