থাকবে।
লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবি।
লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে তো থাকি।
বকুল মুনাকে ট্রেনে তুলে দেবার জনো স্টেশনে গেল না। কাউকে চলে যেতে দেখতে তার খুব খারাপ লাগে। এমন কি মুনা যখন বাড়ি থেকে বেরুচ্ছে তখনও সে সামনে পড়ল না। একা একা পুকুর পাড়ে বসে রইল।
রাতে খুব সহজ ভঙ্গিতে জহিরের সঙ্গে ঘুমুতে এল। খাটে এসে বসল। মুখ ভর্তি পান। জহির মামলার দলিলপত্র দেখছিল। সে ফাইল বেঁধে ফেলল। কাল একটা হিয়ারিং আছে কিন্তু এখন আর সেইসব নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছা করছে না। সে সহজ গলায় বলল, একটা পান খাওয়াও তো বকুল, জর্দা দিও না।
বকুল পান সাজাতে বসল।
আপা চলে যাওয়াতে খুব মন খারাপ?
হুঁ।
আরো কিছু দিন রেখে দিতে পারলে ভাল হত। অফিস আছে আমি আর জোর করলাম না। তাছাড়া এখানে তার ভালও লাগছিল না। বড় শহরে বেশিদিন থাকলে এ রকম হয়। অন্য কোথাও থাকলে ভাল লাগে না। এটাকে বলে কনডিশনিং।
বকুল হাই তুলল। জহির বলল, ঘুম পাচ্ছে নাকি?
হুঁ পাচ্ছে।
খুবই ভাল কথা। শুয়ে ঘুমিয়ে পড়। তার আগে একটা কাজ কর, ওষুধ খেয়ে নাও।
কি ওষুধ?
মাইন্ড একটা ঘুমের ওষুধ।
বকুল বিনাবাক্যে ওষুধ খেয়ে গুটিগুটি মেরে শুয়ে পড়ল। জহির বলল, মা এলে তোমাকে ঢাকায় নিয়ে যাব। দু’জন বেশ কিছু দিন কাটিয়ে আসব। আমি নিজেও হাঁপিয়ে উঠেছি। মামলামোকদ্দমা, জমিজমা এসব আর ভাল লাগে না। কুৎসিত ব্যাপার। বকুল জবাব দিল না।
ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?
বকুল সাড়া দিল না। জহির অবাক হয়ে লক্ষ্য করল বকুল সত্যি সত্যি ঘুমুচ্ছে। বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলছে। ঠোঁট কপছে। গাঢ় ঘুমের লক্ষণ। জহির বাতি নিভিয়ে কাগজপত্র নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। কাগজগুলি ভাল রকম দেখে রাখা উচিত। দাগ নম্বরে কি সব ওলট-পালট নাকি আছে . কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। অনুকুল মুহুরিকে আসতে বলেছিল–সে আসেনি। লোক পাঠিয়ে আরেকবার ডাকবে না। সে নিজেই যাবে? রাত খুব হয়নি। দশটা পয়ত্রিশ। যাওয়াই উচিত–দাগ নম্বর পোর্চা ফোর্চ কিছুই মাথায় ঢুকছে না। বকুল ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। এটাও একটা শুভ লক্ষণ।
জহির বাড়ি ছেড়ে বেরুবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বকুল উঠে বসল। ঘর অন্ধকার। বারান্দায় চল্লিশ পাওয়ারের একটা বাতি জ্বলছে তার খানিকটা আলো পর্দার ফাঁকে ঘরে এসেছে। দরজা ভেজানো। খুট করে দরজার ওপাশে শব্দ হল। বকুল অবাক হল। বকুল ভয়-পাওয়া গলায় বলল–এ কে?
কেউ উত্তর দিল না। কিন্তু মনে হচ্ছে কে যেন খুব সাবধানে দরজা খোলার চেষ্টা করছে। ক্যাঁচক্যাঁচ করে একটু শব্দ হচ্ছে আবার থেমে যাচ্ছে। বকুল বলল কে? কে? দরজার ওপাশ থেকে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ হল। সিগারেটের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বাবা ঘরে ঢুকলে ভক করে খানিকটা সিগারেটের গন্ধ নাকে লাগে। অবিকল সে রকম। নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ বকুলের চেনা। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল–কে? কে ওখানে?
খুব নিচু স্বরে জবাব এল। প্রায় অস্পষ্ট কিন্তু বকুলের শুনতে কোন ভুল হল না।
কেমন আছিস রে মা?
ভাল আছি বাবা।
তুই এমন রোগা হয়ে গেছিস কেন?
আমার ঘুম হয় না। জেগে থাকি।
সেটাই তো ভাল। ঘুমুলেই সর্বনাশ হবে রে মা। গলা চেপে ধরবে। বলেছিলাম না? তার পরেও ঘুমিয়ে পড়লি? তুই এত বোকা কেন?
তুমি চলে যাও বাবা আমার ভয় লাগছে।
আমাকে ভয় কিসের রে বোকা মেয়ে। যাকে ভয় পাওয়ার তাকে ভয় পাবি।
দরজায় আবার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হচ্ছে। দরজা খুলেও যাচ্ছে। ঐ তো দেখা যাচ্ছে পর্দার ওপাশে চাদর গায়ে রোগা একজন মানুষ। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হাত রেখেছে পর্দায়। যেন এক্ষুণি পর্দা ঠেলে সে ভেতরে ঢুকবে। বকুল কাতর গলায় বলল, আমার বড় ভয় লাগছে বাবা। তোমার পায়ে পড়ি ভেতরে এস না। বড় ভয় লাগছে।
জহির রাত বারোটার দিকে ঘরে ফিরে দেখে বকুলের মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে। সে হাত-পা ছুড়ছে। পুরোপুরি হিস্টিরিয়ার লক্ষণ। ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে তাকে ঘুম পাড়াতে হল।
সারারাত তার পাশে জহির এবং বাবু বসে রইল। জহির কয়েকবারই বলল, তুমি ঘুমিয়ে পড় বাবু। আমি তো জেগেই আছি।
বাবু নড়ল না। সে খুব ভয় পেয়েছে। মাঝে মাঝে অল্প অল্প কাঁদছে। জহির বলল, বকুলকে কিছু দিনের জন্যে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়াই ভাল। কি বল বাবু?
বাবু তারও জবাব দিল না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে।
বাকের নেত্রকোনা স্টেশনে নেমেছে
বাকের নেত্রকোনা স্টেশনে নেমেছে ভোর আটটায়। তার সঙ্গে একটা হ্যান্ডব্যাগ। হাতে চিত্ৰালী পত্রিকা। ময়মনসিংহ রেলওয়ে বুক স্টলে মাসুদ রানা একুশ নম্বর কিনে ছিল। পাড়াও হয়েছে চল্লিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। নামার সময় বইটা ভুলে ফেলে আসায় তার মেজাজ খুবই খারাপ। একা দারুণ ইন্টারেস্টিং জায়গায় এসে বইটা হারিয়ে গেল। মাসুদ রানা একজন সুন্দরী স্প্যানিশ তরুণীর ঘরে ঢুকেছে। সেই তরুণীর কাপড়-চোপড় ঠিকঠাক নেই। মাখনের মত শরীরের প্রায় সবটাই দেখা যাচ্ছে। তরুণী মাসুদ রানাকে দেখে হেসে বলল তারপর রানা আবার দেখা হল? বলতে বলতে এক ঝটিকায় বের করেছে। লু্যাগার ফিফটি নাইন পিস্তল। মাসুদ রানা নির্বিকার। সিগারেট ধরাতে ধরাতে সে বলল–এমন সুন্দর হাতে অস্ত্র মানায় না। ওটা ফেলে দাও। তরুণী তীব্র স্বরে বলল, নিশ্চয়ই ফেলব। কিন্তু তার আগে তপ্ত দু’টি সিসের টুকরো তোমার মগজে ঢুকিয়ে দেব।
