বাড়ির থেকে বেশ খানিকটা দূরে নদীর ঘাটে ভিড়ে রয়েছে জঙ্গুরুল্লার পানসি। আসামি নিয়ে সেটায় চড়ে বসে সবাই। তাদের সাথে ওঠে আরশেদ মোল্লাও।
ফজল এদিক-ওদিক তাকায়। জোছনার আলোয় দৃষ্টি চলে অনেকদূর। কিন্তু ধারে-কাছে কোনো নৌকা দেখা যায় না। ফজল ভাবে, হাশমত আসেনি। হয়তো এসেছিল, পালিয়ে গেছে। ভালোই করেছে। তাকে পেলেও ছাড়ত না এরা।
জঙ্গুরুল্লা আবার বলে, কিরে ব্যাডা, কইলাম কি? তোর কাছে তো আর দেনমহরের টাকা দাবি করতে আছে না। কি ও মোল্লা, আছে দাবি?
উঁহু, আমার মাইয়ার দেনমহরের ট্যাহা চাই না।
এইতো। এখন মোখেরতন তিনডা কথা বাইর কইর্যা ফ্যা–তিন তালাক বায়েন। আমরা বেবাক সাক্ষী।
না আমি কইমু না।
ব্যাডা কইবি না। তোর গলায় পাড়া দিয়া কথা বাইর করমু। জঙ্গুরুল্লার সাথের লাঠিধারী লোকটি বলে।
ফজল হাবিলদারকে বলে, হাওয়ালদার সাব, আমার একটা হাত ছাইড়া দ্যানতত, দেখি কে কার গলায় পাড়া দিতে পারে।
এই দবির, আমি থাকতে তোরা ক্যান কথা কস? ধমক দেয় জঙ্গুরুল্লা। তারপর সুর নরম করে বলে, শোন ফজল, আমি তোর বাপের বয়সী। যা কই ভালোর লেইগ্যা কই। এই বেচারার মাইয়াডারে ঠেকাইয়া রাখলে তোর কী ফয়দা অইব?
আমার ফয়দা আমি বুঝি।
কিন্তু আমি শুনছি মাইয়া তোরে চায় না।
মিছা কথা, একদম মিছা কথা।
কি মোল্লা, তুমি কি কও?
হ ঠিক কইছেন, আমার মাইয়া ওর ঘর করতে রাজি না।
রাজি না, তয় তারেই তালাক দিতে কন। আমি দিমু না’, ফজল বলে।
আরে মাইয়ালোকে তালাক দিতে পারলে কি আর তোরে জিগাইতাম! জঙ্গুরুল্লা বলে। মাইয়া যখন তোরে চায় না তখন–
আমি বিশ্বাস করি না।
আইচ্ছা, এই কথা? যাও তো দফাদার। আর কে যাইব? দবির যাও। মাইয়ারে জিগাইয়া আমার কাছে আইসা সাক্ষী দিবা।
দফাদার ও দবির গোরাপিকে নিয়ে আরশেদ মোল্লা বাড়ি যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলে, মাইয়া কইছে, সে ডাকাইতের ঘর করব না।
ছারেছার মিথ্যা কথা। আমি আমার নিজের কানে শুনতে চাই। ফজল বলে।
নিজের কানে শোননের কি আছেরে ব্যাডা ঘাড়য়া? এতগুলো মাইনষে সাক্ষী দিতে আছে। জঙ্গুরুল্লা খেঁকিয়ে ওঠে।
না, সিধা আঙ্গুলে ঘি উঠব না। দফাদার বলে।
ঠিক কথা কইছ। কাগজ-কলম বাইর কর। লেখ, অমুকের মাইয়া অমুকেরে আমি তিন তালাক বায়েন দিলাম।
দফাদার একটা কাগজে লিখে জঙ্গুরুল্লার দিকে এগিয়ে দেয়। জঙ্গুরুল্লা সেটা হাবিলদারের হাতে দিয়ে বলে, নেন হাওয়ালদার সাব। এইবার সই আদায় করণের ভার আপনের উপর দিলাম।
হাবিলদার ফজলের ডানহাত থেকে হাতকড়া খুলে নিয়ে বলে, করো দস্তখত, ক দোও।
না করুম না।
গালে থাপ্পড় মেরে হাবিলদার বলে, কর দস্তখত।
করমু না। আরো জোরে চেঁচিয়ে বলে ফজল।
আবার থাপ্পড় পড়ে ফজলের গালে।
জলদি দস্তখত কর।
না–না–না।
জঙ্গুরুল্লা আরশেদ মোল্লাকে বলে, তুমি বাড়ি যাও। চিন্তা কইর্য না। দস্তখত আদায় কইর্যা ছাড়মু মনে করছ? ও মাঝিরা নৌকা ছাড়ো।
আরশেদ মোল্লা পানসি থেকে নেমে বাড়ির দিকে পথ নেয়।
.
১৫.
আসাধারণ রূপ নিয়ে জন্মেছিল বলে নাম রাখা হয়েছে রূপজান। গাছপাকা শবৃরি কলার মতো তার গায়ের রঙ। যৌবনে পা দেয়ার সাথে সাথে সে রঙের ওপর কে যেন মেখে দিয়েছে জোছনার স্নিগ্ধতা। তার ঈষৎ লম্বা মুখে টিকলো নাক। মমতা মাখানো টানা চোখ। চোখ দুটির যেন আলাদা সত্তা আছে। পাতলা ঠোঁট নেড়ে কথা বলার সময় প্রজাপতির ডানার মতো নড়ে তার চোখের পাপড়ি। ঝিলিক মেরে ওঠে ঘন নীল চোখের তারা। হাসবার সময় শশার বিচির মতো ছোট ছোট সুবিন্যস্ত দাঁত দেখা যায় কি যায় না।
শুধু রঙ-চেহারাই নয়। স্বাস্থ্যও তার ভালো। দোহারা গড়ন। দিঘল শরীর থেকে লাবণ্য যেন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। মজবুত ভিতের ওপর গঠিত তার পরিপুষ্ট বক্ষে যেন বাসা বেঁধেছে সারা দুনিয়ার লজ্জা। প্রতিবেশিনীদের বিবেচনায় শরীরটা রূপজানের আমুনে। বুড়িয়ে যাবে তাড়াতাড়ি, পাকবে আমন ধানের মতো দেরিতে। শুধু একটা জিনিসের অভাব। তার চুল কালো নয়। দু-তিন দিন তেল না পড়লে তার চুলের লালচে রঙ বেরিয়ে পড়ে।
রঙ ও চেহারা-সুরত সবটাই রূপজান পেয়েছে তার মা সোনাভানের কাছ থেকে। সোনাভানের মা চন্দ্রভান ছিল ধলগাঁয়ের কলু বংশের মেয়ে। সে বংশের সব ছেলে-মেয়ের গায়ের রঙ শশার মতো। গ্রামের লোক তাই ঐ বংশকে বলত পাকনা শোশার ঝাড়। চন্দ্রভানের স্বামী আদালত শেখ ছিল নারায়ণগঞ্জের এক পাট-কোম্পানির মালিক জন ল্যাম্বার্টের কুঠির মালি। আর আরশেদ মোল্লা ছিল তার কুত্তার রাখাল। সায়েবের একমাত্র ছেলে স্টিফেন বিলেত থেকে এসেছিল বাপের কাছে। তার নজর পড়ে সোনাভানের ওপর। সায়েব টের পেয়ে সাত-তাড়াতাড়ি আরশেদ মোল্লার সাথে সোনাভানের বিয়ে ঘটিয়ে দু’হাজার টাকা যৌতুক দিয়ে বিদেয় করেন কুঠি থেকে।
বিয়ের হাটে রূপসী মেয়ের জন্য গ্রাহকের ভিড় জমে। রূপজানের জন্যও ভিড় জমেছিল। নিলাম ডাকার মতো গয়না ও শাচকের টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে রূপজানকে ছেলের বউ করে ঘরে নিতে পেরেছিল এরফান মাতব্বর।
রূপজানকে মাতব্বর পছন্দ করেছিল শুধু তার রূপ দেখে। ছেলের বিরহী ভাঙা মনকে জোড়া লাগাবার জন্যই দরকার ছিল জরিনার চেয়েও সুরলী মেয়ের। তাই মেয়ের বাপের কুল, মায়ের কুল দেখবার প্রয়োজন বোধ করেনি সে, গ্রাহ্য করেননি গায়ের প্রবাদ–
