কারা? কি ব্যাপারে আইছে?
চিনি না। কি ব্যাপারে কিছু কয় নাই।
জঙ্গুরুল্লা খাস খোপ থেকে বেরিয়ে গলুইয়ের ওপর দাঁড়ায়।
আসলামালেকুম। একসাথে সালাম দেয় চারজন।
ওয়ালাইকুম সালাম। তোমরাই দ্যাখা করতে আইছ?
হ হুজুর। দলের মুরব্বি তোবারক বলে।
কও, ত্বরাত্বরি কও। আমার অত সময় নাই।
হুজুর, আমাগ ধানকুনিয়ার চর রসাতল অইয়া গেছে। আমাগ আর কিছু নাই।
আমি কি করতে পারি, কও?
আমাগ কিছু জমি দ্যান। আমাগ বাঁচনের একটা রাস্তা কইর্যা দ্যান।
দুনিয়াশুদ্ধ মানুষের বাঁচনের রাস্তা কি আমার বানাইতে অইব?
হুজুর আমাগ বাঁচনের আর কোন পথ নাই। আমরা গেছিলাম কালামাডি।
কালামাটি মানে টাটানগর?
হ, টাটানগর, বানপুর।
সেইখানে তো শুনছি বহুত মানুষ কামে ভর্তি করতেছে। লড়াইর সরঞ্জাম বানাইতে আছে।
হ, ভর্তি করতে আছে। হেই খবর পাইয়া গেছিলাম। কিন্তু সরদারগ, দালালগ দুইশ রুপিয়া না দিলে কোনো কামে ভর্তি অওয়ন যায় না।
দিয়া দিতা দুইশ রুপিয়া।
হুজুর দুইশ ট্যাহা কি গাছের গোড়া? আমরা গরিব মানুষ। পাইমু কই এত ট্যাহা?
টাকা ছাড়া দুইন্যাই ফাঁকা। বোক্লা? তোমরা ওইখানে টাকা দিতে পার নাই, আমার সেলামির টাকা দিবা কইতন?
আস্তে আস্তে শোধ কইরা দিমু।
দুও ব্যাটারা। নগদ সেলামি দিয়া মাইনষে জমি পায় না। আর তোরা আইছস বাকিতে জমি নিতে। যা-যা অন্য কিছু কইর্যা খা গিয়া।
হুজুর। তোবারকের কথার স্বরে আকুল আবেদন।
আর প্যাচাল পাড়িস না তো। কইলামতো অন্য কিছু কইর্যা খা গিয়া।
মজিদ খালাসি ও দবির গোরাপি এসে খবর দেয়, রান্না হয়ে গেছে। তাদের আসার পর লোক চারজন আর কিছু বলার সুযোগ পায় না।
জঙ্গুরুল্লা একটুও দেরি না করে একেবারে খাবার জায়গায় গিয়ে বসে। খাবার জায়গা বাইরেই করা হয়েছে।
খাদিমদারির জন্য কয়েকজন বাদে সবাই যার যার থালা নিয়ে গামছা বিছিয়ে বসে।
খেতে খেতে আছরের নামাজও কাজা হয়ে যায়। সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করে জঙ্গুরুল্লা। সে বলে, মাগরেবের নামাজের পর বৈঠক শুরু অইব।
এরফান মাতব্বরের তৈরি ভাওরবাড়ির এক ঘরে হারিকেনের আলোয় বৈঠক বসে। বিশিষ্ট কয়েকজন কোলশরিক নিয়ে জঙ্গুরুল্লা দুই ছেলেসহ সেখানে বসে। বাকি সবাই মাথায় গামছা বেঁধে গায়ে চাদর জড়িয়ে উন্মুখ হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
হরমুজ, চরটার মাপজোখ নিছস?
হ, পুবে পশ্চিমে সাড়ে ছয়চল্লিশ চেইন, উত্তর দক্ষিণে উনিশ চেইন।
ওরা তো আটহাতি নল দিয়া মাইপ্যা ভাগ করছিল। কত নল অয় হিসাব করছস?
হ করছি। দবির গোরাপি বলে। ওরা পুবে পশ্চিমে মাঝ বরাবর দুই ভাগ করছিল চরডারে। উত্তর দিগে ঘোঁজা বাদ দিয়া দুইশ ছয়চল্লিশ নল আর দক্ষিণ দিগে দুইশ আটান্ন নল।
মোট কত আয়?
পাঁচ শ’ চার নল।
আমাগ কোলশরিক অইল সাতষট্টি। সব্বাইকে ছয় নল কইর্যা দিলে, কত নল লাগে? কাগজ কলম লও, ও মজিদ।
মজিদ খালাসি অঙ্ক কষে বলে, চারশ দুই নল।
ঠিক আছে, এম্বায়ই ভাগ করো। একশ দুই নলের হিসাব পরে অইব।
পানসি মাল্লা ফেকু তামাক সাজিয়ে লম্বা নলটা এগিয়ে দেয় জঙ্গুরুল্লার দিকে। সকলের সামনে নিজের বাহাদুরি প্রকাশের স্পৃহা সে দমন করতে পারে না। বলে, এই মিয়ারা, বাইরে। কারা আছ? মন লাগাইয়া শোন। এরফান মাতবরের দলরে কেমুন চক্করটা দিলাম। কেমনে। ছাপ্পরছাড়া কইরা দিলাম, হুহুহু। ওরা চাকইর্যা রাখছিল। আমি মনে মনে ঠিক করলাম, রাখুক ওরা চাকইর্যা। দেখি, ওগ বেতন দিয়া, খাওন দিয়া এরফান মাতবরের মিরদিনা কয়দিন সোজা থাকে। ওগ টাকা পয়সার যখন ছেরাদ্দ অইয়া গেছে, সুতা যখন খতম, তখনি দিলাম একখান গোত্তা। ব্যস, বৌকাট্টা–আ—আ–।
সবাই হেসে ওঠে। দবির গোরাপি বলে, হুজুর কি ছোডকালে ঘুড়ি উড়াইছেন নি?
আরে, ছোডকালে ঘুড়ডি আবার কে না উড়ায়! শোন, তোমাগ পরামিশ মতন যদি তখন তখনি চর দখল করতে যাইতাম, তয় কি অইত? খুনাখুনি অইত, মামলা-মকদ্দমা অইত। কিন্তু এমন খেইল দ্যাখাইলাম, আমার আক্কেলের ঠেলায় ওগ আক্কেল গুড়ুম।
আবার খিকখিক করে হেসে ওঠে সবাই। মজিদ খালাসি বলে, হু, আপনে যেই খেইল দ্যাহাইছেন, ওগ বেবাক গেছে–ট্যাহা-পয়সা, হাতিয়ার-সরঞ্জাম। আমাগও আর খুনাখুনি মামলা-মকদ্দমার ঝামেলায় পড়তে অইল না।
ওগ টাকা পয়সা বেবাক খতম। ওরা আর আইব ক্যামনে চর দখল করতে?
হ, ওরা আর আইতে পারব না। দবির গোরাপি বলে।
আর দ্যাখো, তোমায় বুদ্ধি মতন যদি তখনি চর দখলের হামতাম করতাম, তয় এমনু তৈয়ার ধান পাইতা কই? কি মজা আঁ? ধান বোনে হাইল্যা, পেট ভরে বাইল্যা।
সবাই হি-হি, হো-হো করে হেসে উঠে।
এই বাইল্যার গুষ্টি, হাসনের কি অইল? তৈয়ার ধান তো পাইতেছ। আমারে সেলামি কত কইরা দিবা?
আপনেই ঠিক করেন। মজিদ খালাসি বলে।
নল পিছু পঞ্চাশ টাকা কইর্যা দিও।
পঞ্চাশ ট্যাহা খুব বেশি অইয়া যাইতেছে। এরফান মাতবর নিছিল পঁচিশ ট্যাহা কইর্যা। একজন কোলশরিক বলে।
আরে! এরফান মাতবরের লগে আমার তুলনা, আঁ! ঐ পঁচিশ টাকার জমি আছে? ঐ জমিতো গরবাদ! চাউলে পাতিলে তল! আমি পঞ্চাশ টাকা সেলামি নিয়া জমি দিমু। কারো বাপের সাধ্য নাই এই জমির কাছে আসে।
সবার অনুরোধে শেষে নল পিছু চল্লিশ টাকা সেলামি নিতে রাজি হয় জঙ্গুরুল্লা।
বৈঠক শেষ করে উঠবার সময় জঙ্গুরুল্লা বলে, আমার ফন্দি-ফিকিরে তৈয়ার ধান পাওয়া গেছে। এই ধানের অর্ধেক আমার, মনে রাইখ্য মিয়ারা।
