কয়েকটা সরু লম্বা জেলে নৌকা নিকারির টেকের দিকে যাচ্ছে। সারা রাত জেগে মইজাল, টানাজাল, জগৎবেড় জাল দিয়ে জেলেরা ধরেছে যে মাছ তা বিক্রি করবে দাদনদার মাছের ব্যবসায়ীদের কাছে।
বাঁদিকে একটা সোতা জুড়ে ভ্যাশাল পেতেছে এক জেলে। বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার সাথে আড়াআড়ি লম্বালম্বি কোনাকুনি বাঁশ বেঁধে সাঁকোর মতো বানানো হয়েছে। এর সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে জাল। সকোর সাথে ঠেকিয়ে ওটার এক কোণে শরীরের ভার চাপিয়ে পাড় দিলে পানি থেকে মাছ নিয়ে ওপরে উঠে যায় জাল। অদ্ভুত এক ফাঁদ। ফাঁদের মালিক ফাঁদ পেতে মাকড়শার মতো চুপচাপ বসে আছে সাঁকোর ওপর।
বড় বড় নৌকা গুনের টানে উজিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম দিকে। কাঁধে বেরুয়া ঠেকিয়ে গুন টানছে মাল্লারা। বছরের এ সময়ে ওদিকে কোথায় যাচ্ছে নৌকাগুলো–জানে ফজল। এগুলো ফজলি আম কিনতে যাচ্ছে মালদহ জেলায়। হালমাচার ওপর দাঁড়িয়ে তোতাশলা আর মুইন্যাশলা ধরে মাঝি হালে গুঁড়ি দিচ্ছে কেডোৎ-কোড়োৎ।
পশ্চিমদিক থেকেও আসছে বড় বড় নৌকা। প্রায় পানিতরাস পর্যন্ত বোঝাই করা হয়েছে নৌকাগুলো। এগুলোতে গুটি আম আসছে রাজশাহী ও মালদহ জেলা থেকে। যাবে বড় বড় বন্দরে। তাড়াতাড়ি বন্দরে পৌঁছতে না পারলে আম পচে যাওয়ার ভয় আছে। তাই অনুকূল স্রোত থাকা সত্ত্বেও মাল্লারা প্রাণপণ দাঁড় টেনে চলেছে।
অনেকদিন পর ফজল ফিরে এসেছে পদ্মায়। পদ্মার পানি, পদ্মার তরঙ্গ তার অন্তরঙ্গ। পদ্মার পলিমাটি তার আশ্রয়। সে আঁজলা ভরে পানি খায়। বুকভরে টানে মুক্ত বাতাস।
ফজল ডানদিকে তাকায়। দূরে পশ্চিম দিকে একটা বাড়ি। কলাগাছের ঘন ঝাড় আড়াল করে রেখেছে ঘরগুলো। এতদূর থেকে একটা শাড়ির আঁচলও দেখা যাচ্ছে না। রূপজান কি তার কথা ভাবছে এখন?
ফজল।
জী।
বাদলের কাছে শুনেছি, তোমাকে মিথ্যে ডাকাতি মামলায় জড়িয়েছে। ব্যাপারটা কি বলো তো?
ফজলের মুখে সব ঘটনা শুনে শক্ত হয়ে ওঠে তার চোয়াল। সে রাগে ঠোঁট কামড়ায়।
ঐ যে দ্যাখেন মতিভাই, ডানদিকে দূরে ধু ধু দেখা যায় সেই খুনের চর।
মতি ডান দিকে তাকিয়ে বলে, হ্যাঁ ঝাঁপসা দেখতে পাচ্ছি। ইংরেজদের চাই জমিদারগুলো হচ্ছে এই সব ঝগড়া-ফ্যাসাদের মূল। ওদের খতম করা দরকার সকলের আগে।
কিছুক্ষণ পর আবার সে বলে, জানো ফজল, আগে এখানে নদী ছিল না। এখানে ছিল একটা খাল। লোকে বলতো ওটাকে রথখোলার খাল। চাঁদরায়-কেদার রায়দের রথটানা হতো ওখান দিয়ে। আগের দিনে পদ্মা ফরিদপুরের মাঝ দিয়ে বরিশালের কন্দর্পপুরের কাছে মেঘনায় মিশেছিল। এখন যেটা আড়িয়াল খাঁ টোই ছিল তখন আসল পদ্মা।
আইচ্ছা! আমরা তা হইলে চরুয়া ছিলাম না, আসুলি ছিলাম!
হয়তো ছিলে। আগে বাঙলার মাটিতে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ছিল এক সাথে। ব্রহ্মপুত্র গতি বদলে পশ্চিম দিকে গিয়ে যমুনার সাথে মিশে। এই দুটি নদীর স্রোত গোয়ালন্দের কাছে পদ্মার সাথে মিলে যায়। তার পরেই রথখোলার খাল ভাঙতে ভাঙতে নদী হয়ে যায়। চাঁদ রায় কেদার রায়ের কীর্তি, রাজ রাজবল্লভের কীর্তি ধ্বংস করে। তাই পদ্মার আর এক নাম কীর্তিনাশা।
ভালো একটা ইতিহাসের কথা শুনাইলেন মতিভাই। আমরা তো কিছুই জানি না। জানলে কি আর আসুলিরা আমাগো নিন্দা করতে পারে? কথায় কথায় চরুয়া ভূত কইয়া ঠেশ দিতে পারে?
এই যে নদী, এই যে তোমাদের চর–এখানে বিক্রমপুরের অনেক গ্রাম ছিল। পদ্মা বিক্রমপুরকে দু’ভাগ করে গিয়েছে। আগে বিক্রমপুরের দক্ষিণ সীমা ছিল ফরিদপুর জেলার ইদিলপুর। নদীর ভাঙনের ফলে আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীদের কেউ উত্তরপাড় রয়ে গেছে। কেউ চলে গেছে দক্ষিণপাড়।
আমরাও তা হইলে বিক্রমপুরের লোক। এইবার আসুলিরা কেউ টিটকারি দিলেই শুনাইয়া দিমু।
তুমি চরের লোক বলে নিজেকে ছোট মনে করো নাকি ফজল?
আসুলিরা যে তাই কয়।
একদম বাজে কথা। দেশ, কুল, জাতি, ধর্ম দিয়ে কি ছোট-বড় বিচার হয়? মানুষের বিচার হয় তার কাজ দিয়ে–একথা মনে রেখো। তোমার বড় পরিচয় তুমি মানুষ–পৃথিবীর আর সবার মতো মানুষ। তোমার কাজে, কথায়, অবহেলায়, উদাসীনতায় কোনো লোকের সামান্য ক্ষতিও না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবে সব সময়। যারা মানুষকে ভালোবাসে, মানুষের ভালো করে তারাই বড়, তারাই মহৎ। যারা মানুষকে ভালোবাসে না, মানুষের ভালো চায় না। তারাই ছোট, তারাই অধার্মিক।
ফজল কথাগুলোর কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না। বলে, আপনারাও তো মানুষরে ভালোবাসেন না। শুনছি, আপনারা ডাকাতি করেন, মানুষ খুন করেন।
হ্যাঁ, ডাকাতি করি, দরকার হলে খুনও করি। যারা অমানুষ, যারা দিনের পর দিন মানুষের রক্ত শোষণ করে, অত্যাচার করে, যারা বিদেশী শাসকদের সাথে হাত মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে, বার বার সতর্ক করার পরেও যারা পথে আসে না, তুমি কি মনে করো তাদের বাঁচবার অধিকার আছে? বেঁচে থাকার চেয়ে তারা পচে গলে দেশের মাটির উর্বরতা বাড়াক। এদের অন্যায়-অত্যাচার আর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিকার না করে উদাসীন হয়ে বসে থাকা অন্যায়। এদের ক্ষমা করা মহাপাপ।
কিন্তু অন্যান্য-অত্যাচারের বিচারের জন্য তো আইন-আদালত আছে।
আইন-আদলাত! মতির মুখে বিদ্রুপের হাসি। একটা কাটারি যেন চিকমিকিয়ে ওঠে তার ঠোঁটের ফাঁকে। আইন-আদালত তো পয়সার গোলাম। পয়সাওলা শোষক গোষ্ঠীর কথায় ওঠে বসে।
