কোনো চিন্তা কইরেন না মতিভাই। মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতে করতে বিলাত যাওয়া যায়।
আজ যদি যেতে পারতাম, গিয়েই বোনকে বলতাম—শিগগির খিচুড়ি রান্না কর, ডিম ভেজে দে। আর যদি ইলিশ মাছ ভাজা থাকে তো কথাই নেই।
আর কইয়েন না মতিভাই। জিহ্বায় পানি আইসা গেল। এই ঘন ডাওরে গরম গরম খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা আর নয়তো আণ্ডা বিরান–ওরে মাবুদের পেটের মধ্যে খাম খাম শুরু হইয়া গেছে।
ফজল ঢোক গিলে। তার চোখের সামনেই যেন সে দেখতে পায় গামলা ভরা খিচুড়ি। গরম গরম খিচুড়ি থেকে ধোঁয়া উঠছে। ভাজা ইলিশ মাছের খিদে-চেতানো গন্ধ এসে লাগছে নাকে।
নাহ, আজ খিচুড়ি না পেলে পেটের ভোক্ষসটা কিছুতেই শান্ত হবে না।–ভাবে ফজল। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? কার বাড়ি গেলে এখন খিচুড়ি খাওয়া যায়? নিজেদের বাড়ি সে বহুদুর পেছনে ফেলে এসেছে। সেখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার ভাইয়ের দোস্ত রফি শিকদারের বাড়ি ধুলচর। পশ্চিম দিকে মাইল খানেক উজান ঠেলে যাওয়া যায় সেখানে। কিন্তু বৃষ্টি মাথায় করে অতটা পানি ভাঙবার শক্তি নেই শরীরে। আর এ অবস্থায় সেখানে গিয়ে বেশরমের মতো খিচুড়ির ফরমাশইবা দেবে সে কেমন করে? এ খাড়িটা ধরে বেশ কিছুদূর পিছিয়ে গেলে তাদের কোলশরিক কেরামতের বাড়ি। সেখানে গিয়েও খিচুড়ির ফরমাশ দেয়া যাবে না। আর কোথায় যাওয়া যায়?
হ্যাঁ, অল্প কিছুদূরেই আর একটা বাড়ি আছে। বাড়িটার কথা মনে পড়তেই কেমন একটা আনন্দ তার বিধ্বস্ত মনের ধ্বংস স্থূপ সরিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু এ যেন ঠিক আনন্দ নয়, আনন্দের কালো বিষণ্ণ ছায়া।
জরিনা তার কেউ নয়। কোনো সম্পর্ক নেই আর তার সাথে। কোনো দাবি নেই তার ওপর।
রূপজানও আর কেউ নয় তার।
জীবনের ভিত ধসে গেছে। ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে সব। ভগ্নস্তূপের নিচে মৃতপ্রায় মনটা তার কিছু একটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়াতে চায়।
অধিকার ও অনধিকারের সীমান্তে এসে দাঁড়ায় ফজলের অভিলাষ। মমতা মাখানো এক পলক চাহনি, সমবেদনার দুটি কথা, স্নেহের একটুখানি পরশের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে তার বিপর্যস্ত মন। মনের এই আকুতিই তাকে তার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করতে প্ররোচিত করে। এ মুহূর্তে পেটের খিদেকে ছাপিয়ে উঠেছে মনের পিপাসা।
বৃষ্টির তোড় আর নেই। শুধু টিপটিপানি আছে এখন। তাড়াতাড়ি নৌকার বাধন খুলে লগি দুটো তুলে ফেলে ফজল। তারপর কাশবন থেকে বের করে নৌকাটাকে সে স্রোতে ভাসিয়ে দেয়। বৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য সে ছই-এর ভেতর গিয়ে বসে।
কি করছ ফজল? নৌকা ছেড়ে দিলে কেন?
কাছেই একটা বাড়ি আছে জানাশোনা।
আচ্ছা, তবে এতক্ষণ যাওনি কেন?
মনে ছিল না।
হালবিহীন নৌকা ভাটির টানে ভেসে যায় ঘুরপাক খেয়ে। কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকাটাকে ফজল আর একটা খাড়ির ভেতর বেয়ে নিয়ে যায়। কিনারায় ভিড়িয়ে বাঁধে লগি পুঁতে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখনো বৃষ্টি পড়ছে টিপিরটিপির।
ফজল নেমে যায় নৌকা থেকে।
মতিভাই বলে, বেশি করে খাবার নিয়ে এসো। দেরি কোরো না কিন্তু।
ফজল কোনো জবাব না দিয়ে এগিয়ে যায়। কাশ আর লটাবনের ভেতর দিয়ে পথ। অন্ধকারে পথ চলতে চলতে সে ভাবে–জরিনার বুড়ি শাশুড়ি আছে বাড়িতে। তার চোখ এড়িয়ে কেমন করে দেখা করবে সে জরিনার সাথে? ধারে কাছে আর কোনো বাড়ি নেই–এই যা রক্ষে।
এ তল্লাটে কোথাও চুরি হলেই হেকমতকে ধরার জন্য পুলিস আসে। জ্ঞাতিদের ঘরেও খানাতল্লাশি হয়। এজন্য বিরক্ত হয়ে তার জ্ঞাতিরা তাকে তাদের পাড়া থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তারাই তার ঘরদোর তুলে এনে চরের এক কোণে আলাদা বাড়ি করে দিয়েছে।
ফজল ডাক দিয়ে উঠে, টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট্। না, হট্টিটির ডাক এখানো ভোলেনি সে। কিন্তু এত বছর পরে জরিনা যদি বুঝতে না পারে এ সঙ্কেত? হেকমত আজ বাড়ি আছে। কি না, তাই-বা কে জানে?
ফজল নিঃশব্দে এগিয়ে যায়। পা টিপে টিপে গিয়ে দাঁড়ায় ঘরের পেছনে।
ঘরে কুপি জ্বলছে তরজার বেড়ার ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পায়, জরিনা ছেঁড়া কাপড় সেলাই করছে, তার শাশুড়ি শুয়ে আছে মেঝের একপাশে হোগলার বিছানায়।
ফজল সরে যায় কিছুদূরে কাশবনের কাছে। ডেকে ওঠে, টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট্।
জরিনা কান খাড়া করে। বড় মধুর হট্টিটির ডাক। তার দুআঙুলে ধরা সুইটি পড়ে যায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সুইটাকে কুড়িয়ে নিয়ে আবার ফেঁড় তোলে সে।
টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হটু….
আবার সেই ডাক। কিছুক্ষণ পরে আবার, তারপর আরো কয়েক বার।
জরিনা দাঁড়ায়। দরজার কাছ থেকে বদনা নিয়ে সে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
টিঁ-টিঁ-টিঁ–টিঁ-টিঁ-টিঁ-হট….
ডাকটা আসছে কাশবনের দিক থেকে। জরিনা বদনাটা উঠানে রেখে সেদিকে এগিয়ে যায়। ওদিক থেকে ফজলও এগিয়ে আসে। কিন্তু অন্ধকারে একটা মানুষের মূর্তি ছাড়া আর কিছুই ঠাওর করতে পারে না জরিনা। মূর্তিটার মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই সে নিঃশঙ্ক বিশ্বাসে মাথা নোয়ায় কদমবুসি করার জন্য।
ফজল তার দুই বাহু ধরে টেনে তোলে। ফিসফিসিয়ে বলে, নানা জরু, আমার পায়ে হাত দিও না। আমি–আমি পাপী, আমি ডাকাইত। তার কণ্ঠে কান্নার রেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে।
না–না, মিছা কথা–মিছা কথা।
জরিনা তার হাত ধরে কাশবনের দিকে যেতে যেতে বলে, আমার হাউড়ি আছে ঘরে। টের পাইয়া যাইব।
