উনি কিন্তু আপনার কথা আমাকে একবারও বলেননি।
আমার কথা কি বলবেন? আমার সম্পর্কে বলার তো কিছু নেই। আমি বরং উনার সম্পর্কে অনেক কিছু বলতে পারি।
বলুন শুনি।
মামুন হেসে ফেলল। মীরা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। অপরিচয়ের সংকোচ বলে কিছুই তার মধ্যে নেই। মামুনের মনে হল এই মেয়েটি তার বোনের কিছুই পায়নি। তার মধ্যে প্রবল। কেমন অবলীলায় পা নাচাচ্ছে। .
মীরা বলল, চুপ করে আছেন কেন? আপার কথা বলুন।
তোমার আপা একা একা শ্মশানে ঘুরত। খুব পছন্দ করত।
সে কি?
হ্যাঁ, গ্রামের লোকজনের ধারণা … তোমার আপার সঙ্গে জ্বীন আছে।
কি বলছেন এসব?
সত্যি কথাই বলছি। কেউ অদ্ভুত কিছু করলেই গ্রামের লোকজন মনে করে তার সঙ্গে জ্বীন আছে। অদ্ভুত কাণ্ডটা সে করছে না। জ্বীন তাকে দিয়ে করাচ্ছে।
আপনি কি কখনো জ্বীন দেখেছেন?
না। তবে জ্বীন নামানোর একটা আসরে ছিলাম।
ঐ গল্পটা বলুন।
অনেক লম্বা ব্যাপার–আরেক’দিন না হয় বলব।
আপনি আবার কবে আসবেন তার কি কোনো ঠিক আছে? আজই বলুন।
গল্প শুরু করা গেল না। জাহানারা শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে বসার ঘরে ঢুকাল। ক্লান্ত গলায় বলল, খাবার নিয়ে আয় মীরা। রান্না হয়ে গেছে।
একটু পরে আনি আপা? উনি একটা জ্বীনের গল্প মাত্র শুরু করেছেন।
জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, গল্প আরেক’দিন হবে। রাত হয়ে যাচ্ছে না? ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টি হলে উনি থেকে যাবেন। অসুবিধা কি? ভাইয়ার ঘর তো খালিই আছে।
অকারণে বকবক কারিস না তো।
মীরা উঠে গেল। মামুন বলল, আপনার বোনটিকে চমৎকার লাগল। একেবারে বালিকা স্বভাব। ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে, বিশ্বাস হয় না।
ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আপনাকে কে বলেছে? ও এইবার মাত্র ক্লাস টেনে উঠেছে। ওর কথাটাও বিশ্বাস করবেন না।
মামুন হেসে ফেলল। প্রথম বারেরমত জাহানারার মনে হল এই লোকটার হাসিটা তো বেশ সুন্দর। সহজ হাসি। সব মানুষ সরল ভঙ্গিতে হাসতে পারে না। মনের মধ্যে কুটিলতা তাদের হাসির মধ্যেও অদৃশ্য ভাবে ছায়া ফেলে।
মামুন বলল, আমি হুঁট করে আসায় আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?
না। রাগ করব কেন?
বিরক্ত যে হয়েছেন এটা বুঝতে পারছি। তবু যেতে ইচ্ছা করছে না।
জাহানারা কি বলবে ভেবে পেল না।
মীরা এসে বলল, ভাত দেয়া হয়েছে।
জাহানারার মা হাসিনা বিছানায় শুয়ে থাকলেও কোথায় কি হচ্ছে সব বুঝতে পারেন। আজ তার হাঁপানীর টান উঠেছে। শ্বাস নেবার কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে। গরমের কষ্ট। সন্ধ্যাবেলায় আধাকপালী মাথার যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তবু এর মধ্যেও টের পেলেন অপরিচিত একজন যুবকের জন্যে এ বাড়িতে রান্নাবান্না হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন যুবক জাহানারার পরিচিত। অফিস করা মেয়েদের অনেক পরিচিত পুরুষ থাকে। এটা স্বীকার না করে উপায় নেই। কিন্তু তাই বলে তারা রাতে ভাত খাবার জন্যে থেকে যাবে কেন? তারা কি জানে না। একজন অবিবাহিতা মেয়ের কাছে রাত-বিরাতে যেতে নেই। মেয়ে বা মেয়ের আত্মীয়-স্বজন কিছু মনে না করলেও আশপাশে লোকজন আছে না? কেউ যতি হঠাৎ করে একটা কথা বলে ফেলে তখন? মানুষের মুখেই জয় আবার মানুষের মুখেই ক্ষয়। মেয়ের নামে বদনাম বের হতে সময় লাগে না। কেউ একটা কথা বললে দশজন সেই কথাটা দশ রকম করে একশজনকে বলবে।
হাসিনা বিছানায় উঠে বসে বেড সুইচে বাতি জ্বালালেন। এটা তার সংকেত। বাতি জ্বালানো মানে তিনি চান কেউ আসুক তার ঘরে। অন্ধকার ঘরের অর্থ হচ্ছে তিনি কারোর সঙ্গ কামনা করছেন না।
মীরা ঘরে ঢুকল। হাসিনা বললেন, কে এসেছে? মীরা গম্ভীর গলায় বলল, আপার বন্ধু।
আপার বন্ধু আবার কে?
আছে একজন। এতদিন আপা কাউকে বলেনি বলে আমরা জানতে পারিনি। এখন জানলাম। তুই কি বলছিস?
ঠিকই বলছি মা। খুব শিগগিরই এ বাড়িতে বিয়ে লেগে যাবে। হলুদ বাট, মেন্দি বাট বাট ফুলের মউ।
হাসিনা কাতর গলায় বললেন, জাহানারাকে ডেকে আন তো।
মীরা আপা পাশে বসতে বসতে বলল, এখন ডাকা যাবে না। ওরা দু’জন সুখ-দুঃখের কথা বলছে।
হাসিনা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলেন। জাহানারার মত মেয়ে নিজে একটা ছেলেকে পছন্দ করেছে, আলাদা একটা ঘরে বসে গল্পগুজব করছে এই ব্যাপারটা তার বিশ্বাস হচ্ছে না। এখন যদি ইলেকট্রিসিটি চলে যায়? ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে অবস্থাটা কি হবে? ঢাকা শহরের ইলেকট্রিসিটির কি কোন ঠিক আছে? হাসিনার প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ইচ্ছা করছে উঠে বসার ঘরে চলে যান এবং কঠিন গলায় বলেন। এই ছেলে, তুমি কেমন ভদ্রলোক বল তো এত রাত পর্যন্ত…হাসিনা আর ভাবতে পারলেন না। ভাবা সম্ভবও নয়। দিনকাল পাল্টে গেছে। কিছু বলতে ইচ্ছা করলেও বলা যায় না।
জাহানারা ঘরে ঢুকে শান্ত গলায় বলল, মা উনি আপনার সঙ্গে দেখা করবেন।
হাসিনা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। এই ঘরের বাম্ব চল্লিশ পাওয়ারের। পরিষ্কার কিছু দেখা যায় না।
উনার নাম মামুন। গ্রামে যখন পোস্টিং ছিল তখন আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন।
মামুন এগিয়ে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করল। হাসিনা তাকিয়ে আছেন তীক্ষ্ণ চোখে। ছেলেটা লম্বা আছে একটা ভাল দিক। তবে বয়স বেশি। জাহানারার চেয়ে সাত আট-বছরের বড় তো হবেই আরো বেশিও হতে পারে। গায়ের রঙ ময়লা। পুরুষ মানুষের গায্যের রঙ ময়লা হলে যায় আসে। না। সভ্য ভদ্র বলেও মনে হচ্ছে পা ছুঁয়ে সালাম করল। কেউ করে না। নিজের ছেলেমেয়েরাই করে না তো অন্য মানুষ করবে। ছেলেটিকে তিনি তুমি বলবেন না। আপনি বলবেন ভেবে পেলেন না।
