উঁহু। আমার মাইয়া আর ঐ বাড়ি দিমু না। এতদিন বেচছে মাছ। এহন আবার ডাকাতি শুরু করছে।
ডাকাতি! ওইডাতো জঙ্গুরুল্লার কারসাজি। চর দখলের লেইগ্যা মিথ্যামিথ্যি ডাকাতি মামলা সাজাইছে।
আরশেদ মোল্লা উঠে নদীর ঘাটের দিকে চলতে থাকে। অনুনয় বিনয় করতে করতে তার পেছনে চলে হাশমত। কিন্তু তার অনুরোধের কোনো উত্তরই দেয় না সে।
আরশেদ মোল্লা তার ডিঙি বেয়ে পুবদিকে চলে যায়।
হাশমত কাছারি ঘরে ফিরে আসে।
ফজল দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি তার চোখে।
উঁহু, কোনো কাম অইল না। হাশমত বলে। এত কইর্যা কইলাম। কাকুতি-মিনতি করলাম। কোনো কথাই কানে নিল না। ব্যাডা এক্কেরে অমাইনষের পয়দা।
হ, আমি জানতাম, লাথির পেঁকি আঙুলের টোকায় ও না।
হাশমতের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে আবার বলে, তুই চইল্যা যা। লালুগ বাড়িতে গিয়া থাক্। কাইল গেছে পূর্ণিমা। চান মাথার উপরে ওডনের আগেই নাও লইয়া আইয়া পড়বি। লালুরেও সঙ্গে আনিস।
হাশমত চলে যায়।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অন্ধকার কাছারি ঘরে চৌকির ওপর বসে আছে ফজল।
রূপজান জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে যায় তাকে। সে ঘরে গিয়ে হারিকেন ধরায়। ওটা দেলোয়ারের হাতে দিয়ে বলে, যা কাছারি ঘরে দিয়া আয়।
উঁহু, না–না–না। আমি যাইমু না।
ক্যান?
ওরে মা-রে, ডাকাইত! আমার ডর করে।
দুও বোকা।
ও, তুমি হোন নাই? ওরে আর আমি দুলাভাই কইমু না। ও বোলে মারু ডাকাইত। রামদা লইয়া ডাকাতি করে।
রূপজানের চোখ ফেটে পানি আসতে চায়। সে-ও শুনেছে, ফজল ডাকাতি করে। তার বাবা কয়েকদিন আগে উঠানে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে বলছিল, হোনছ রূপির মা, মাতবরের পোলাডা আর ইজ্জত রাখল না। মাছ-বেচা থুইয়া এইবার ডাকাতিতে নামছে। রামদা দ্যাহাইয়া মাইরপিট কইর্যা এক গিরস্তের পাঁচশ ট্যাহা লইয়া গেছে।
রূপজান ধরা গলায় বলে, যা না দাদা, দিয়া আয়।
উঁহু, আমি পারমু না।
রূপজান নিজেই শেষে কাছারি ঘরে যায়। হারিকেনটা চৌকির ওপর রেখেই সে চলে যাচ্ছিল। ফজল খপ করে তার আঁচল ধরে ফেলে। হাসিমুখে সে তাকায় রূপজানের দিকে। কিন্তু তার চোখে পানি দেখে ফজলের হাসি মিলিয়ে যায়। তার চোখও ঝাঁপসা হয়ে আসে।
কারো মুখ দিয়েই কোনো কথা বেরোয় না। দুজনে চেয়ে থাকে দুজনের মুখের দিকে। একজনের মনের পুঞ্জীভূত বেদনা বুঝতে চেষ্টা করে আর একজনের চোখ।
ফজল তাকে কাছে টানে। রূপজান হারিকেনটা নিবিয়ে দিয়ে মুখ লুকায় ফজলের বুকে।
তুমি বোলে ডাকাইত? ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে রূপজান।
কে কইছে তোমারে?ফজল উত্তেজিত স্বরে বলে।
দুনিয়ার মাইনষে কয়।
তুমিও কও? তুমিও বিশ্বাস করো এই কথা?
উঁহু।
ফজল আরো নিবিড় করে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। বলে, সব জঞ্জুরুল্লার কারসাজি। মিথ্যা মামলা সাজাইয়া আমায় খুনের চর দখল কইরা লইয়া গেছে। আল্লার কসম, আমরা কেও ডাকাতি করি নাই।
রূপজান একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
শোন রূপজান, ডাকাতি কোনো দিন করি নাই। তবে আইজ কিন্তু ডাকাতি করমু।
রূপজান কোনো কথা বলে না।
ফজল আবার বলে, শোন, বাড়ির সবাই ঘুমাইয়া পড়লে তুমি আমার কাছে আইসা পড়বা।
উঁহু, আমি আইতে পারমু না।
ক্যান?
সোন্দর সোন্দর কড়া দিয়া যে খোঁপা বান্দে, তারে যে বোলাইয়া লয়।
ফজলের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, কি কইলা বোঝলাম না।
অহনতো বোঝবাই না। তোমার বালিশের তলায় মাইয়ালোকের খোঁপার কড়া আহে ক্যামনে?
আরে, ও-হ্-হো-হো। ঐ দিন রাইতে তোমার দেরি দেইখ্যা মনে করলাম তুমি ঘুমাইয়া পড়ছ। তোমাগ পশ্চিমের ঘরের পিছনে গিয়া আন্দাকুন্দি যেই জানালা ঠেলা দিছি অমনি কো-ও কইর্যা ওঠছে তোমাগ উমের মুরগি। আমি তো মনে করছি কি না জানি কি? ডরে দিছি লাফ। আর পটুট কইর্যা ঢুকলো একটা কড়া। টান দিয়া খুইল্যা দেখি খোঁপার কাঁডা। ঐডা তোমার না?
ঐ রহম কাঁডা কিন্যা দিছিলা কোনো দিন?
তবে কার খোঁপার ঐডা?
আছে এক জনের।
দ্যাখো তো! তোমার মনে কইর্যাই আমি বালিশের নিচে রাখছিলাম। ঐডার খোঁচায় অনেকগুলো রক্ত ঝরছিল। পায়ে এহনো দাগ আছে দ্যাখবা?
ফজলের গলা জড়িয়ে ধরে রূপজান একটা দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন এঁকে দেয় তার ঠোঁটে।
আমি যাই, কেও আইয়া পড়ব।
তোমারে ছাড়তে কি অখন মন চায়। রূপজানের হাতে গলায় হাত বুলিয়ে ফজল বলে, তোমার গা খালি ক্যান? গয়নাগুলা কই?
বা’জানে উড়াইয়া থুইছে চোরের ডরে।
আইজ আমি আইছি। একটু সাজ-গোজ কইর্যা আইও। গয়না ছাড়া কেমুন বিধবা বিধবা দ্যাহা যায়।
ছি! অমুন কথা কইও না। আল্লায় যে কোনো দিন অমুন না করে।
রূপজান, ও রূপজান, কই গেলি?
ঐ মায় বোলাইতে আছে। ছাড়ো, আমি যাই।
ফজলের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে চলে যায় রূপজান।
কালো রাত সারা গায়ে ছোছনা মেখে কেমন মনোহারিণী হয়েছে। বসন্তের ফুরফুরে হাওয়ায় দুলছে তার ঝলমলে আঁচল।
রাতের বয়স যত বাড়ছে, ততোই উতলা হচ্ছে ফজল। এতক্ষণে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়। কিন্তু কেন আসছে না রূপজান?
কাছারি ঘরে চৌকির ওপর শুয়ে শুয়ে সে এপাশ-ওপাশ করে।
হুঁকো টানার গুড়ক-গুড়ক আওয়াজ আসছে।
তার শ্বশুর এখনো জেগে আছে তা হলে!
রাতের খাবার সেরে ফজল দরজায় দাঁড়িয়ে কুলকুচা করছিল। সে সময়ে শ্বশুরকে বাইরে থেকে আসতে দেখেছে সে।
