মানুষ! দলের কেউ নয় তো?
ফজল ভয়ে ভয়ে নামে খালের ভেতর। কাছে গিয়ে টেনে তোলে মানুষটিকে।
কে? কেরে তুই? উহ্–উহ্।
এ যে মতিভাই! গলার স্বরে চিনতে পারে ফজল। সে বলে, আমি ফজল। শিগ্গির ওঠেন।
মতিকে কাঁধে তুলে সে পাটখেতে নিয়ে বসিয়ে দেয়। হাঁপাতে থাকে তারা দুজনেই। ব্যথা পাইছেননি মতিভাই?
হ্যাঁ, পায়ে চোট লেগেছে। ছাল উঠে গেছে অনেক জায়গায়। হাঁটতে পারবেন? দেখি পারি কিনা। টলতে টলতে দাঁড়ায় মতি। কয়েক কদম ফেলে বলে, পারব।
তবে জলদি চলেন। কিন্তু কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না। চশমাটা পড়ে গেছে পাঁচিল ডিঙোবার সময়। আমার হাতে ধরেন। চলেন শিগগির। কোন দিগে যাইবেন? নিয়ে চলো তোমার যেদিকে ইচ্ছে। তুমিতো দক্ষিণ দিকে যাবে?
হ।
তাই চলো। রাস্তা দিয়ে যেয়ো না কিন্তু।
না। ধানখেতের আইল দিয়া, পাটখেতের আড়ালে আড়ালে যাইতে পারমু। আন্ধার রাইতে কেও-দেখতে পাইব না।
মানুষের আনাগোনার শব্দ পেলে পাটখেত ঢুকে চুপটি মেরে থাকতে হবে, বুঝলে?
ফজল একটা ধঞ্চে গাছ টেনে তোলে। ওটা ভেঙে হাত দু’য়েক লম্বা একটা লাঠি বানিয়ে নেয়। লাঠিটার এক মাথা মতির হাতে দিয়ে অন্য মাথা ধরে ফজল নিয়ে চলে তাকে অন্ধের মতো। তাড়াতাড়ি হাঁটলে তার অসুবিধা হবে ভেবে ফজল আস্তে ধীরে পা চালাচ্ছিল। মতি তাড়া দেয়, আরো জোরে হাঁটো, নইলে ধরা পড়ে যাব।
ফজল এবার জোরে পা চালায়। মতি লাঠি ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় তার পিছু পিছু। পথে কোনো অসুবিধা থাকলে, উঁচু-নিচু থাকলে তাকে আগেই সাবধান করে দেয় ফজল।
.
পূর্ব দিগন্তে চাঁদ উঁকি দিয়েছে। কৃষ্ণপক্ষের এক ফালি সরু চাঁদ। চাঁদের আকার দেখে ফজল বুঝতে পারে, বড়জোর দু’তিন দিন বাকি আছে অমাবস্যার। সে আরো বুঝতে পারে, ধলপহরের সময় হয়ে আসছে। সে বলে, মতি ভাই, রাইত কিন্তু আর বেশি নাই।
আস্তে কথা বলো। ফিসফিসিয়ে বলে মতি। কোথায় এসেছ?
সেরাজাবাদের খালের কিনারে আসছি। এখন কোনমুখি যাইবেন?
খালে পানি আছে?
না।
খালের ভেতর দিয়ে পুব দিকে নদীর পাড়ে চলে যাও। নদীর কিনারা ধরে চলতে চলতে দেখো নৌকা পাওয়া যায় কিনা। নৌকা একটা চুরি না করে উপায় নেই।
খালের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর তারা নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছে।
ছোট শাখানদী। নাম রজতরেখা। ক্ষীণ ঘোলাটে জোছনায় নদীটাকে রুপালি চাঁদরের মতো মনে হয়।
তারা চলতে থাকে নদীর কিনারা ধরে। কিছুদূর গিয়েই একটা ছইওলা এক-মাল্লাই নৌকা দেখতে পায় ফজল। একটা বাড়ির নিচে নদীর ঘাটে বাঁধা নৌকাটা।
মতিভাই, একটা নৌকা পাইছি। কিন্তু নৌকার মাঝির বাড়ি বোধ করি নদীর পাড়েই। টের পাইয়া গেলে
না টের পাইব না। রাতের এ সময়ে কেউ জেগে নেই। চলো, উঠে পড়ি নৌকায়।
দু’জনেই নৌকায় ওঠে। ফজল রশি খুলে পাড়া উঠিয়ে নৌকা ছেড়ে দেয়।
পুব পাড়ে লোকজনের বসতি কম। ওপাড়ে চলে যাও। আমাকেও একটা বৈঠা দাও। চোখে ভালো না দেখলেও টানতে পারব।
দু’জনে বৈঠা টেনে যখন দিঘিরপাড় বরাবর পৌঁছে তখন সূর্য উঠে গেছে। দিঘিরপাড় ডানে রেখে আরো কিছুক্ষণ বৈঠা টানার পর তারা বড় নদীতে গিয়ে পড়ে।
এইবার কোনমুখি যাইবেন, মতিভাই?
চলো দক্ষিণপাড় চলে যাই। পাড়ি দিয়ে যেতে পারবে তো?
তা পারব। কিন্তু অনেকদূর উজাইয়া পাড়ি দিতে অইব।
কেন?
পানির তেজ খুব বেশি। সোজা পাড়ি দিলে দক্ষিণপাড় যাওয়া যাইব না। নৌকা ঠেইল্যা লইয়া যাইব মেঘনায়।
প্রাণপণ বৈঠা টানে দু’জনে। বাঁ-দিকে একের পর এক বাহেরক, সাতকচর আর চাকমখোলা পেছনে ফেলে ধীর গতিতে উজিয়ে চলছে নৌকা। আরো কিছুদূর গিয়ে ফজর দাত্রার খাড়ির মধ্যে নৌকা ঢুকিয়ে দেয়।
এইবার আপনে বৈঠা রাখেন, মতিভাই। আমি একলাই বাইয়া যাইতে পারমু।
অনভ্যস্ত মতি বৈঠা টেনে খুবই ক্লান্ত। সে বৈঠা রেখে সটান শুয়ে পড়ে ছই-এর নিচে পাটাতনের ওপর।
দক্ষিণ দিকে নৌকা চলছে। কিছুদূর যাওয়ার পর ফজল বলে, মতিভাই আমি তো প্রায় বাড়ির কাছে আইসা পড়লাম।
উঁহু, এখন বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না তোমার।
কিন্তু পেটে কিছু না দিলে এতটা পথ
তা ঠিকই বলেছ। তবে চলো। বাড়ি গিয়ে কিন্তু বেশিক্ষণ থাকা চলবে না। দেরি হলে বিপদ হবে।
বৈঠা টানতে টানতে ফজলের হঠাৎ মনে হয়, বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। বাবা মারা যাওয়ার পর মা, বোন, আত্মীয়-স্বজন শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে। তাকে দেখে কান্নার রোল পড়ে যাবে বাড়িতে। মা বিলাপ করতে শুরু করবে। তার নিজের বুকের কান্নাও বাঁধ মানবে না তখন।
ফজলের চোখ ঝাঁপসা হয়ে ওঠে।
ভোরের রোদের ছোঁয়া লাগছে পিঠে। ফজল সুমুখে ডানে বাঁয়ে তাকায়। পরিচিত পরিবেশ তার চোখ জুড়িয়ে দেয়।
অসংখ্য ডিঙি। ডিঙির মালিকেরা ইলিশ মাছের জাল ফেলে খোট ধরে বসে আছে। সাথের লোক গলুইয়ে বসে আছে হাল ধরে। স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে ডিঙি একটার পর একটা। যেন ডিঙির মিছিল। দ্রুত ধাবমান ইলিশ মাছ জালে ধাক্কা খেলে খোট-ধরা হাত টের পায়, ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে সারা শরীর। আর অমনি টান মেরে জালের ছড়িয়ে থাকা প্রান্ত দুটি একসাথে মিলিয়ে বন্ধ করে দেয়। মাছ আটকা পড়ে যায় জালের ভেতর। ফজল জানে, এ এক অদ্ভুত শিহরণ, অদম্য নেশা। কোনো এক ইলিশ শিকারি নাকি স্বপ্নে খোট পেয়ে জোরে মেরেছিল এক টান। তার আঙুল ঢুকে গিয়েছিল বউর নাকের চাঁদবালির মধ্যে। টানের চোটে আঙুলে আটকানো চাঁদবালি নাক কেটে বেরিয়ে গিয়েছিল।
