কী ঠিক আছে, বুঝতে পারে না ফজল। কিছুক্ষণ পরই সে দেখে আল্লাস বিঘত দেড়েক লম্বা কালোমত কি একটা জিনিস তার জামার ভেতর থেকে বার করে রানের নিচে রাখল।
মতি বলে, মোহন, এবার তোর সেই গানটা ধর। আর তোরা সবাই কবির সাথে সাথে দোহার ধরিস আর তালে তালে তালি দিস।
মোহন : ও ভাই কোথা থেকে উড়ে এল লালমুখো বাদুড়, ও ভাই কোথা থেকে ………
একজন : কোথা থেকে?
মোহন : পার হয়ে তেরো নদী সাত সমুদ্র,
সকলে : ও ভাই জাগো…জাগোরে ভাই জাগো,
ও ভাই ওঠো…ওঠোরে ভাই ওঠো,
করো তারে দূর।
তালির তালে তাল মিলিয়ে লোহা-কাটা করাত চলে দরজার শিকের ওপর। গান আর হাততালির শব্দে ঢাকা পড়ে করাতের আওয়াজ। পাহারাদার টহল দিয়ে এদিকে মুখ ঘোরাবার আগেই কারো রানের নিচে চলে যায় করাতটা।
মোহন : ও ভাই উড়ে এসে জুড়ে বসে বড় সে চতুর,
ও ভাই উড়ে এসে…এ…এ…
একজন : তারপর?
মোহন : তার সাথে যোগ দি’ছে–(প্রহরীর দিকে তাকিয়ে) কে বলো তো?
প্রহরী : কে?
মোহন : তার সাথে যোগ দিছে ছুঁচো আর ইঁদুর,
সকলে : ও ভাই মারো–মারো রে ভাই মারো,
ও ভাই কাটো–কাটোরে ভাই কাটো,
করো তারে দূর।
বারবার গাওয়া হচ্ছে একই চরণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই গানের কথা আর সুর রপ্ত হয়ে যায়। ফজলের। সে-ও তালি বাজিয়ে গান গায় সকলের সাথে।
মোহন : ও তোর বুকে বসে খুন চুষে পেট করে সে পুর,
ও তোর বুকে বসে…এ..এ…
একজন : তারপর?
মোহন : লুটে নেয় নিজ দেশে সাত-সমুদ্দূর।
সকলে : ও ভাই ধরো, ধরোরে ভাই ধরো,
ও ভাই লড়ো, লড়োরে ভাই লড়ো
করো তারে দূর।
দুটো শিকের বেশ কিছুটা কাটা হয়ে গেছে। কিন্তু করাতের আওয়াজ যেন বেশি হচ্ছে এখন। গান আর তালির শব্দ ছাপিয়ে রাখতে পারছে না করাতের কুড়ুৎ-কুড়ুৎ আওয়াজ। মতি শঙ্কিত হয়। সে করাত চালানো বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে মোহনকে বলে, ওরে কবি, তোর গানের জারিজুরি আর চলবে না এখন। নতুন গান তৈরি কর।
কিছুক্ষণ পর মোহন আবার নতুন গানে টান দেয় :
আমার দেশের কৃষাণ-মজুর,
মাঝি-মাল্লা, কামার-কুমোর,
ওরাই যে খাঁটি মানুষরে–
ঐ যে দেখ মাঝি ভাই,
বাড়িতে তার খাবার নাই,
তবু তার বৈঠা চরে কুডুৎ-কুড়ুৎ
সকলে : কুড়ুৎ-কুড়ুৎ-কুড়ুৎ-কুড়ুৎ
হাততালি আর কুড়ুৎ-কুড়ুৎ শব্দ এবার করাতের আওয়াজকে বেমালুম ঢেকে দেয়।
মোহন : ঐ যে দেখ কারিগর,
নাইক তার চালে খড়,
তার কুঁদ-বাটালি চলে তবু খুড়ুৎ-খুড়ুৎ
সকলে : খুড়ৎ-খুড়ৎ-ঋড়ৎ-খুড়ুৎ
মোহন: গোয়াল ভাইরে দেখ চেয়ে,
দেখছে কি সে ঘি খেয়ে?
তবু সে মাখন টানে ঘুড়ুৎ-ঘুড়ুৎ।
সকলে : ঘুড়ৎ-ঘুড়ৎ-ঘুড়ৎ-ঘুড়ৎ
মোহন : তাঁতি ভাইয়া কাপড় বোনে,
ছেঁড়া কাপড় তার পরনে,
তবু সে মাকু চালায় ঠুড়ুৎ-ফুড়ুৎ
সকলে : টুডুৎ-ঠুড়ুৎ-ঠুড়ৎ-ফুড়ুৎ
মোহন : আমরা যে ভাই খাঁচার পাখি,
চোখের জলে ভাসে আঁখি,
খাঁচা ভেঙে কেমনে পালাই ফুড়ুৎ-ফুড়ৎ
সকলে : ফুড়ৎ-ফুড়ৎ-ফুড়ৎ-ফুড়ৎ
রাত বারোটায় নতুন পাহারাদার আসার আগেই দুটো শিক কাটা হয়ে গেছে। এক একটার দু’জায়াগায় করাত চালানো হয়েছে দু’হাত অন্তর। অল্প আঁশের ওপর যথাস্থানে রেখে দেয়া হয়েছে ওগুলোকে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না।
মতি, বাদল ও আরো একজন দরজার কাছে বিছানা পেতে শুয়ে আছে।
পেটাঘড়ি রাত একটা ঘোষণা করে।
মতি শুয়ে শুয়েই দৃষ্টি ফেলে আমগাছটার টিকিতে। পাতার ওপর আলোর চিকিমিকি দেখে সে টোকা দেয় বাদলের গায়ে। বাদল কাশি দিয়ে সঙ্কেত জানায় আর সবাইকে!
ঠক-ঠক আওয়াজ তুলে টহল দিচ্ছে প্রহরী। এ দরজা থেকে ঘুরে সে এগিয়ে যাচ্ছে অন্য প্রান্তে। তার বুটের আওয়াজ ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। বাদল আলগোছে মোড় দিয়ে শিকের টুকরো দুটো খসিয়ে ফেলে। সে আর আল্লাস চুপিসারে বেরিয়ে বারান্দার থামের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে।
প্রহরী এগিয়ে আসছে অন্য প্রান্ত থেকে। দরজার কাছে পৌঁছবার আগেই পেছন থেকে বাদল শক্ত হাতে তার মুখ চেপে ধরে রুমাল দিয়ে। আর আল্লাস তাকে জাপটে ধরে রাইফেলটা সরিয়ে নেয়।
দু’জনে তাকে মাটিতে পেড়ে তার মুখের ভেতর রুমাল গুঁজে দেয়। মুখ থেকে সামান্য আওয়াজ বের করবারও সুযোগ পায় না প্রহরী। তার লাল পাগড়িটাকে তারা দুটুকরো করে তার হাতে পায়ে বেঁধে উপুড় করে চেপে ধরে রাখে।
মতি দলের আর সবাইকে নিয়ে নিঃশব্দ পায়ে ছুটে যায় পেছনের পাঁচিলের দিকে। বাইরে থেকে একটা দড়ির মই নেমে আসে। মই বেয়ে চটপট তারা পাঁচিলের বাইরে চলে যায়। বাদল আর আলাস এসে দেখে, ফজলও উঠছে মই বেয়ে।
বাদল ফিস ফিস করে বলে, এই ফজল, তুমি কেন পালাচ্ছ? কেন নিজের বিপদ বাড়াচ্ছ?
আলাস বলে, আরে যেতে দাও। জলদি করো।
বাইরে বেরিয়ে সটকে পড়ে যে যেদিকে পারে, মিশে যায় কালো রাত্রির অন্ধকারে।
অল্পক্ষণ পরেই বেজে ওঠে পাগলা ঘণ্টা। রাত্রির নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে ঘন্টা বাজতে থাকে অবিরাম।
ফজল ছুটছে। অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে, কাঁটার আঁচড় খেয়ে সে ছুটছে। একটা শুকনো খাল পেরিয়ে সে পাটখেতের ভেতর ঢোকে। চুপটি মেরে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয়া দরকার।
খালের ভেতর কিছু একটা গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো।
ফজল দাঁড়ায়। অন্ধকারে সাদামতো কিছু একটা নড়ছে, কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়।
