এখন নিয়ে আসি?
না এখন আনতে হবে না তোর ঘুম না হওয়ার গল্পটা শুনি।
বকুল ফিসফিস করে বলতে লাগল, মাস তিনেক আগের কথা। আপা সন্ধ্যাবেলা ঘুমিয়ে পড়েছি–দোতলায় একেবারে পশ্চিমে একটা ঘর আছে ঐ ঘরে। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। শুনি কি দরজায় টুকটুক করে কে যেন টোকা দিচ্ছে। আমি খুবই অবাক। দরজা হাট করে খোলা, টোকা দেবে কে? আমি বললাম।–কে ওখানে?
কেউ কোন শব্দ করল না। তখন শীতের সময়। সূর্য ডুবতেই সব অন্ধকার হয়ে যায়। খুব কুয়াশাও পড়ে। ঘরটা একদম অন্ধকার আবার মনে হচ্ছে ঘরের ভেতরেও কেমন যেন কুয়াশা। আমার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। আমি আবার বললাম, কে?
তখন খুব পরিষ্কার গলায় বাবা কথা বললেন বললেন, বকুল আমি। কেমন আছিস রে মানিক?
আমি ভয়ে থারথার করে কাপছি, একটা কথাও বলতে পারছি না। বাবা তখন বললেন তোকে সাবধান করে দিতে এসেছি রে মা–জহির ছেলেটা তোকে গলা টিপে মেরে ফেলবে। খুব সাবধানে থাকিস। খুব সাবধানে রে মা। খুব সাবধান মা।
তারপর?
তারপরের কথা আমার কিছু মনে নেই আপা। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান হলে দেখি সবাই ভিড় করে আছে। আমার শাশুড়ি আমার মাথায় পানি ঢালছেন।
ব্যাপারটা তাদের বলেছিলি?
না। কিছু বলিনি। শুধু ওকে বলেছি। রাতে ঘুমুলে তুমি আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলবে এই জন্যে ঘুমাই না।
আর কিছু বলিসনি তো?
না।
খুব ভাল করেছিস। এই ঘরে আমার সঙ্গে শুয়েছিস এখন তোর আর ভয় নেই। এখন ঘুমো।
না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমার অভ্যেস হয়ে গেছে তুমি ঘুমাও।
বলতে বলতে বকুল গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। জেগে রইল মুনা। সারারাত এক পলকেব জন্যেও ঘুম এল না। বিশাল ঘরের বিশাল পালঙ্কের শুয়ে তার গা ছমছম করতে লাগল।
মুনা দু’দিন থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল, থাকল সাত দিন। বকুলের শাশুড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে গিয়েই দেরি। কথা ছিল, উনি আটপাড়া থেকে ফিরলে মুনা ঢাকায় রওনা হবে। উনি ফিরলেন না।
এই সাত দিনে বকুল পুরোপুরি স্বাভাবিক। রাতে ঘুমুতে আসে মুনার সঙ্গে। খানিক্ষণ গল্প করেই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়। মুনা বলল, তোর অসুখ আমাকে ধরেছে। তুই ঘুমুচ্ছিস আর আমি জেগে আছি। বিশ্ৰী অবস্থা।
বকুলের শরীর একটু ভাল হয়েছে। সব সময় দিশেহারার যে ভাব তার চোখে-মুখে লেগে থাকত তা নেই। জহিরের ধারণা এটা একটা মানসিক ব্যাপার। মুনা চলে গেলেই বকুল আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। এই সন্দেহ মুনার কাছেও অমূলক মনে হয় না। ঢাকায় রওনা হবার আগের দিন মুনা জহিরকে বলল, ওকে আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাই জহির? আমার সঙ্গে কিছু দিন থাকুক। আমি ভাল ভাল ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলব। তুমি নিজেও চল।
জহির গম্ভীর হয়ে বলল, বাড়িঘর ছেড়ে আমার পক্ষে যাওয়া তো সম্ভব না আপা। মা নেই এত বড় বাড়ি। নেত্রকোনা কোর্টে জমিজমা নিয়ে বেশ কয়েকটা মামলা চলছে। দু’দিন পর পর হিয়ারিং হয়।
বেশ তো তুমি কিছু দিন কষ্ট করে থাক। আমি বকুলকে নিয়ে যাই। আমার মনে হয় এত বড় বাড়িতে একা একা থেকে তার এ ঝামেলাটা হয়েছে।
আপনার কাছে গেলেও তো সেই একা একাই থাকবে। আপনি যাবেন চাকরিতে, বাবু স্কুলে।
আমি মাস খানিকের ছুটি নিয়ে নেব। আমার ছুটি পাওনা আছে।
বকুল কি যেতে চাচ্ছে আপনার সঙ্গে?
না সে কিছু বলেনি–আমিই বলছি।
মা ফিরে আসুক। তারপর মার সঙ্গে কথা বলে দেখি। তবে মা রাজি হবেন না।
রাজি হবেন না কেন?
আপনি একা থাকেন। পুরুষ কেউ নেই–একটা কোন ঝামেলা যদি হয়?
মুনা আর কিছু বলেনি। বাবুকে রেখে ঢাকায় রওনা হয়েছে। সে ভেবেছিল বিদায়ের সময় বকুল খুব হৈচৈ করবে। তেমন কিছু হল না। বকুল শুকনো মুখে মুনার সুটকেস গুছিয়ে দিল। টিফিন বক্সে খাবার, পানির বোতল। মুনা বলল, যাবার আগে তোকে কয়েকটি কথা বলে যাই বকুল, খুব মন দিয়ে শোন।
বকুল ক্লান্ত গলায় বলল, তোমাকে কিছু বলতে হবে না আপা। তুমি আমার কথা ভেবে মন খারাপ করো না। আমার যা হবার হবে।
তোর কিছুই হবে না। ভাল থাকবি, সুখে থাকবি।
সুখেই তো আছি। খারাপ আছি নাকি? এত বড় বাড়িতে রানীর মত থাকি। এদের লাখ লাখ টাকা আপা। আমার শাশুড়ির গয়না যা আছে দেখলে তোমার মাথা ঘুরে যাবে। শাশুড়ি থাকলে তোমাকে দেখিয়ে দিতাম। সিন্দুকের চাবি তার কাছে। কাজেই দেখতে পেলে না।
গয়না দেখার সখ নেই। বকুল আমি কি বলছি মন দিয়ে শোন। বোস আমার পাশে।
বকুল বসল। মুনা তার পিঠে হাত রাখল। শান্ত স্বরে বলল, তুই যা দেখেছিলি তা স্বপ্ন ছাড়া কিছুই না। আমরা স্বপ্ন দেখি না? দেখি। ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখি। সেটা ছিল একটা দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নটা তোর কাছে সত্যি বলে মনে হয়েছে।
বকুল কিছু বলল না। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। মুনা মৃদু গলায় বলল, একটা স্বপ্নকে কেউ যদি দিনের পর দিন সত্যি ভাবে তাহলে সেটা তার কাছে সত্যি হয়ে যায়। তোর বেলা তাই হয়েছে। বুঝতে পারছিস?
পারছি আপা।
জহির ভাল ছেলে। বুদ্ধিমান ছেলে … তোর সমস্যা সে বুঝবে। যে সমস্যাটা তোর হয়েছে তুই একা তার সমাধান করতে পারছিস না। কাজেই জহিরের সাহায্যে তোকে নিতে হবে। দু’জন মিলে সমস্যার সমাধান করবি।
আচ্ছা করব।
মনে থাকবে তো?
থাকবে।
তোর শাশুড়ি এলে তাকে বলে ঢাকায় চলে আসবি। কিছু দিন থাকবি আমার কাছে।
উনি রাজি হবেন না।
রাজি হবেন। আমি তাকে গুছিয়ে একটা চিঠি লিখেছি। চিঠিটা তোর কাছে দিয়ে যাব তুই তোর শাশুড়িকে দিবি। মনে থাকবে।
