জরু, তুমি তো কইলা মিছা কথা। কিন্তু মাইনষে কয় আমারে ডাকাইত। রূপজান– সেও কয় আমারে ডাকাইত। ফজলের কথায় কান্না ঝরে পড়ে।
জরিনার চোখে পানি আসে। ধরা গরায় সে বলে, আমি বেবাক হুনছি। আরশেদ মোল্লা যোগ দিছে জঙ্গু শয়তানডার লগে। ওরাই তোমারে ধরাইয়া দিছে।
হ, এর শোধ নিয়া ছাইড়া দিমু। শোধ নেওনের লেইগ্যাই পলাইয়া আইছি জেলেরতন। জেলেরতন! কবে পলাইছ?
কাইল রাইতে। পলাইয়া যাইতে আছিলাম দক্ষিণপাড়। বিষ্টির লেইগ্যা পাড়ি দিতে পারি নাই।
বাড়ি গেছিলা?
না।
খাইছ কনুখানে?
খাই নাই। কোথায় খাইমু? সাথে একটা পয়সাও নাই।
এতক্ষণ কও নাই ক্যান্। জলদি বাড়িত্ লও।
তুমি কি ভাত রাইন্দা থুইছ নি?
না, দুইডা চাউল ফুডাইতে বেশি দেরি লাগব না। কিন্তু খাইবা কি দিয়া? মাছ-তরকারি কিছু নাই।
ডাইল আছে?
আছে।
তবে খিচুড়ি পাকাইতে পারবা?
তা পারমু।
বেশি কইর্যা খিচুড়ি পাকাও। সাথে নৌকায় মানুষ আছে আর একজন। আর আণ্ডা থাকলে ভাইজ্যা দিও।
কে আছে নায়?
তুমি চিনবা না তারে। মস্ত বড় একজন বিদ্বান মানুষ।
ফজলের হাত ধরে বাড়ি নিয়ে যায় জরিনা। তাকে রান্নাঘরে বসিয়ে সে ঘরে যায়। মাটির ঘড়া থেকে চলে বের করে, শিকেয় তোলা ডিবা থেকে বের করে ডাল।
কি ঘুডুঘুডু করতে আছস বউ? পাশ ফিরে জিজ্ঞেস করে শাশুড়ি।
এই ডাওরের মইদ্যে খিচুড়ি খাইতে মন চাইতে আছে। অল্প দুগা ভাত আছে। পানি দিয়া থুই। পান্তা খাইমু।
শাশুড়ি বলে, হ, বিষ্টি-বাদলের দিনে গরম গরম খিচুড়ি ভালোই লাগে। আমি উঠমু?
না, আপনি আন্ধারে হুইয়া থাকেন। রাইন্দা বাইড়া আপনেরে ডাক দিমু।
জরিনা এক হাতে কুপি অন্য হাতে হাঁড়ি নিয়ে রান্নাঘরে যায়।
কুপির মৃদু আলোয় এতক্ষণ পরে সে প্রথম দেখতে পায় ফজলের মুখ। দাড়ি-গোঁফে বদলে গেছে চেহারা। খিদেয় শুকিয়ে গেছে মুখ। চোখ বসে গেছে। গায়ের উজ্জ্বল রঙ গেছে ফ্যাকাশে হয়ে। মাথায় এলোথেলো চুল। বহুদিন তেল-পানি না পড়ায় জট পাকিয়ে গেছে।
জরিনা নির্বাক চেয়ে থাকে ফজলের মুখের দিকে। পলকহীন দৃষ্টি মেলে ফজলও তাকায়। গোধূলির বিষণ্ণ ছায়া জরিনার মুখে। মমতা-মাখা দুটি চোখের কোণে চিকচিক করে পানি।
জরিনা চোখ নামায়। চাল-ডাল ধুয়ে বাটনা বেটে সে তাড়াতাড়ি রান্না চড়িয়ে দেয়।
জরিনা চুলোর মুখে লাকড়ি গোঁজে। তার পাশে পিড়েতে বসে চাল চিবোয় ফজল।
অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাঙে জরিনা। সে নিচু গলায় বলে, মিয়াজির মরণের পর গেছিলাম তোমাগ বাড়ি। আম্মার কান্দন দেইখ্যা কইলজা ফাঁইট্যা যায়। মরণের দিন মিয়াজি তোমারে দ্যাখতে চাইছিল। মরার আগক্ষণে দুই-তিন বার তোমার নাম ধইর্যা বোলাইছিল।
ফজল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
জরিনা এক সময়ে ঘরে গিয়ে নারকেল তেল আর চিরুনি নিয়ে আসে। চিরুনি চালিয়ে সে ফজলের চুলের জট ছাড়ায়, তারপর তেল মাখিয়ে আঁচড়ে দেয়, সিঁথি কেটে দেয় পরিপাটি করে।
হেকমত কই? জিজ্ঞেস করে ফজল।
কোনো খবর নাই। মাসখানেক আগে আইছিল একদিন রাইতে। আবার রাইতের আন্ধারেই চইল্যা গেছে।
মোল্লাবাড়ি গেছিলা?
গেছিলাম একদিন। তোমারে যেদিন ধরাইয়া দেয় তার কয়েকদিন আগে।
কাইল-পরশু একবার যাইতে পারবা?
উঁহু।
ক্যান?
জরিনা কোনো উত্তর দেয় না।
আগে রূপজান তাকে বড় গলায় বু’জান বলে ডাকত, হাসি-মশকরা করত কথায় কথায়। সে তার চুল আঁচড়ে খোঁপা বেঁধে দিত। রূপজানকে সুন্দর করে কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরতে শিখিয়েছিল সে-ই। রূপজানের বিয়ের পর জরিনা ধান ভানতে গিয়েছিল মোল্লাবাড়ি। রূপজান তার কানে কানে বলেছিল, বু’জান লো, তোমার ছোডকালের পুরুষটা জ্বালাইয়া মারে আমারে। রাইতে এট্টুও ঘুমাইতে দেয় না। সেই রূপজান বদলে গেছে এখন। সেদিন কাজের খোঁজে গিয়ে কাজ তো জোটেইনি, ভালো ব্যবহারও পায়নি সে। রূপজান তাকে সোজা বলে দিয়েছে, আমাগ ধান ভান লাগব না। আর কোনোদিন আইও না আমায় বাড়ি। তারপর জরিনা আর যায়নি সে বাড়ি, আর যেতেও চায় না। তার বিশ্বাস, রূপজান কিছু টের পেয়েছিল।
কইলা না, ক্যান যাইতে পারবা না? ফজল আবার জিজ্ঞেস করে।
কি করতে যাইমু?
গিয়া রূপজানরে খালি জিগাইবাসে ডাকাইতের ঘর করব না–এমুন কথা ক্যান্ কইল? সত্য সত্যই কি সে বিশ্বাস করে আমি ডাকাইত?
এহন আর এই কথা জিগাইয়া লাভ কি?
লাভ নাই। খালি মনরে বুঝ দিতে চাই। রূপজান আমারে ডাকাইত মনে করে, ঘিন্না করে–এই কথা ভাবলেই মনে অয় কে যেন অন্তরডারে টাটা দিয়া খোঁচায়।
আইচ্ছা যাইমু একদিন। উড়কি দিয়ে খিচুড়ি নাড়তে নাড়তে বলে জরিনা।
কিছুক্ষণ পরে খিচুড়ি নামিয়ে সে ডিম ভাজে। খাবার পরিবেশন করার আয়োজন দেখে ফজল বলে, নায়ের মইদ্যে আমার মতো ভুখা আছে আর একজন। তারে থুইয়া খাইতে একটুও মজা লাগব না।
তোমার কাছে বইয়া তোমারে কোনো দিন খাওয়াইতে পারি নাই। আশা করছিলাম–
জরিনার কথা শেষ না হতেই মুচকি হেসে ফজল বলে, হ, শেষে কইতে পারবা, আর এক বাড়ির ছ্যামড়াডা বেশি বেশি খাইয়া ফালাইল।
হাসি ফোটে জরিনার মেঘাচ্ছন্ন মুখে। ফজল বলে, সামনে বহুত দিন পইড়া রইছে। খাওয়ানের অনেক সুযোগ পাইবা। সত্য কও তো? আইবা তো আবার?
হ, আইমু।
কবে আইবা?
আইমু একদিন।
না, কইয়া যাইতে অইব।
তিন-চার দিন পর।
