কোলশরিকদের কেউ আপত্তি করে না।
মজিদ খালাসি হারিকেন নিয়ে আগে আগে চলে। তার পেছনে হাঁটে জঙ্গুরুল্লা ও তার দুই ছেলে। কোলশরিক ও তাদের জোয়ান ছেলেরা তাদের অনুসরণ করে দল বেঁধে।
এতই রঙ্গেরই খেলা জান হায়রে মন,
এতই রঙ্গেরই খেলা জান।
দোতারা বাজিয়ে গান গাইছে কেউ।
গান গাইছে কেডা ও? জঙ্গুরুল্লা জিজ্ঞেস করে।
কোনো ব্যাপারি নায়ের মাঝি না অয় মাল্লা অইব মনে অয়। মজিদ খালাসি বলে।
হ, অনেক পরদেশী নাও এই ঘোঁজায় পাড়া গাইড়া জিরায় তামাম রাইত। দবির গোরাপি বলে।
বানাইয়া আদম নবী
বেহেশত করিলা রে খুবী,
গন্দম খাইতে মানা কেন রে,
গন্দম খাইতে মানা কেন?
খাওয়াইয়া গন্দম দানা
ছাড়াইলা বেহেশতখানা ॥
কি কৌশলে সংসারেতে আন
হায়রে মন।
এতই রঙ্গেরই খেলা জান ॥
মকরমরে কও দাগা কর,
আদমরে কও হুঁশিয়ার,
শত্রু তোমার জানিও শয়তান রে,
শত্রু তোমার জানিও শয়তান।
দাগা কর, নাহি পড়,
কে বুঝিবে খেলা তোর ॥
এর ভেদ তুমি মাত্র জান
হায়রে মন।
এতই রঙ্গেরই খেলা জান॥
নমরুদ পাপীয়ে বল,
ইব্রাহিম অগ্নিতে ফেল
আগুনরে করহ বারণ রে,
আগুনরে করহ বারণ।
ইব্রাহিমকে দাও কোরবানি ॥
ছুরিরে নিষেধ করো পুনঃ
হায়রে মন।
এতই রঙ্গেরই খেলা জান ॥
কেহ পাপী, কেহ ভক্ত
কেহ ফকির, কেহ তখ্ত,
খেলা তোমার না যায় বুঝন রে,
খেলা তোমার না যায় বুঝন।
কি বুঝিবে বেঙ্গু ভ্রান্ত,
তোমার খেলার নাহি অন্ত ॥
তোমারে না বোঝে অজ্ঞ জন
হায়রে মন।
এতই রঙ্গেরই খেলা জান ॥
গানের কথা ও সুরে সবাই অভিভূত। বিমোহিত তাদের মন। যতক্ষণ গান চলছিল একটা কথাও কেউ বলেনি।
গান শেষ হলে দবির গোরাপি বলে, একটা মনের মতো গান হুনলাম।
হ গানডা খুব চমৎকার। অনেকেই বলাবলি করে।
সবাই পানসির কাছে এসে গিয়েছিল গান শেষ হওয়ার আগেই। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনছিল। ঐ সময়ে জঙ্গুরুল্লার চোখ জোছনার আলোয় জরিপ করছিল ঘোঁজাটা। অনেক কয়টা বড় মালের নৌকা পাড়া গেড়ে আছে ঘোঁজায়।
মজিদ, দেইখ্যা আস তো কয়ডা নৌকা আর নৌকায় কি মাল বোঝাই?
জঙ্গুরুল্লা ছেলেদের নিয়ে পানসিতে ওঠে। মজিদ খালাসি আর দবির গোরাপি চলে যায় নৌকার খোঁজ খবর নিতে।
কিছুক্ষণ পরে তারা ফিরে এসে জঙ্গুরুল্লাকে জানায়–নৌকার সংখ্যা বারো। তিনটা চালের নৌকা-খুলনা থেকে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জে। একটায় ঝুনা নারকেল বরিশালের নলসিটি থেকে ঢাকা যাচ্ছে। একটায় পেঁয়াজ যাচ্ছে কুষ্টিয়ার জগন্নাথপুর থেকে চাঁদপুর। একটায় আলু–যাচ্ছে কমলাঘাট থেকে ফরিদপুর। একটায় তেজপাতা যাচ্ছে কমলাঘাট থেকে রাজবাড়ি। একটায় খেজুর গুড়–মাদারীপুর থেকে যাচ্ছে ঢাকা। চারটা নৌকা খালি। সেগুলো বিভিন্ন বন্দরে যাচ্ছে মাল কেনার জন্য।
এই মজিদ, আমাগ জাগায় নাও রাখছে। খাজনা আদায় করো, তোলা উডাও। জঙ্গুরুল্লা নির্দেশ দেয়।
যদি না দিতে চায়।
দিতে না চাইলে পাড়া উড়াইয়া চইল্যা যাইতে কও এইখানতন।
মজিদ খালাসি ও দবির গোরাপি জঙ্গুরুল্লার নির্দেশ মতো তোলা উঠিয়ে চলে আসে কিছুক্ষণ পর। তিনটা নৌকা থেকে পাওয়া গেছে সের পাঁচেক চাল। অন্যগুলো থেকে পাওয়া গেছে একজোড়া নারকেল, সের দুই পেঁয়াজ, সের খানেক আলু, পোয়াটাক তেজপাতা আর মুছি খেজুরগুড় আটখান। সবগুলো এনে তারা পানসিতে তুলে দেয়। জঙ্গুরুল্লা খুশি হয়।
রাইত অনেক অইছে। আর দেরি করণ যায় না। জঙ্গুরুল্লা বলে। তারপর সে হাঁক দেয়, এই কেরা, এই ফেকু নাও ছাইড়া দে তুরারি।
পাড়া উঠিয়ে পানসি ছেড়ে দেয় কেরামত।
খাস খোপে হারিকেন জ্বলছে। হরমুজ ও জহিরকে বলে জঙ্গুরুল্লা, নাও জিরানের এমুন সোন্দর একখান ঘোঁজা আশেপাশের কোনো চরে নাই।
হ, ঠিকই। নাও রাখনের লেইগ্যা জায়গা খুবই চমৎকার। হরমুজ বলে।
আইতে আছে চৈত্র-বৈশাখ মাস। আসমানে তুফাইন্যা মেঘ দ্যাখলে বহুত নাও আইয়া পাড়া গাড়ব এই ঘোঁজায়।
হ, তহন অনেক নাও ঢুকব এই ঘোঁজায়। বলে হুরমুজ।
শোন, আমার মস্তকে একখান বুদ্ধি খেলছে। এই ঘোঁজায় নাও রাখলেই খুঁটগাড়ি আদায় করন লাগব। তাতে আমাগ অনেক পয়সা আয় অইব।
খুঁটগাড়ি আদায় করলে যদি এইখানে নাও না রাখে। বলে জহির।
রাখব না ক্যান্? নাও যাতে অন্য জা’গায় না রাখে তার একটা ফিকিরও আমার মগজের মইদ্যে ঘুরতে আছে। তোরা রউজ্যারে খবর দিস। সে যে কালই আমার লগে দ্যাখা করে।
ভাটি পানি। তবুও দূরের পথ বলে বাড়ির ঘাটে পৌঁছতে পানসিটার অনেক সময় লাগে।
.
১৪.
এরফান মাতব্বরের জ্বর সেরে গিয়েছিল। লাঠি ভর দিয়ে সে হাঁটাচলাও করছিল একটু আধটু। কিন্তু চর বেদখল হওয়ার কথা শুনেই সে আবার নেতিয়ে পড়েছে বিছানায়।
চর গেছে, চরের ফসল গেছে। খাজনা আর সেলামির এতগুলো টাকাও গেছে বরবাদ হয়ে। তাদের তৈরি ভাওর ঘরে তালেবর হয়ে বসে গেছে জঞ্জুরুল্লার দল। হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, কাঁথা-বালিশ, লড়াইর হাতিয়ার–অনেক কিছুই মুফতে পেয়ে গেছে তারা। এসবের ওপরে গেছে মান-ইজ্জত। এর জন্যই বেশি মুসড়ে পড়েছে এরফান মাতব্বর।
সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে গালাগাল দেয় দলের লোকদের, হারামজাদারা, চর ছাইড়া পলালি ক্যান্ তোরা? ডাকাতি মামলায় আর কয়জনরে ধরত?
