আমার মাথা ছুঁইয়া কও।
মাথা ছুঁয়ে ফজল বলে, এই কইলাম। এইবার বিদায় দ্যাও। মতিভাই খিদায় মরতে আছে।
জরিনা কিছুটা খিচুড়ি রেখে বাকিটা হাঁড়িশুদ্ধ তুলে দেয় ফজলের হাতে। ডিম ভাজা রাখে শরার ওপর। তারপর বলে, পাতিলডা গাঙের পাড়ে কাশঝোঁপের মইদ্যে থুইয়া যাইও। কাইল বিচরাইয়া লইয়া আইমু।
ফজল রওনা হয়। জরিনা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, হাত রাখে তার পায়ে। ফজল তার মাথায় হাত বুলায়।
.
রাত্রে জোর বৃষ্টি হয়েছিল আর এক ঢলক। ভোররাত্রে নৌকার পানি সেচে পাড়ি দেয় ফজল। ভোর হওয়ার আগেই তারা দক্ষিণপাড় পৌঁছে যায়। ফজল তীরে নামে। তার হাত ধরে নামে মতি।
নৌকাটা বাঁধবার দরকার নেই। মতি বলে।
ভাসাইয়া লইয়া যাইব তো!
যাকগে। নৌকার দামটা দূরের কোনো পোস্টাপিস থেকে বেনামিতে মানি অর্ডার করে দিলেই হবে।
কার নামে মানি অর্ডার করবেন? মাঝির নামতো জানি না?
থানার দারোগার কাছে পাঠালেই মাঝি পেয়ে যাবে টাকাটা। নৌকার নম্বরটা লিখে দেব। নৌকা চুরির পর মাঝি নিশ্চয়ই থানায় গিয়ে এজাহার দিয়েছে।
আইচ্ছা! এখন কোন দিগে যাইবেন?
গাঁয়ের পথ ধরে সোজা দক্ষিণ দিকে চলতে থাকো। কিছুদূর গেলেই একটা চক পড়বে।
মতির হাত ধরে এগিয়ে যায় ফজল। চকে পৌঁছতে পৌঁছতে ফরসা হয়ে যায়।
চকের জায়গায় জায়গায় জমে আছে বৃষ্টির পানি। তারা ধান আর পাটখেতের আল ধরে পা চালায়। ধান আর পাট গাছের ঝরা পানিতে ভিজে যায় তাদের জামা-কাপড়।
ছড়ছড় আওয়াজ শুনে পাশের দিকে তাকায় ফজল।
আরে কই মাছ! বিষ্টিতে কই মাছ উজাইছে মতিভাই!
ধরো।
ফজল তিনটে কইমাছ পায় ধানখেতের মাঝে। মাছের কানকোর ভেতর পাটের কোষ্টা ঢুকিয়ে সে ঝুলিয়ে নেয় হাতে। চকের শেষ মাথায় পৌঁছতে পৌঁছতে গোটা পনেরো কইমাছ কুড়িয়ে পাওয়া যায়। এক হালটের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে পাওয়া যায় আরো সাতটা। সবগুলোকে সে কোষ্টায় গেঁথে নেয় মালার মতো করে।
মতি বলে, আজ খাওয়াটা খুব জমবেরে ফজল।
হ, আল্লা খুব মেহেরবান।
হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। মতি হাসে। কিন্তু এই মেহেরবানিটা গতকাল জাহির করলেই ভালো করত আল্লা। কাল খিদের জ্বালায় যখন কষ্ট পাচ্ছিলাম তখন অত বিষ্টি না ছিটিয়ে আমাদের নৌকায় কিছু চিড়ে-মুড়ি ছিটিয়ে দিলে বুঝতাম আল্লা খুব মেহেরবান। তাহলে কি আর খিচুড়ি মেগে খেতে হতো কাল?
পথের লোকের কাছে জিজ্ঞেস করতে করতে আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা গন্তব্যস্থানে গিয়ে পৌঁছে।
বহু বছর পরে ভাইকে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলে বোন।
.
১৮.
মতির বোনের বাড়ির তিনদিন ছিল ফজল। এমন একটি স্নেহের আশ্রয় ছেড়ে আসবার সময় চোখ তার ছলছল করে উঠেছিল। তার নিজের বড় বোন নেই। সে অভাব পূরণের জন্যই বোধ হয় মতিভাইয়ের সাথে এমন করে দেখা হয়েছিল তার।
চণ্ডীপুর থেকে নৌকা কেরায়া করে সে বাড়ি রওনা হয়। বাড়ির ঘাটে পৌঁছতে রাত হয়ে যায় বেশ। জেল থেকে পালাবার পর রাতের অন্ধকারে চলাফেরা করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে।
ফজল ছই-এর ভেতর থেকে বেরোয়।
বাড়িটা অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু অন্ধকারটা যেন বড় বেশি মনে হয় তার কাছে। বাড়ির সূর্য ডুবে গেছে, তাই বুঝি এত অন্ধকার।
ফজলের দুচোখ অশ্রুতে ভরে যায়। সে নৌকার ভাড়া মিটিয়ে ঘাটে নামে। দুঃসহ বেদনায় ভরাক্রান্ত দেহটা বয়ে নিয়ে চলে পা দুটো। কিন্তু পায়ের নিচের মাটিতে যে আশ্বাস নেই, ভরসা নেই।
চলতে চলতে তার মনে আবার সেই ভয় জাগে; তাকে দেখেই বাড়ির সবাই কান্না জুড়ে দেবে। ইনিয়ে-বিনিয়ে বিলাপ করতে শুরু করবে। তা শুনে তার বাড়ি আসার কথা জেনে ফেলবে আশপাশের লোকজন। জেনে ফেলবে জঙ্গুরুল্লা আর আইনের মানুষ চৌকিদার আর দফাদারও।
ফজল দাঁড়ায়। ম্যাচবাতি জ্বালিয়ে সে ডানে বায়ে দৃষ্টি ফেলে। কিছু দূরেই দেখতে পায় তার পিতার কবর।
সে হাঁটু গেড়ে বসে কবরের পাশে। তার বুকের কান্না রুদ্ধ কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। বেরিয়েও যায় দু-একবার। কান্নার বেগ রোধ করা যখন কঠিন হয়ে পড়ে তখন সে মুখটাকে শক্তহাতে চেপে ধরে নদীর কিনারায় ফিরে আসে। সেখানে বসে নীরবে চোখের পানি ফেলে অনেকক্ষণ। কিছুটা শান্ত হলে চরের কিনারা ধরে সে এগিয়ে যায় পশ্চিম দিকে মেহের মুনশির বাড়ি।
দু-তিনবার দরজায় খটখট দেয়ার পর মেহের মুনশির ঘুম ভাঙে। আচমকা ঘুম ভেঙে সে চেঁচিয়ে ওঠে, কে? কেডা ও?
আমি। আমি ফজল।
ফজল, আহারে ভাই, আইছ তুমি! কান্নাঝরা কণ্ঠে বলে মেহের মুনশি। থিতিয়ে আসা শোক আলোড়ন তোলে তার বুকের ভেতর। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কুপি জ্বালায়। ঘর থেকে বেরিয়ে ফজলকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, তোমার লেইগ্যা চিন্তায় জারাজারা অইয়া গেছি আমরা। চাচিজি কাইন্দা চউখ অন্ধ কইর্যা ফালাইছে।
উদগত শোকাবেগ অনেক কষ্টে সংবরণ করে ফজল বলে, মা-র কান্দাকাডির ডরে বাড়িতে যাই নাই। কান্দাকাডি শুনলে সব মানুষ টের পাইয়া যাইব।
মেহের মুনশি তার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে যায়। চৌকির ওপর বসিয়ে বলে, বাড়িত না। গিয়া ভালোই করছ। গেল রাইতের আগের রাইতে পুলিস ঘেরাও করছিল তোমায় বাড়ি। কিন্তুক।
আমি জিগাই, তোমারে এই অলক্ষ্মীতে পাইল ক্যান? জেলেরতন ক্যান্ পলাইয়া আইছ?
