আইচ্ছা, এই যে গরিব মাঝির নৌকাটা চুরি করলাম। এইটা কি অন্যায় হয় নাই, আমাদের?
নিশ্চয়ই অন্যায় হয়েছে। এর প্রতিকার অবিশ্যি করতে হবে।
কিভাবে করবেন?
সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো পালিয়ে বাঁচি। কতদূর এলে ফজল?
উল্টা বাতাস। নাওটা জোরে চলতেছে না। যতদূর আসছি আরো দুই এতখানি গেলে পাড়ি শেষ হইব। আমি কিন্তু বাড়ি যাইতেছি না।
কোথায় যাচ্ছ তাহলে?
সোজা দক্ষিণ পাড়, আপনে যেইখানে যাইতে চান।
না খেয়ে বৈঠা বাইতে পারবে তো?
তা পারব। কিন্তু আপনার বোধ হয় খিদা লাগব।
না, লাগবে না। তুমি বুঝেশুনে যাও। দেখো কেউ যেন চিনতে না পারে।
না, দাড়ি-মোচে যা একখান চেহারা হইছে, সহজে কেউ চিনতে পারব না।
একটা ছেঁড়া গামছা পড়ে আছে পাটাতনের ওপর।বোধ হয় মাঝি ওটা পা মোছর জন্য রেখেছে। ফজল ওটাই মাথায় বেঁধে নেয়। এবার আর তাকে চেনার সাধ্যি নেই কারো।
একটা ছোট লঞ্চ আসছে পুব দিক থেকে।
কিসের আওয়াজ? জিজ্ঞেস করে মতি। লঞ্চ বোধ হয়?
হ্যাঁ, ছোট্ট একটা লঞ্চ। কিন্তু চলতি বড় জবর।
কিছুদূর দিয়ে লঞ্চটা চলে যায়।
ফজল বলে, কয়েকটা ধলা সাহেব যাইতেছে।
আচ্ছা! লঞ্চটার গায়ে কিছু লেখা আছে?
হ্যাঁ, ইংরেজীতে লেখা আছে, আর্মি বোট নম্বর পি-২৬৮। একটা সাহেব চোখে দূরবিন লাগাইয়া দেখতে আছে।
হুঁ, নদীতে টহল দিতে শুরু করেছে। আমাদের নৌকার নম্বর আছে তো?
মাথির একপাশে আলকাতরা দিয়ে লেখা নম্বর পড়ে ফজল বলে, হ্যাঁ আছে, ১৭৩৫ নম্বর।
নম্বর আছে বলেই বোধ হয় কিছু বলল না। নম্বর না থাকলে কি জানি হয় তো এখনই বিপদ ঘটত।
ভোর থেকেই আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছিল। বেলা এক প্রহরের কিছু পরেই সারা আকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘে। যেন ছানি পড়েছে পৃথিবীর চোখে। ফজল বলে, দিনের অবস্থা বড় ভালো না। মেঘ করছে খুব।
ঝড় উঠবে না তো?
মনে হয় না। এখন তো জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ। ঝড়-তুফান না-ও আসতে পারে। উত্তরের আসমানে খাড়াঝিকি মারতে আছে খুব।
বৈঠাটা আমার হাতে দাও। তুমি জিরিয়ে নাও কিছুক্ষণ।
আরো কয়েকবার বৈঠা চেয়েছিল মতি। কিন্তু ফজল দেয়নি। এবার আর সে মানা করে না। খিদেয় চেঁ-চোঁ করছে পেট। শ্রান্ত হাত দুটো বিদ্রোহ করতে চাইছে।
মতির হাতে বৈঠা দিয়ে বলে ফজল, ডাইন কোনাকুনি রাইখেন নৌকার মাথা। তা না হইলে কিন্তু ভাটির টানে জঙ্গুরুল্লার চরের দিগে লইয়া যাইব।
মতির হাতে বৈঠা দেয়ার আর এক উদ্দেশ্য ছিল ফজলের। সে মাঝির কাঁথার গাঁটরি তন্নতন্ন করে খোঁজে। চোঙা-চুঙি উপুড় করে ঢেলে দেখে, হাতিয়ে দেখে নৌকার উত্তরা। কিন্তু একটা আধলাও খুঁজে পায় না সে। তার আশা ছিল দু-চার আনার পয়সা পেলে চরের কোনো ছুটকো দোকান থেকে চিড়েমুড়ি কিনে নেবে। শান্ত করবে উদরের ভোক্ষসটাকে। ওটা বড় বেশি খাই-খাই শুরু করে দিয়েছে।
ফজল আবার বৈঠা হাতে নেয়। একটা খাড়ি উজিয়ে দক্ষিণের প্রধান স্রোতে পৌঁছবার আগেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করে।
কি করি মতিভাই এখন? বিষ্টি তো শুরু হইল।
কোনো চরের কিনারায় নিয়ে যাও।
ফজল একটা ঘোঁজার ভেতর চলে যায়। পুরো নৌকাটা ঢুকিয়ে দেয় কাশবনের ভেতর। দুটো লগি পুঁতে শক্ত করে বাঁধে দুই মাথি। তারপর সে ছই-এর ভেতর ঢুকে দু’দিকের ঝাঁপ নামিয়ে দেয়।
বৃষ্টি পড়ছে ঝরঝর। ছই-এর ওপর যেন দাপাদাপি করছে দূরন্ত ছেলেরা। ঝড়ো বাতাসে নৌকাটা দুলছে এদিক-ওদিক। ঝাঁপের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির ঝাঁপটা আসছে।
কাঁথার ওপর মতি শুয়ে পড়েছিল। মাঝির তেলচিটে বালিশটা তার মাথার নিচে খুঁজে দেয় ফজল।
বালিশের অর্ধেকটা ছেড়ে দিয়ে মতিভাই বলে, তুমিও শুয়ে পড় ফজল, জিরিয়ে নাও। বিষ্টি যেন কখন থামে ঠিক নেই।
মতিভাই মাথার পাশে মাথা রেখে ফজল বলে, খিদা লাগছে না মতিভাই?
খিদে তো লেগেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই তো আমি করিনি। কাজ না করে বসে বসে খাওয়ার কথা চিন্তা করাও অন্যায়। কাজ করেছ তুমি, খিদে পাওয়া উচিত তোমার।
আমার তো দারুণ খিদা লাগছে।
চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করো। যে পরিশ্রম করেছ—
দু’জনেই চোখ বুজে পড়ে থাকে।
খাবার সময় পেরিয়ে খিদে যখন ধীরে ধীরে মরে যায় তখন ক্লান্ত অবসন্ন শরীর ঘুমে ঢলে পড়ে।
তারা কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, কিছু খেয়াল নেই তাদের। ঝম্ঝম্ বৃষ্টি পড়ছে এখনো। এখনো ঢাকা পৃথিবীর চোখ। তাই সময়ের আন্দাজ করতে পারে না তারা। তবে পেটের ভোক্ষসটা নাড়ি-ভুঁড়িগুলোকে যে রকম খুবলাতে শুরু করেছে তাতে সহজেই বোঝা যায়– খাবার সময় হয়েছে আবার। বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে প্রায় টুবুটুবু হয়েছে নৌকার ডওরা। ফজল তাড়াতাড়ি কয়েকটা পাটাতন সরায়, সেঁউতি বের করে পানি সেচে।
গলুইয়ের ঝাঁপ ফাঁক করে আকাশের দিকে তাকায় ফজল। বলে, বিষ্টি ছেক দেয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, মতিভাই।
কিন্তু সন্ধ্যার আগে বিষ্টি না থামলে সারা রাত এখানেই পড়ে থাকতে হবে।
কেন? রাত্রেই পাড়ি দিয়া ওপার যাইতে পারব।
কিন্তু রাতের বেলা ওপার গিয়ে কোনো লাভ নেই। পথ চিনে যেতে পারব না।
ওপারে কোনে গ্রামে যাইবেন? কার বাড়ি?
নয়নপুরে–আমার বোনের বাড়ি।
নয়নপুর আবার কোনখানে?
পণ্ডিতসার যেতে পথে পড়ে। বছর দশেক আগে এসেছিলাম একবার। বোমার মামলায় পড়ে লুকিয়ে ছিলাম অনেক দিন। এত বছর পরে পথ চিনে যেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।
