ধরা পইড়্যা হেষে কি জেল খাটতামনি আমরা। একজন কোলশরিক বলে।
চাকইর্যা হারামজাদারা পলাইল ক্যান। ওই নিমকহারামগুলোরে খেদাইয়া দে।
ওগ খেদাইয়া দিমু! কিন্তু আমরা যে চরদখল করতে চাই আবার। রমিজ মিরধা বলে।
উঁহু। পারবিনা, পারবি না। কঁকাতে কঁকাতে মাতব্বর বলে। ঐ চাকইর্যা দিয়া কাম অইব না। আমি ভালো অইয়া লই।
কিন্তুক বেশি দেরি অইলে ধানগুলাতে কাইট্যা লইয়া যাইব।
লইয়া গেলে আর কি করমু।
জমিরদ্দি : কি করমু! এতগুলা ট্যাহা দিছি আপনের সেলামি।
এরফান : সেলামি নিয়া জমি দিছি। হেই জমি রাখতে না পারলে কি আমার দোষ? আমিও তো নায়েবরে সেলামি দিছি।
আহাদালী : আপনে কারে দিছেন, কি দিছেন, আমরা তার কি জানি?
মেহের মুনশি : অ্যাই তোরা বাইরে যা দেহি। মেহের মুনশি সবাইকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
জমিরদ্দি : ও মিয়া মুনশির পো, আমরা সেলামি দিছি ওনারে। আমরা ওনার কাছে জমি চাই।
মেহের মুনশি : কি শুরু করলা তোমরা? মাতবরের পো-র শরীল ভালো নাই। তোমরা। চুপ অও দেহি।
জমিরদ্দি : ক্যান্ চুপ অইমু? আমাগ সেলামির ট্যাহা ফিরত চাই।
রমিজ মিরধা : ক্যান ফিরত চাও। তোমারে, আমাগ বেবাকরে জমিতো দিছিলই। আমরাই তো রাখতে পারলাম না।
আহাদালী : এমুন কাইজ্যার চরের জমির লেইগ্যা সেলামি নিল ক্যান?
মেহের মুনশি : সেলামি না নিলে চাকইর্যা রাখত কি দিয়া। ওগ রোজানা দিতে, ওগ খাইয়াইতে কি কমগুলা ট্যাহা খরচ অইছে?
রমিজ মিরধা : তোমরা যার যার বাড়িত যাও। মাতবরের পো ভালো অইয়া উড়ুক, তারপর–
মেহের মুনশি : হ, তারপর একটা কিছু করন যাইব। তোমরা যাও। খবরদার, রাইতের বেলা নিজের ঘরে শুইও না। পুলিস কিন্তু ধরতে আইব।
সেদিনের মতো সবাই চলে যায়।
রোজই দু-চারজন কোলশরিক আসে এরফান মাতব্বরকে দেখতে। রুগী দেখতে এসেও তারা রুগীর বিছানার পাশে বসে ঘ্যানরঘ্যানর করে। কেউ সেলামির টাকা ফেরত চায়। এরা অনেকেই ধারকর্জ করে সেলামির টাকা যোগাড় করেছিল। কেউ বুক থাপড়ে কাঁদে। ঘরে তাদের এক দানা খাবার নেই।
এদের সকলের অবস্থাই জানে মাতব্বর। নানা ঘাত-প্রতিঘাত সওয়া বুড়ো মন তার। সে মনে আবেগ-উচ্ছ্বাস বড় বেশি ঠাই পায় না। তবুও এদের দুরবস্থার কথা ভেবে ব্যথিত হয় সে। তার চোখ ছলছল করে ওঠে। কখনো বালিশের তলা থেকে পাঁচ-দশ টাকা তুলে ওদের হাতে দিয়ে বলে, নে, কারো কাছে কইস না। আর কিছুদিন সবুর কর। আমার ব্যারামডা সারুক। জঙ্গুরুল্লারে আমাবস্যা দ্যাহাইয়া ছাইড়া দিমু।
কিন্তু মাতব্বরে ব্যারাম আর সারছে না। শরীরের ব্যারামের চেয়ে মনের ব্যারামেই সে বেশি কাহিল হয়ে পড়েছে। সে বিছানায়ই পড়ে থাকে রাতদিন। মাঝে মাঝে তার মুখ থেকে বেরোয় গালাগালের তুবড়ি। সে সময়ে রাগ ও ঘৃণায় বিকৃত হয় তার মুখ। কখনো উত্তেজনায় সে হাত-পা ছোড়ে, মাথা উঁচু করে বসতে চায়। তার গালাগালের পাত্র জমিদার, নায়েব, জঙ্গুরুল্লা, দারোগা-পুলিস, আরশেদ মোল্লা, এমন কি তার কোলশরিকরাও। তুবড়ির বারুদ পুড়ে শেষ হয়ে গেলে অনেকক্ষণ ধরে সে হাঁপায়। তারপর মরার মতো পড়ে থাকে। এ। সময়ে একটু একটু করে বারুদ জমা হয়। তারপর আবার হঠাৎ তুবড়ি ছোটে।
ফজল দিনের বেলা বাপের বিছানার পাশেই বসে থাকে ডাক্তারের ব্যবস্থামত ওষুধ পথ্য দেয়। রাত্রে পুলিসের ভয়ে সে বাড়িতে ঘুমায় না, চলে যায় দূরের কোনো আত্মীয়বাড়ি।
একদিন আরশেদ মোল্লাকে গালাগাল দিতে দিতে মাতব্বরের রাগ গিয়ে পড়ে ফজলের ওপর। সে মুখ বিকৃত করে বলে, এই একটা ভ্যাদা মাছ। আমার ঘরে ক্যান্ এইডা পয়দা অইছিল–ক্যান্ অইছিল? এত দিনের মধ্যে-আরে এতদিনের মইদ্যে পারল না আহ্ আহ–পারল না নিজের পরিবার পোষ মানাইতে। যা, আইজই যা–আহ-আহ্ বউ আনতে না পারলে––আমার বাড়িতে তোর জা’গা নাই—জাগা নাই কইয়া দিলাম।
বরুবিবি কাছেই ছিল। বলে, হ, আইজই যা। তোর হউর-হাউরিরে কইস ওনার ব্যারামের কথা। বুঝাইয়া কইস, বউমারে দ্যাহনের লেইগ্যা ওনার পরান ছটফট করতে আছে। ওনারাও তো মানুষ। ওনাগো অন্তরে কি আর দয়া-মায়া নাই?
.
আরশেদ মোল্লার অন্তরে সত্যিই বুঝি দয়া-মায়া নেই।
সেদিনই বিকেলবেলা ফজল শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিল। সাথে নিয়ে গিয়েছিল হাশমতকে।
ফজল কাছারি ঘরে বসে থাকে। হাশমত চলে যায় অন্দরে।
আরশেদ মোল্লাকে সালাম দিয়ে সে বলে, ফুফাজির সাংঘাতিক অসুখ, যখন-তখন অবস্থা। মাতব্বরের অসুখের কথাটা একটু বাড়িয়ে বলবার জন্য শিখিয়ে দিয়েছিল ফজল।
আরশেদ মোল্লা শুধু হু’ বলে চেয়ে থাকে হাশমতের দিকে।
ফুফাজি অস্থির অইয়া গেছে ভাবিসাবেরে দেহনের লেইগ্যা।
হুঁ।
বউমা-বউমা কইর্যা খালি কান্দে।
পরের মাইয়া দেহনের এত আহেঙ্কাত ক্যান্? নিজের বউ-মাইয়া-পোলা দেইখ্যা পরান জুড়াইতে পারে না?
কী যেন কন তালুইজি। নিজের মাইয়াত বিয়া দিলে চইল্যা যায় পরের বাড়ি। পুতের বউ থাকে নিজের বাড়ি, নিজের মাইয়ার মতন।
হ-হ দেছি, মাইয়ার মতন কইও না মিয়া, কও বান্দির মতন।
তালুইজি, ভাবিরে এহনই লইয়া যাইতে কইছে। আপনেরেও যাইতে কইছে। ফুফাজির অবস্থা খুব খারাপ। এইবার যে বাইচ্যা ওড়, মনে অয় না।
আরশেদ মোল্লা কোনো কথা বলে না।
কি কইলেন তালুইজি?
