বড় আপা।
জাহানারা চমকে তাকাল। মীরা উঠে এসেছে। সে তার স্বভাবমত পা টিপে টিপে এসে কানের কাছে চেঁচিয়েছে। বড় আপা।
চমকে দিয়েছি আপা?
হুঁ। খুব খারাপ অভ্যাস মীরা। মানুষকে চমকে দিয়ে তোর লাভটা কি হয়? কেন এ রকম করিস?
আর করব না। নিচে যাও আপা। তোমার কাছে একজন ভদ্রলোক এসেছেন।
আমার কাছে এত রাতে?
রাত তো বেশি হয়নি আপা। মোটে নটা একুশ। ভদ্রলোক আসার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি দেখলাম।
কে সে?
জানি না কে? খুব ভীতু ভীতু চেহারা। আমাকে আপনি আপনি করে কথা বলল। এটা কি মিস জাহানারার বাসা? উনি কি আছেন? তাকে দয়া করে বলবেন মামুন সাহেব এসেছেন। নিজেকে চমৎকার করে সাহেব বলল। আমি আর একটু হলে হেসে ফেলেছিলাম।
জাহানারা বিস্মিত হয়ে নিচে নেমে এল। এত রাতে হুঁট করে বাসায় উপস্থিত হবার কোন মানে হয়? তার সঙ্গে এমন কোন ঘনিষ্ঠতা নিশ্চয়ই নেই।
মামুনের মুখে অপ্রস্তুত একটা ভঙ্গি। এত রাতে উপস্থিত হবার কারণে সে নিজেও যে লজ্জিত তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কাজটা যে ভাল হয়নি চলে যেতে পারলে সে বাঁচে এই ভাবটা স্পষ্ট। জাহানারার একটু মায়াই লাগল।
আরে আপনি।
অসময়ে এসে পড়েছি। খুবই লজ্জিত। এত রাত হয়েছে বুঝতে পারিনি।
দাঁড়িয়ে আছেন কেন বসুন। রাত এমন কিছু বেশি হয়নি।
আগেও কয়েকবার এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি। একবার অবশ্যি বাসাতেও এসেছিলাম।
কই আমাকে তো কেই কিছু বলেনি।
না মানে আপনাকে বলবার কথাও নয়। আমি রাস্তা থেকে চলে গেছি।
কি আশ্চর্য কেন?
সেবাব ও রাত হয়ে গিয়েছিল। ভাবলাম। এত রাতে বিরক্ত করা।
আপনার বান্ধবী কেমন আছেন?
প্রশ্নটা করে জাহানারা নিজেই খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। হঠাৎ করে বান্ধবীর প্রসঙ্গ নিয়ে আসার কোনোই কারণ নেই। কিংবা কে জানে হয়ত কারণ আছে। হয়ত তার অবচেতন মনে এই প্রসঙ্গটা আছে!
মুনার কথা বলছেন?
জি।
ওর কোন খবর পাচ্ছি না। বাসায় তালা। দু’দিন গিয়ে ঘুরে এসেছি। কোথায় গেছে তাও কেউ জানি না।
অফিসে যান। অফিসে গেলেই নিশ্চয়ই খোঁজ পাবেন। অফিসে গিয়েছিলেন?
জি না।
মামুনের মন একটু খারাপ হল। অফিসের কথা তার মনে আসেনি।
চা খান।
জি না চা খাব না। আজ উঠি।
এসেই উঠবেন কেন? বসুন্ন গল্পটল্প করুন। আপত্তি না থাকলে রাতে আমাদের সঙ্গে খান।
মামুন কিছু বলল না। জড়সড় হয়ে বসে রইল। তার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে খাওয়ার ব্যাপারে তার কোনো আপত্তি নেই। অথচ খাবার কথাটা জাহানারা নিতান্তই ভদ্রতা করে বলেছে। ঘরে আয়োজন খুবই সানান্য। দুপুরের তরকারির অবশিষ্ট দিয়ে রাতে চালানোর কথা। জাহানারা একবার ভাবল বলবে থাক আপনার খাওয়ার দরকার নেই মেনু খুব খারাপ। অন্য এক’দিন এসে খেয়ে যাবেন। কিন্তু এ জাতীয় কোন কথা বলাও সম্ভব নয়। একটু আগে খেতে বলে পরমুহূর্তে না বলা যায় না। জাহানারা তাকে বসিয়ে রেখে রান্নাঘরে চলে গেল।
অসহ্য গরমে রান্নাঘরে ঢোকা মানে নরকে প্রবেশ করা। নতুন কিছুই তৈরি করাও ঝামেলা। কয়েকটা শুকনো বেগুন ছাড়া কিছুই নেই। মা ভাল থাকলে এই নিয়েই কিছু-একটা করে ফেলতেন। মার শরীর দু’দিন থেকে খুব খারাপ। হাঁপানীর টান উঠেছে। ঘর অন্ধকার করে পড়ে আছেন।
রান্নাঘরে জাহানারার সামনে মুখ নিচু করে মীরা বসে আছে। সে একটু পর পর ফিক করে হেসে ফেলছে এবং সেই হাসি গোপন করবার জন্যে প্ৰাণপণ চেষ্টা করছেন। জাহানারা বিরক্ত হয়ে বলল, হাসছিস কেন?
মীরা বলল, ঐ লোকটা কে আপা?
কেউ না। একজন চেনা লোক।
মীরা আবার হেসে ফেলল। জাহানারা ঝাঁঝাল গলায় বলল, গ্রামে যখন পোস্টিং হয়েছিল তখন এই ভদ্রলোক অনেক সাহায্য করেছেন। এখানে বেড়াতে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। ভদ্রতা করে খেতে বলেছি তাতেই রাজি হয়ে আমাকে বিপদে ফেলেছেন–এর মধ্যে হাসির কি আছে?
তুমি কৈফিয়ত দিচ্ছ কেন আপা?
কৈফিয়ত দিচ্ছি না। কৈফিয়ত দেবার কি আছে? তুই এখানে বসে না থেকে ভদ্রলোকের সঙ্গে গল্প কর। একা একা বসে আছেন।
আমি বরং লায়লা আপাদের বাসা থেকে এক বাটি তরকারি নিয়ে আসি?
কিছু আনতে হবে না।
মীরা তার আপার কথা শুনল না। পাশের বাসা থেকে তরকারি নিয়ে এল। সে ভেবেছিল আপা রাগ করবে। রাগ করল না। মুখ দেখে মনে হল খুশিই হয়েছে। মীরা চলে গেল বসার ঘরে। মামুন হাসিমুখে বলল, এস খুকি? কি নাম তোমার? মীরা বিরক্ত হল। লোকটা এখন আবার তুমি করে বলছে।
আমার নাম মীরা।
দু’বোন তোমরা?
দু’বোন এক ভাই। ভাই গেছে নানার বাড়ি বেড়াতে।
কি পড় তুমি?
ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার। সাবজেক্ট হচ্ছে ফিলসফি।
কি সর্বনাশ। আমি ভেবেছিলাম। এইটি নাইনে বোধ হয় পড়; আগে টের পেলে খুকি বলতাম না। তোমার আপা কোথায়?
রান্নাঘরে। খেতে রাজি হয়ে আপনি আমাদের বিপদে ফেলেছেন। ঘরে খাবার কিছু নেই। পাশের বাড়ি থেকে বাটিতে তরকারি। আনতে হল।
সে কি!
অবশ্যি ওরাও মাঝে মাঝে নিয়ে যায়। এটা কোন ব্যাপার না। শোধবোধ হয়ে যায়।
মামুন এই চমৎকার চেহারার ফুটফুটে মেয়েটির প্রতি গাঢ় মমতা বোধ করল। কি সুন্দর মুখে মুখে কথা বলছে। জাহানারা এ রকম নয়। কথা সে প্রায় বলেই না।
আপনি নাকি আপাকে অনেক সাহায্য-টাহায্য করেছেন। কি সাহায্য করেছেন?
আমি তো কোনো সাহায্য করিনি। উল্টো উনি আমাকে সাহায্য করেছেন। ব্যাংকের একটা লোনের ব্যাপারে খুব সাহায্য করেছেন।
