ও আচ্ছা বাকের সাহেব।
চিনতে পারছেন তাহলে?
জি। অনেক’দিন আপনাকে দেখি নাই।
দেখবেন কি করে–আমি হাজতে ছিলাম। আপনাদের দোয়ায় আজ ছাড়া পেয়েছি।
জোবেদ আলির চোখ সরু হয়ে গেল। চশমা ঝুলে পড়ল। সে প্রায় ফিসফিস করে বলল, এখন যাই। কাজ আছে।
আরে ভাই এই চৈত্র মাসের দুপুরে কিসের কাজ? দাঁড়ান একটু গল্পগুজব করি। মেয়ে কি আপনাদের এখনো তিনটাই না। আরো বাড়িয়েছেন?
আপনার কথা বুঝলাম না।
বিজনেস আরো বড় করেছেন না। আগের মত ছোটখাটো আছে?
আপনি খুব বেতালা কথা বলেন।
তাই নাকি?
বেতালা কথা বেশি বলা ভাল না।
জোবেদ আলি হাঁটা শুরু করল। মাথা নিচু করে চোরের মতো ভঙ্গিতে হাঁটা। একবার শুধু থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরল। বাকের তাকিয়ে আছে। তার মুখ হাসি হাসি। কিছুক্ষণ আগে যে বিরক্তি তাকে ঘিরে ছিল এখন আর তা নেই। তার বেশ মজা লাগছে। ইয়াদের বাসায় যাবার ব্যাপারে এখন বেশ আগ্রহ বোধ করছে।
ইয়াদ বাসায় ছিল না।
দরজা খুলল তার বৌ। ছোটখাটো একটা মেয়ে মাত্র গোসল করে এসেছে। চুলে গামছা জড়ানো গায়ের শাড়িও ভালমত পরা নেই। সে ভেবেছে ইয়াদ। কড়া নাড়া মাত্র দরজা খুলে এমন হকচাকিয়ে গেছে। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, উনি বাসায় নেই।
কোথায় গেছে?
অফিসে।
আমার নাম বাকের। আজ হাজত থেকে ছাড়া পেয়েছি।
মেয়েটি কিছুই বলল না। সে শাড়ি দিয়ে নিজেকে ভালমত ঢাকতেই ব্যস্ত।
ইয়াদ আসবে কখন?
সন্ধ্যার পর আসবে। আপনি সন্ধ্যার পর আসুন।
মেয়েটি এমন ভাবে দরজা বন্ধ করল যেন সে একজন ভিখিরিকে পয়সা দিয়ে বিদেয় করে দিচ্ছে। বাকেরের মন অসম্ভব খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা বলতে পারত। আপনি বসূন। বসুন বললেই তো সে খালি বাড়িতে হুঁট করে ঢুকে যেত না। মেয়েটি তাহলে এ রকম করল কেন? কোথায় যাওয়া যায়? সারা গায়ে প্রচুর ফেনা তুলে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল কবার জন্যে মন কেমন করছে। গোসলের পর গরম এক কাপ চা। একটা ফাইভ ফাইভ কিংবা বেনসন।
বাকের আবার রাস্তায় নামল। সূর্য হেলে পড়েছে। কিন্তু এখনো তার কী প্রচণ্ড তেজ। রাস্তায় পিচ গলে যাচ্ছে। জুতার সঙ্গে লেগে সমান মোটা হলে একটা কথা ছিল … একটা বেশি উঁচু অন্যটা। কম। যার জন্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
বাকের ভাই না? কবে ছাড়া পেয়েছেন?
অচেনা একটা ছেলে। দাঁত বের করে আছে। ইয়ারকি দিতে চায় সম্ভবত। কিংবা তাকে দেখে যে কোন কারণেই হোক মজা পাচ্ছে।
আপনাকে অবিকল কোজাকের মতো লাগছে।
তাই নাকি?
ছেলেটি মাথা ঝাকাল। বাকের একবার ভাবল ব্যাপারটা গুরুত্ব দেবে না। চেংড়া ছেলে।পুলের সব কথা ধরতে নেই। তবু শেষ সময়ে মাথায় কি যেন হল বাকের প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিল। ছেলেটি ছিটকে পড়ল। রাস্তায়–সেখান থেকে গড়িয়ে গেল আরো কিছু দূর। সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। কপাল ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছে।
বাকের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। চায়ের পিপাসা হচ্ছে। জলিল মিয়ার স্টলে গিয়ে এক কাপ চা খেলে হয়। মুখের ভেতরটা তেতো লাগছে। সারা শরীরে ঘামের কটু গন্ধ। আশ্চর্য কোথাও গিয়ে সে কি শান্তিমত একটা গোসল ও করতে পারবে না? মুনার কাছে গেলে কেমন হয়?
ঠিক এই অবস্থায় মুনার সামনে উপস্থিত হবার কোন মানে হয় না। তাছাড়া মুনাকে এখন নিশ্চয়ই পাওয়াও যাবে না। অফিস করছে। সন্ধ্যার আগে ফিরবে না। অফিস করা মেয়েগুলি আবার অফিস ছুটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরতে পারে না। সাজানো-গোছানো দোকান দেখলেই তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে; ঘণ্টা খানিক চলে যায়।
বাকের সন্ধ্যর পর পর মুনাদের বাসার দিকে রওনা হল। ইতিমধ্যে তার বেশভূষা পাল্টে গেছে। গায়ে ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি (ইয়াদ দিয়েছে), নতুন স্যান্ডেল (কেনা হয়েছে), পকেটে নতুন রুমাল (কেনা)। গালে আফটার শেভ দেয়ায় ভুরিভুর করে গন্ধ বেরুচ্ছে। এটা একটু অস্বস্তিকর। আফটার শেভ না দিলেই হত।
মুনাদের বাসায় বিরাট এক তালা ঝুলছে। বাকের তালা ধরেই খানিকক্ষণ ঝাকাঝাকি করল। অফিস থেকে এখনো ফিরেনি তা কি করে হয়? আটটা বাজে। রাত আটটা পর্যন্ত মুনা বাইরে ঘুরবে: নাকি? তালার সাইজ দেখে মন হয় মুনা বেশ কিছু দিন ধরেই বাইরে। অফিসিযাত্রীরা এত বড় তালা লাগায় না।
রাত নটার দিকে বাকের আবার গেল। এখনো তালা ঝুলছে। ঘর অন্ধকার। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে জানা গেল দিন দশেক আগে মুনা তাকে বলেছে সে কিছু দিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে কবে ফিরবে কিছু বলে যায়নি।
বাকের থমথমে গলায় বলল, কোথায় গেল জিজ্ঞেস করলেন না?
বাড়িওয়ালা বিরক্ত স্বরে বলল, আমার এত ঠেকা কিসের?
কথার ধরনে বাকেরের রাগ উঠে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে সে রাগ থামাল। মনে মনে কয়েকবার বলল, লাশা, লাশা। উল্টো করে শালা বললে রাগ নাকি কমে যায়। এই জিনিসটা সে হাজতে শিখে এসেছে। ব্যাপারটা সত্যি না। বাকেরের রাগ কমল না। তবুও সে কয়েকবার বলল–লাশা লাশা।
বাড়িওয়ালা হারামজাদা, মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল।
ক’দিন ধরেই অসহ্য গরম
জাহানারা গা ধুয়ে ছাদে গিয়ে বসেছে।
ক’দিন ধরেই অসহ্য গরম। গা ধুয়ে ছাদে বসে থাকলে কিছুক্ষণ ভাল লাগে তারপর আবার শরীর ঘামতে থাকে। ইচ্ছে করে বিরাট কোনো দিঘিতে ডুবিয়ে বসে থাকতে। পদ্মদিঘি–যার জলে টাটকা পদ্মের গন্ধ।
আজ ছাদে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। বাতাস একেবারেই নেই। অনেক দূরের আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। লোক দেখানো বিদ্যুৎ। বৃষ্টি বাতাস হবে না। জাহানারা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল! ছাদে বসে থাকার কোনো অর্থ হয় না। এরচে বসার ঘরে ফ্যানের নিচে বসে থাকা ভাল। বাতাস খানিকটা লাগবে।
