কয়েকদিন পরে আবার ফজলকে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু এবারেও তার উকিল জামিন মঞ্জুর করাতে পারেননি। মেহের মুনশির কাছে বাড়ির খবরাখবরের সাথে এক দুঃসংবাদ পায় ফজল। পুলিস আর মিলিটারি মিলে তাদের এলাকার শতশত নৌকা ফতেগঞ্জ নিয়ে আটক করেছে। ফজলদের নতুন পানসি আর ঘাসি নৌকাটাও নিয়ে গেছে। অনেকে ফতেগঞ্জ গিয়ে তাদের নৌকায় নম্বর লাগিয়ে ফেরত নিয়ে এসেছে। এর জন্য নাকি অনেক টাকা ঘুস দিতে হয়। মেহের মুনশি ফতেগঞ্জ গিয়েছিল। দেশের সব জায়গা থেকেই নৌকা আটক করা হয়েছে। হাজার হাজার নৌকার ভেতর থেকে সে ফজলদের পানসিটা খুঁজে বার করতে পারেনি। ঘাসিটা সরকার কিনে নিতে চেয়েছিল। দাম ধার্য হয়েছিল মাত্র একশ’ টাকা। তিরিশ টাকা বোট ইন্সপেক্টরকে ঘুস দিয়ে ওটায় নম্বর লাগিয়ে ফেরত আনা হয়েছে।
ফজলের মনে হয়, নতুন পানসিটা দেখে কারো লোভ লেগেছিল। সে-ই নিজের বলে দাবি করে ঘুস দিয়ে ওটা নিয়ে গেছে।
বিপদ কখনো একা আসে না। কথাটা একেবারে খাঁটি–ভাবে ফজল। যে পানসিটা গেল তা আর সারা জীবনেও সে গড়াতে পারবে না।
এত নৌকা জমা করছে কেন সরকার? আবার কতগুলোয় নম্বর লাগিয়ে ছেড়েই বা দিচ্ছে কেন?–ফজল বুঝতে পারে না। বাদল বুঝিয়ে দেয় ব্যাপারটা : এই নদী-নালার দেশে নৌকা ছাড়া যুদ্ধ করা অসম্ভব। সৈন্য-সামন্ত, যুদ্ধের সরঞ্জাম ইত্যাদি পারাপার আনা-নেয়ার জন্য নৌকার দরকার। জাপানিরা এগিয়ে আসছে। দরকারের সময় যাতে নৌকার অভাব না ঘটে, আবার বেগতিক দেখলে সমস্ত নৌকা পুড়িয়ে ডুবিয়ে কৃতিত্বের সাথে পালানো যায় তাই নৌ-শুমারি করে রাখছে ইংরেজ সরকার। তারা বেছে বেছে কিছু নৌকা কিনেও রাখছে যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের জন্য।
ফজল অবাক হয়ে ভাবে–এত খবর রাখে এ রাজনৈতিক বন্দিরা! তারা খবরের কাগজ পড়ে। তাই দুনিয়ার খবর তাদের পেটে। এক-একজন যেন খবরের গুদাম।
খবরের কাগজ পড়বার জন্য এরা অস্থির হয়ে পড়ে। জেলখানায় খবরের কাগজ আসার সাথে সাথে রাজনৈতিক বন্দিরা এক-একজন এক-এক পাতা নিয়ে পড়তে শুরু করে। একজন পড়া আরম্ভ করলে তিন-চারজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে সে পাতার ওপর। স্বাধীনতা আন্দোলন আর যুদ্ধের খবর জানার জন্য এরা সব উদগ্রীব। এদের দেখাদেখি ফজলও কাগজ পড়া শুরু করেছে। সবার পড়া হয়ে গেলে সে কাগজের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলে। মোহামেডান স্পোর্টিং-এর খেলা থাকলে সে এদের মতো অস্থির হয়ে যেত কাগজ পড়ার জন্য। লেখাপড়া ছেড়ে দেয়ার পর সে আর কাগজ পড়ার সুযোগই পায় নি। এখন অন্যান্যদের মতো সে-ও খবরের কাগজ আসার প্রতীক্ষায় সময় গোনে।
এতদিন দুনিয়ার কোনো খবরই রাখত না ফজল। এখন খবরের কাগজ পড়ে সে বুঝতে পারে–দুনিয়ার হালচাল বদলে যাচ্ছে, যুদ্ধের কারণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে দুনিয়ার চেহারা।
কাগজ পড়ে সে আরো জানতে পারে, সারা দেশব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিরোধ বেড়েই চলেছে। কংগ্রেস চায় অখণ্ড ভারত আর মুসলিম লীগ চায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় মুসলিমদের জন্য আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র–পাকিস্তান।
১৭-২০. মহকুমার জেলখানা
মহকুমার জেলখানা। পাশাপাশি দুটো মাত্র ব্যারাক। একটায় রাখা হয় বিচারধীন আসামি, অন্যটায় স্বল্প মেয়াদের দণ্ডিত অপরাধী। ব্যারাক দুটোর শিকের দরজা একই দিকে অবস্থিত। দরজার সামনে খোলা লম্বা বারান্দা। একজন রাইফেলধারী সেপাই বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত টহল দিয়ে ফেরে।
আলো-বাতাসের জন্য কয়েদিরা দরজার কাছ ঘেঁষে জটলা করে সব সময়। অনন্ত আকাশ আর সবুজ গাছপালার দিকে তাকিয়ে ক্লান্তি আসে না তাদের চোখে। মনের আনন্দে উড়ে যাওয়া মুক্ত পাখির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনেকে।
রাত আটটার ঘন্টা পিটিয়ে এক পাহারাদার তার চার ঘণ্টার কাজের পালা শেষ করে। নতুন পাহারাদার আসে তার জায়গায়।
ষড়যন্ত্র মামলার আসামিরা দরজার কাছে বসে গল্পগুজব করে। শুধু মতি জানালার গরাদের ওপর দুই কনুই রেখে চুপচাপ বসে আছে। তার দৃষ্টি পাঁচিলের বাইরের একটা আমগাছের ওপর। ঘন অন্ধকারে গা ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে গাছটা। এক লহমার জন্য হঠাৎ গাছের টিকির কয়েকটা পাতা চিকমিকিয়ে ওঠে যেমন চিকমিক করে শেষ বিকেলের রোদে। কিছুক্ষণ পর পর আরো দু’বার দেখা যায় সে ক্ষীণ আলোর চিকিমিকি।
মতি উঠে দাঁড়ায়। দলের লোকদের বলে, কিরে তোরা চুপচাপ বসে আছিস কেন? একটু গান-টান কর।
দ্বিতীয়বার আর বলতে হয় না। একজন গানে টান দিতেই দলের সবাই গাইতে শুরু করে দেয়–
ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা,
তাহার মাঝে আছে দেশ এক–
সকল দেশের সেরা;
ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ,
স্মৃতি দিয়ে ঘেরা;
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাক তুমি,
সকল দেশের রানী সে যে–
আমার জন্মভূমি,
সে যে আমার জন্মভূমি,
সে যে আমার জন্মভূমি।
ফজল ও বাকি সাত-আটজন আসামি দূরে বসেছিল। গানের আকর্ষণে ফজল গিয়ে বাদলের পাশে বসে। গানের কথা ও সুর গুনগুন করে তার মনের ভেতর।
গান শেষ হয়। ফজলকে দেখে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে সকলে। বাদল মতির দিকে চেয়ে বলে, ঠিক আছে, কোনো অসুবিধে হবে না।
