মামুন বলল, আপনার শরীর কেমন?
বাবা আমি ভাল। তুমি বস।
আমি এখন যাই অন্য আরেক’দিন এসে আপনার খোঁজ নেব।
এই ভদ্রতাটুকু হাসিনার ভাল লাগল। আবার আসব বলেনি বলেছে আবার এসে আপনার খোঁজ নেব। ছেলেটা মন্দ হবে না। বিয়েশাদী অবশ্যি পুরোটাই ভাগা। কিছুই বলা যায় না।
হাসিনা আগ্রহ নিয়ে বললেন, বস একটু বাস। বলেই মনে হল এতটা আগ্রহ দেখানো কি ভাল? মোটেই ভাল না। বসতে চাইলে বসবে। বসতে না চাইলে বসবে না।
মামুন বসল না। সঙ্গে সঙ্গে বিদায় নিল। যাবার আগে আরেকবার পা ছুঁয়ে সালাম করলে হাসিনার ভাল লাগত। করল না। পুরানো দিনের মত আদব-কায়দা কি আর এখন আছে? নেই। ভাল ভাল জিনিস কিছুই থাকবে না।
মামুন ঘর থেকে বেরুবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝমোঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। মুষলধারে বৃষ্টি। জাহানারার কেন যেন বার বার মনে হচ্ছিল আধভেজা হয়ে মামুন এক্ষুণি ফিরে আসবে। লেডিস ছাতা একটা ঘরে আছে তা নিয়ে দেয়া যাবে। কিংবা থেকেও তো যেতে পারে। অসুবিধা কি?
মামুন অবশ্যি ফিরল না।
জহিরের চিঠি
মুনা জহিরের চিঠি পেয়ে নেত্রকোনায় চলে এসেছে। চিঠিতে সে ভেঙে কিছু বলেনি; অস্পষ্ট ভাবে কিছু কথাবার্তা লেখা যা পড়ে মুনা চমকে উঠেছে। সাতদিনের ছুটি নিয়ে রওনা হয়েছে। সঙ্গে আছে বাবু। বাবু কয়েকবার ভয়ে ভয়ে জানতে চেয়েছে চিঠিতে কি লেখা? মুনা বিরক্ত হয়ে বলছে কিছু লেখা নেই।
লেখা না থাকলে তুমি এত ব্যস্ত হয়ে রওনা হচ্ছে কেন?
লেখা নেই বলেই রওনা হচ্ছি। কি হল বুঝতে পারছি না। বেশির ভাগ মানুষই হল বোকা এরা গুছিয়ে একটা চিঠি পর্যন্ত লিখতে পারে না। হয়ত গিয়ে দেখব কিছুই না। জহিরের চিঠিটা ছিল এ রকম–
শ্রদ্ধেয়া আপা,
আমার সালাম জানবেন। আশা করি ভালই আছেন। কয়েক’দিন পূর্বে বাবুর এক পত্রে আপনাদের কুশল জানতে পেরে সুখী হয়েছি।
এখানকার খবর একমত। বকুলের ব্যাপারে কিঞ্চিৎ সমস্যা হয়েছে। আচ্ছা। আপা, বকুলের কি মানসিক অসুস্থতার কোন পূর্ব ইতিহাস আছে? আমি ডাক্তার হিসেবে জানতে চাচ্ছি। দয়া করে অন্য কোন ভাবে নেবেন না। মাঝে মাঝে সে অর্থহীন কথাবার্তা বলে। তেমন উদ্বিগ্ন হবার কিছু নাই। সাক্ষাতে সব বলব। ইতি।
তারা নেত্রকোনা পৌঁছল সন্ধ্যাবেলা। জহিরের বাড়ি শহরের একটু বাইরে। নেত্রকোনা কোর্ট রেল স্টেশনে নেমে রিকশায় আধঘণ্টার মত লাগে। বাড়ি দেখে মুনা মুগ্ধ। বিশাল বাড়ি। রাজ্যের গাছপালা বাড়িটা ঘিরে জঙ্গলের মত করে রেখেছে। পুরানো আমলের খিলান দেয়া বাড়ি। লোহার ভারী গেট। গেট থেকে বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত সুড়কি বিছানো পথ। জাফরি কাটা রেলিং-এ মাধবীলতার ঝাড়। মুনা মুগ্ধ গলায় বলল, চমৎকার। মারু মাথা ঝাকিয়ে বলল, চমৎকার কোথায় আপা এ তো ভুতুড়ে বাড়ি।
বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ানোর পর এটাকে সত্যি সত্যি ভুতুড়ে বাড়ি বলেই মনে হতে লাগল। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অথচ কোথাও বাতি জ্বলছে না। দুতিন জায়গা থেকে এক সঙ্গে তক্ষক ডাকছে।
কামলা ধরনের একজন কে বারান্দায় বসে দড়ি পাকাচ্ছিল। বাইরে মানুষজন দেখেও তার কোনো ভাবান্তর হল না। দড়ি পাকানোর মনোযোগ যেন আরো বেড়ে গেল।
মুন্না বলল, এই যে ভাই ভেতরে গিয়ে বলুন।–আমরা এসেছি।
লোকটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বাড়িতে কেউ নাই।
সেকি! কোথায় গেছে?
মিরামপুর খালার ছোড় মাইয়ার বিয়া।
আসবে কখন?
ঠিক নাই রাইতের টেরেনে আসত পারে আবার নাও আসতে পারে।
বাড়িতে আপনি ছাড়া কেউ নেই?
ময়নার মা আছে।
আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। আমি বকুলের বড় বোন। থাকব। এখানে। কিছু-একটা ব্যবস্থা করুন। এখন দড়ি পাকানোটা কিছুক্ষণের জন্যে বন্ধ রাখা যায় না? আপনি উঠে দাঁড়ান ও ময়নার মাকে খবর দিন।
লোকটি নিতান্ত অনিচ্ছায় দাঁড়াল। মুনা উঁচু গলায় বলল, কি রকম কাণ্ডকারখানা কিচ্ছ বুঝতে পারছি না, চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে বাতি জ্বলছে না কেন?
ইলেকট্রিক নেই। রাইত দশটার পরে ইলেকট্রিক আয়।
রাত দশটার পরে ইলেকট্রিসিটি দিয়ে হবে কি? হারিকেন জ্বালান। নাকি ঘরে হারিকেনও নেই?
আছে।
মুনা নিজেই ভেতরে ঢুকে ডাকল, ময়নার মা, ময়নার মা। বাবু মুনার কাণ্ড দেখে খুব মজা পাচ্ছে। আপা কত সহজেই না কর্তৃত্ব নিয়ে নিচ্ছে। যেন সে এই বাড়িরই একজন, অপরিচিত কেউ না।
ময়নার মা এসে দাঁড়ানমাত্র মুনা বলল, গোসলের পানি গরম দাও তো ময়নার মা। ঘরে চা পাতা আছে? ভাল করে চা বানাও। আমরা ঢাকার মেহমান।
বকুলরা গিয়েছিল। ঠাকরাকোনা; রাত বারোটার ট্রেনে বকুল এবং জহির এই দু’জন ফিরেছে। বকুল আগে আগে বাড়ি ঢুকল। বারান্দার কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। মুনা আপার মত কে যেন বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে আছে। প্রথম কিছুক্ষণ সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না। ভয় পাওয়া গলায় বলল, কে?
মুনা বলল, ভূত। কেমন আছিস রে বকুল?
আপা তুমি?
মুনা হাসল। বকুল বলল, আপা তুমি নাকি সত্যিই তুমি?
না মিথ্যা আমি।
বকুল শিশুদের মত গলায় চেঁচিয়ে উঠল। আপা এসেছে আপা এসেছে। মুনা আপা, মুনা আপা।
জহির বারান্দায় উঠে এসে দেখল বকুল তার আপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে এবং কিছুক্ষণ পর পর বলছে–আপা এসেছে, মুনা আপা এসেছে।
মুনা বলল, ছাড় তো–দম বন্ধ করে মারবি নাকি? জহির তুমি তোমার বউকে সামলাও।
জহির বিব্রত গলায় বলল, খুব নিশ্চয়ই অসুবিধা হয়েছে। খবর দিয়ে এলে হত না? স্টেশনে থাকতাম।
