বউ আনো ঘর দেখে,
মেয়ে দাও বর দেখে।
প্রবাদটি যে শুধু কথার কথা নয়–পরে বুঝতে পেরেছিল সে আরশেদ মোল্লার শয়তানি দেখে। আর সে জন্য আফসোসও করেছে সে বড় কম নয়। অবশ্য নিজের কৃতকর্মের সমর্থনে সে বলে, বিয়ার আসল জিনিস অইল বউ। বউডা তো রূপে-গুণে, চলা-চতিতে ভালোই আছিল।
রূপজানের তালাকের খবর শুনে আবার ঘটকের আনাগোনা শুরু হয়েছে মোল্লাবাড়ি। সম্বন্ধের প্রস্তাব এসেছে অনেক কয়টা। দরও বাড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। সবচেয়ে লোভনীয় প্রস্তাব একটা এসেছিল জঙ্গুরুল্লার কাছ থেকে তালাকের আগেই। তার পীর মৌলানা তানবীর হাসান ফুলপুরী বছরে দু’বার আসেন এ এলাকায়। একবার বর্ষাকালে, গেরস্তের পাট বেচার সময়। আর একবার শীতকালে, আমন ধান উঠবার পরে পরেই। তিনি বজরা নিয়ে ফেরেন মুরিদানের বাড়ি। জঙ্গুরুল্লা তার জন্য নিজের বাড়িতে মসজিদের পাশে খানকাশরিফ বানিয়ে রেখেছে। পীরসাহেবের বিবিরা থাকেন সুদূর ফুলপুরে। বাঙ্গাল মুলুকের পানির ভয়ে তাদের কেউ তার সাথে আসেন না। এই বিদেশে কে তার খেদমত করে?
তালাকের পর আবার মোল্লাবাড়ি আসে জঙ্গুরুল্লা। সে আরশেদ মোল্লাকে বলে, শোনলাম অনেক সম্বন্ধ আইতে লাগছে?
হ, আইছে কয়েকখান।
আরে এত কায়দা-ফিকির কইর্যা তালাক দেওয়াইলাম আমি। আর মাইনষে বুঝি এহন তৈয়ার ললাটে চিড়া কোটতে চায়! খবরদার মিয়া, মোখের কথা যেন ঠিক থাকে।
মোখের কথা তো ঠিক থাকব। কিন্তু একটা কথা।
কি কথা আবার।
জামাইর বয়স যে শ্বশুরেরতনও বেশি। ঐ যে মাইনষে কয়, তালুইর তন পুত্ৰা ভারী, হেই রহম অইয়া যাইব।
আরে তুমি রাখো ঐ কথা। উনি অইলেন আল্লাওয়ালা মানুষ। উনারা এত ত্বরাত্বরি বুড়া অন না। দেখছ না কেমুন নুরানি চেহারা!
হ, পীর-দরবেশরা তো আল্লার নিজের আতের তৈয়ারি। উনাগ চেহারাই আলাদা।
হ শোন, ইদ্দতের কয়ডা মাস পার অউক। তারপর পীরসাব যখন শাওন মাসে আইবেন, তখন ইনশাল্লাহ্ কাজটা সমাধা করণ যাইব।
আর জমির কথা যে কইছিলেন?
আরে হ, তোমার লেইগ্যা তো দশনল জমি রাইখ্যা থুইছি খুনের চরে।
দশনল না। আরো দশনল দিতে লাগব। মাইয়ার গয়না আপনেগ দেওনের দরকার নাই। গয়না আমিই দিমু।
কি কয়! আলু গয়না
আইচ্ছা! গয়না যদি তুমি দেও, তবে নিও আরো দশ নল। কিন্তু মোখের কথা যে উডায় না।
সব কথা পাকাপাকি করে চলে যায় জঙ্গুরুল্লা। আরশেদ মোল্লা ব্যাপারটা গোপন রাখে। এমন কি তার স্ত্রীর কাছেও বলে না কিছু। খুনের চরে গিয়ে সে মাপজোখ করে বুঝে নেয় বিশ নল জমি।
কিন্তু গোপন কথা বেরিয়ে পড়ে। একদিন আরশেদ মোল্লা আফার থেকে বাক্স নামিয়ে খুলে মাথায় হাত দেয়। রূপজানের একটা গয়নাও তার মধ্যে নেই। সে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দেয় স্ত্রীর সাথে, কই গেল গয়না? তুই গুঁজাইয়া থুইছস?
উনি কি কয়! আমি ক্যান্ গুঁজাইমু?
হ, তুই না জাইলে যাইব কই? বুড়াকালে তোর গয়না পিন্দনের শখ অইছে।
তোবা-তোবা! গয়না পিন্দনের শখ অইলে তো গায়ে দিয়া বইয়া থাকতাম। আর মাইয়ার শরীল খালি কইর্যা মাইয়ার গয়না গায় দেয় এমুন মা আছে দুইন্যায়?
তয় গেল কই? রূপিতে সরায় নাই? রূপি, ও রূপি।
রূপজান এসে দাঁড়ায়। তার চোখ-মুখ ফোলাফোলা। চুল উদ্ভুখু। তেল না পড়ায় নারকেলের ছোবড়ার মতো রঙ হয়েছে সে চুলের।
আরশেদ মোল্লা তার দিকে চেয়ে বলে, গয়নাগুলা তুই সরাইয়া রাখছস?
রূপজান কথার জবাব দেয় না।
কি জিগাইলাম? গয়নাগুলো তুই সরাইয়া রাখছস?
হ।
আমারে না জিগাইয়া নিছস্ এত সাহস তোর!
রূপজান নিরুত্তর।
আরশেদ মোল্লা আবার বলে, কই রাখছস, লইয়া আয়। চোরের যেই উৎপাত চাইরধারে–
যাগো জিনিস তাগো কাছে পাড়াইয়া দিছি।
কি কইলি হারামজাদি! মোল্লা মেঝেতে পড়ে থাকা বাক্সের তালাটা হাতে নিয়ে লাফিয়ে ওঠে। ছুঁড়ে মারে ওটা রূপজানের দিকে। তার মাথাটা কেমন করে যেন তার অজান্তেই একদিকে কাত হয়ে যায়। আর তালাটা তার কানের পাশ দিয়ে শাঁ করে গিয়ে ভেঙে দেয় একটা চালের মকি।
সোনাইবিবি ছুটে আসে। দু’হাত মেলে সে মারমুখি মোল্লার পথ রোধ করে দাঁড়ায়।
ছাড়ো ছাড়ো, ওরে আইজ মাইরা ফালাইমু। ধুইন্যা তুলা-তুলা কইর্যা ফালাইমু।
ছিঃ—ছিঃ—ছিঃ–! জুয়ানমাইয়ার গায়ে আত তোলে, শরমও নাই। ওরে মাইর্যা তো ফালাইছেনই। ও কি আর জিন্দা আছে?
আরশেদ মোল্লা থামে। সে কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলে, হারামজাদি আমারে যে মাইরা ফালাইছে! এহন আমি গয়না পাই কই?
গয়না দিয়া কি করব?
আরে গয়না লাগব না মাইয়ার বিয়া দিতে? গয়না দিতে না পারলে দশ নল জমি ফিরত দেওন লাগব।
জমি ফিরত দেওন লাগব! ক্যান?
আরশেদ মোল্লা আর গোপন রাখতে পারেনা ব্যাপারটা। জঙ্গুরুল্লার কাছে তার ওয়াদার কথা সে খুলে বলে স্ত্রীকে।
সোনাইবিবি শুনে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, মাইয়ার পরানডারে তো এক্কেরে ঝরা কইর্যা ফালাইছে। কায়ামরা বানাইয়া ফালাইছে। এহন আবার কবর দেওনের কারসাজি শুরু করছে।
.
মা বোঝে মেয়ের মন। সত্যিই ঝাঁজরা হয়ে গেছে রূপজানের বুকের ভেতরটা।
ফজলকে ধরে নেয়ার পর তিনদিন সে বিছানায় পড়ে ছিল। দানাপানি ছোঁয়নি। তারপর যখন তালাকের খবর তার কানে এল তখন তার দাঁতকপাটি লেগে গিয়েছিল। হুশ হওয়ার পর আত্মহত্যার স্পৃহা জেগেছিল তার মনে। একটা রশি সরীসৃপের মতো তার মনের দরজায় হানা দিয়েছে বারবার। কিন্তু সে জানে আত্মহত্যা মহাপাপ। তাই সে সরীসৃপ মনের দোরগোড়া থেকেই বিদায় হয়েছে।
