কোন অসুবিধা হয়নি।
খাওয়া-দাওয়া করছেন। আপা?
সব কিছু চমৎকার হয়েছে।
একা এসেছেন?
না। বাবুকে নিয়ে এসেছি। ও ঘুমিয়ে পড়েছে।
বকুলকে দেখে মুনা বড় ধরনের একটা ধাক্কা খেল।
কি রোগা হয়েছে। কি অসম্ভব রোগা! চোখ দু’টি বিশাল বড় লাগছে। কেমন অন্য রকম ভাবে জ্বলজ্বল করছে। মুনা তার মাথায় হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল, কি হয়েছে তোর?
কি আবার হবে? কিছু হয়নি রোগা হয়েছি। কোন অসুখ-বিসুখ নেই। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে দেখ।
এত রোগাই বা হলি কেন?
ঘুম হয় না যে এই জন্যে রোগা হয়ে যাচ্ছি। ও মাগো বাবুকত লম্বা হয়েছে। ও এত লম্বা হচ্ছে কেন আপা? কিছু দিন পর তো তালগাছ হয়ে যাবে।
বলতে বলতে বকুল হাসতে শুরু করল। প্রথমে মৃদু স্বরে তারপর বেশ শব্দ করেই হাসতে লাগল। অচল মেঝেতে পড়ে গেল। জহির বিরক্ত মুখে তাকাচ্ছিল। সে গম্ভীর গলায় বলল, হাসি৷ বন্ধ করা তো বকুল। আপা কোথায় ঘুমাবেন কিছু-একটা ব্যবস্থা কর। শুধু শুধু হাসলে তো হবে না।
ওমা–তাই তো।
বকুল প্রায় ছুটে ভেতরে চলে গেল পরমুহূর্তেই বেরিয়ে এসে বলল, বাবু, হেসেছি বলে রাগ করিাসনি তো? বলেই দেরি করল না। আবার ভেতরে চলে গেল। বাবু অবাক হয়ে তাকাল মুনার দিকে। মুনা বলল, জহির ওর কি হয়েছে?
কিছু হয়নি আপ ঢং করছে।
ঢং করছে মানে?
নানান রকমের যন্ত্রণা। আপা–এসেছেন যখন সবই শুনবেন।
ডাক্তার দেখাচ্ছ?
ডাক্তার দেখাব কি? আমি নিজেও তো একজন ডাক্তার। নাকি আপনারা তা মনে করেন না?
মুনা আর কিছু বলল না। বিস্মিত চোখে জহিরের কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জহির অস্বস্তির সঙ্গে বলল, আপা কিছু মনে করবেন না উল্টাপাল্টা কি সব বলছি। আসলে আমার নিজের মাথার ঠিক নেই। বলব আপনাকে সব। আজ রাতেই বলব। শুনলে আপনি নিজেই বুঝবেন।
জহির যা বলল তা শুনে মুনা হতভম্ব হয়ে গেল। কাঁপা গলায় বলল, এসব তুমি কি বলছ?
সত্যি বলছি আপা। একটা কথাও মিথ্যা না। বকুল সারারাত ইচ্ছা করে জেগে থাকে ওর ধারণা ঘুমুলেই আমি ওর গলা টিপে দিম বন্ধ করে মেরে ফেলব।
ক’দিন ধরে এ রকম হচ্ছে?
তিন মাসের বেশি।
আগে জানাওনি কেন?
ইচ্ছা করেনি আপা। তাছাড়া…
তাছাড়া কি?
আমার ধারণা পুরো ব্যাপারটা তার সাজানো। আমাকে যন্ত্রণা দেবার একটা চেষ্টা।
তোমাকেই বা শুধু শুধু যন্ত্রণা দিতে চাচ্ছে কেন?
জানি না আপা। আপনি এসেছেন এখন দেখুন কিছু করতে পারেন। কি না।
ও আজ রাতে আমার সঙ্গে ঘুমুক–কি বল জহির?
নিশ্চয়ই আপা, আপনার বলার দরকার ছিল না। আমি নিজেই পাঠাতাম।
মুনার শোবার জায়গা করা হয়েছে দোতলার সবচে দক্ষিণের ঘরে। বিশাল ঘর। তিনটি বড় বড় জানালায় খুব হাওয়া খেলে। ঘরের ঠিক মাঝখানে বিশাল পালঙ্ক। উঠতে কষ্ট হয় এমন উঁচু। মুনা হাসতে হাসতে বলল, গড়িয়ে পড়লে তো মাথা ফেটে যাবে রে বকুল।
বকুল এই কথাও মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে খুব হাসতে লাগল। কোনমতে হাসি থামিয়ে বলল, তুমি যা হাসাতে পার। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করছে আপা।
মুনা প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল, বাবু কোথায় শুয়েছে?
ওরা দুলাভাইয়ের সঙ্গে। আরো ঘর ছিল— একা ঘুমুলে ভয় পায় যদি, সেজন্যে ও বলল ওর সঙ্গে ঘুমুতে।
তোর শাশুড়ি–উনি কোথায়?
আটপাড়া বলে একটা জায়গা আছে সেখানে গেছেন। ভাটি অঞ্চল। ভাটি অঞ্চলে উনাদের অনেক জমি আছে, দেখাশুনা করতে গেছেন।
উনাদের জমি বলছিস কেন? বল আমাদের জমি।
বকুল হাই তুলে বলল–ঐ একই হল।
ঘুম পাচ্ছে নাকি রে?
না। রাতে ঘুম হয় না তো। পান খাবে আপা? আমার শাশুড়ির কাছ থেকে আমি পান খাওয়া শিখেছি। আমার শাশুড়ির একটা পানের বাটা আছে তাতে আঠার রকমের মশলা রাখার জায়গা আছে।
খুব পান বিলাসী মনে হচ্ছে।
হুঁ খুব পান বিলাসী–জয়পুরী মশলা ছাড়া তিনি পান খেতে পারেন না।
জয়পুরী মশলাটা আবার কি?
দাঁড়াও নিয়ে আসছি। খেয়ে দেখ।
আনতে হবে না–আমি পান খাই না। আয় আমরা শুয়ে গল্প করি।
আমার পান খেতে ইচ্ছে করছে। যাব। আর আসব। মুখ ভর্তি পান নিয়ে বকুল ঢুকল। পানের রস উপচে পড়ছে। মুখ হাসি হাসি। হাতে পানের ডাটা।
নাও আপা খেয়ে দেখ। অল্প একটু জর্দা দিয়েছি। প্রথমবারের রস ফেলে দি ও তাহলে আর কিছু বুঝতে পারবে না।
বকুল পালঙ্কে উঠে এল। মুনা বলল, মশারি ফেলবি না?
মশা নেই। আপা মশারি লাগবে না।
একটু আগে একটা মশা আমার কানে কামড় দিয়েছে। এখনো জ্বলছে।
দু’একটা আছে। থাকুক না। ওদেরও তো খেয়ে বাঁচতে হবে। তাই না। আপা?
তা তো বটেই।
বকুল পানের বাটা নিয়ে বসেছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে পান সাজাচ্ছে। কথা বলছে নিজের মনে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টা হয় তুমি এসেছ, তাই না। আপা? অথচ আমার মনে হচ্ছে তুমি যেন এ বাড়িতেই থাক। তোমারও এ রকম মনে হচ্ছে না?
না। হচ্ছে না। অপরিচিত একটা ঘরে শুয়ে আছি বলেই তো মনে হচ্ছে তুই মাঝ রাতে পান সাজাচ্ছিস কার জন্যে?
নিজের জন্যে। আর কার জন্যে? তুমি তো একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়বে। আমাকে জেগে৷ থাকতে হবে।
জেগে থাকতে হবে কেন?
ও তোমাকে কিছু বলেনি?
বলেছে–তোর মুখ থেকে আরেকবার শুনতে চাই আয় আমার পাশে শুয়ে বল।
বকুল সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ল। মুনা বাতি নিভিয়ে দিল। বাইরে চাঁদ নেই। ঘরের ভেতর অসম্ভব অন্ধকার। বিবি ডাকছে। গ্রাম গ্রাম ভাব।
বকুল।
কি আপা? তোদের এই জায়গাটা এত অন্ধকার কেন? কাল থেকে ঘরে একটা হারিকেনটারিকেন কিছু রাখিস তো?
