ফজলের বিরক্তি ধরে। এত রাত্রে আবার তামুকের নেশা ধরল ব্যাটার!
ঝপড়-ঝপপড় শব্দ তুলে স্টিমার চলছে। তার সার্চলাইটের আরো পশ্চিম দিকের জানালা গলিয়ে কাছারি ঘরে ঢোকে। ঘরটাকে দিনের মতো ফর্সা করে দিয়ে যায় কিছুক্ষণ পর পর।
পশ্চিম থেকে পুবদিকে যাচ্ছে–কোন্ জাহাজ এটা? এ সময়ে তো কোনো জাহাজ নেই। নিশ্চয়ই সৈন্য বোঝাই করে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, মেহেরবানি কইর্যা রাইতের আন্ধারেই যাইস। দিনে দুফরে যাইস না কোনো দিন। মনে মনে বলে ফজল।
কয়েকদিন আগে দুপুরবেলা একটা বড় স্টিমার পশ্চিম থেকে পুবদিকে যাচ্ছিল। ওটায় বোঝাই ছিল বিদেশী সৈন্য। দশ বারোটা গোরা সৈন্য উদাম-উবস্তর হয়ে গোলস করছিল খোলা পাটাতনের ওপর।
চাঁদ প্রায় মাথার ওপর এসে গেছে। হাশমতের আসার সময় হলো।
বাইরে পায়ের শব্দ শোনা যায়। পুনপুনু করে কথাও বলেছে যেন কারা। বোধ হয় হাশমত আর লালু এসেছে। কিন্তু ওরা শব্দ করছে কোন সাহসে!
ফজল তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে সামনের দরজার খিল খোলে। একটা পাট খুলতেই জোরালো টর্চের আলো তার চোখ ধাধিয়ে দেয়।
ধরো, এই–এই যে আসামি।
ফজল অন্দরমুখি দরজার দিকে দৌড় দেয়। কিন্তু সেখানেও দাঁড়িয়ে আছে লোক।
ফজল হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
এলাকার দফাদার সামেদ আলীকে সাথে নিয়ে দুজন কনস্টেবল ঘরে ঢোকে। তাদের একজন হাতকড়া নিয়ে এগুতেই ফজল বলে, ঐডা থুইয়া দ্যান। আমি পলাইমু না।
পলানির জন্যিতো দৌড় মারছিলা। চোর-ডাকাইতেরে বিশ্বেস আছে। বলতে বলতে হাতকড়া লাগায় কনস্টেবল।
অন্য দরজা দিয়ে হাবিলদার, জজুরুলা চৌধুরী ও আর একজন লোক ঘরে ঢোকে।
মোল্লা, বাড়ি আছ নি, ও মোল্লা? জঙ্গুরুল্লা চেঁচিয়ে ডাক দেয়।
কে? কারা? বাড়ির ভেতর থেকে প্রশ্ন করে আরশেদ মোল্লা।
আরে আসো এদিগে। দেইখ্যা যাও।
ফজল দফাদারকে অনুরোধ করে, আপনে একটু কইয়া দ্যা না! আপনে কইলে হাতকড়াডা খুইল্যা দিব।
খুলব নারে বাপু। তারা আইনের মানুষ। আইনের বাইরে কিছু করতে পারব না।
হারিকেন নিয়ে আরশেদ মোল্লা আসে। সকলের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে সে এক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিস দেখে সে যেন ভেবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কথা সরছে না তার।
চাইয়া দ্যাখ্ছ কি? জঙ্গুরুল্লা বলে। জামাইরে বুঝিন একলাই সমাদর করবা। আমরা বুঝি সমাদর করতে জানি না।
সমাদর এই রাইত দুফরের সময়?
এমুন সময় না আইলে কি জামাইমিয়ার দরশন পাওয়া যাইত?
ডুকরে কেঁদে উঠছে কেউ। আওয়াজ আসছে অন্দর থেকে।
দ্রুতপায়ে আরশেদ মোল্লা অন্দরে চলে যায়। কাছারি ঘর থেকে শোনা যায় এ রকম নিচু গলায় সে ধমক ছাড়ে, চুপ কর, চুপ কর হারামজাদি। মান-ইজ্জত আর রাখল না। একটু থেমে সে স্ত্রীকে বলে, তুমি কি করগো। ওরে কাঁথা দিয়া ঠাইস্যা ধরো না ক্যান্?
উঁহু-হুঁ-হুঁ-হুঁ-হুঁ। চাপা কান্নার গুমরানিতে যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে জোছনা-রাতের ফিকে অন্ধকার।
থাম্ বেহায়া শয়তান! আরে তোমারে কইলাম কি? ওর মোখের মইদ্যে টিপলা দিয়া থোও।
কই গেলা মোল্লা? কাছারি ঘর থেকে ডাক দেয় জঙ্গুরুল্লা। আমরা গেলাম গিয়া।
আরশেদ মোল্লা ছুটে আসে কাছারি ঘরে। অনুনয়ের সুরে বলে, চী সাব, ওরে ছাইড়া দ্যান। আমি জামিন রইলাম।
আমি কি জামিনের মালিক? জিগাও হাওয়ালদার সাবরে।
নেহি নেহি, হাওয়ালদার সাব কুছু করতে পারবে না। হাবিলদার বলে গম্ভীর স্বরে।
আরশেদ মোল্লা হাতজোড় করে, হাওয়ালদার সাব। ওরে জামিনে ছাইড়া দ্যান। আমি জামিন রইলাম।
নেহি জ্বী। এ ডাকইতি মামলার এক নম্বর আছামি আছে। হামি জামিন মঞ্জুর করতে পারবে না।
হ, ঠিক কথাইতো। থানার বড় দারোগাও পারব না। জঙ্গুরুল্লা বলে। যাউক বেড়াইয়া আসুক। এত চিন্তার কি আছে? এক শ্বশুরবাড়িরতন যাইতে আছে আর এক শ্বশুরবাড়ি।
আপনে আর কাডা ঘায়ে নুনের ছিড়া দিয়েন না, চদরী সাব। ক্ষুণ্ণ কণ্ঠ আরশেদ মোল্লার।
আরে মিয়া, তোমার তো খরচ বাঁচল। জামাইর লেইগ্যা পিডা-পায়েস তৈয়ার করতে লাগব না কমসে কম সাতটা বছর।
সাত বচ্ছর! আরশেদ মোল্লা যেন আঁতকে ওঠে।
সাত বচ্ছর না-তো কি সাতদিন! ডাকাতি অইল মাডারের’ মানে খুনের ছোড ভাই। দফাদার বলে।
কিন্তুক—কিন্তুক–অরশেদ মোল্লার মুখে কথা জড়িয়ে যায়। কিন্তুক আমার–আমার মাইয়ার কি অইব চদ্রী সাব?
কি অইব তা তুমি জানো আর জানে তোমার গুণের জামাই।
চদরী সার, ওরে কন আমার মাইয়া ছাইড়া দিয়া যাইতে।
কিরে? ফজলের দিকে জঙ্গুরুল্লা বলে। তোর শ্বশুর কি কয় শোনছস?
ফজল কোনো কথা বলে না।
কিরে কথা কস না ক্যান্? তুই আকাম করছস, তুই একলা তার সাজা ভোগ কর। এই বেচারার মাইয়াডারে ক্যান খামাখা কষ্ট দিবি?
হাঁ, ইয়ে ছহি বাত কইছেন চৌধুরী সাহাব। জঙ্গুরুল্লার কথার সায় দেয় হাবিলদার। তোম উহার বেটি কো তালাক দিয়ে দোও। বিলকুল সাফ হোয়ে যাও।
না। দৃঢ়স্বরে বলে ফজল।
ওরে বাবা! টোড়া সাপের তেজ আছে দেখি। দফাদার বলে।
অন্দর থেকে চাপা কান্নার ফোঁপানি ভেসে আসছে।
ফজল কান খাড়া করে। তার দিকে তাকিয়ে তাড়া দেয় জঙ্গুরুল্লা, আর দেরি করণ যায় না। চলো এই বার।
কাছারি ঘর থেকে বেরিয়ে রওনা হয় সবাই। যেতে যেতে জঙ্গুরুল্লা বলে, ও মোল্লা, তোমার কোনো কথা থাকলে আমার নৌকায় চলো।
