নতুন বৌকে কেউ এমন কড়া গলায় কিছু বলে। বকুলের চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। সে বহু কষ্টে পানি সামলাল এবং হাত রাখল। জহিরের পিঠে। জহির বিরক্তমুখে বলল, এ রকম শান্তিনিকেতনি কায়দায় সুড়সুড়ি দিচ্ছি কেন? ভালমত চুলকাও।
কি বিশ্ৰী কথা বলার ভিঙ্গি। বিয়ের পর মানুষটিকে বকুলের মোটেও ভাল লাগছে না। দুপুরের পর থেকেই তার শুধু মনে হতে থাকে সন্ধ্যা এসে পড়ছে। এক সময় সন্ধ্যা মিলাবে এবং জহির সবার সামনেই দরজা বন্ধ করে ঝাপটা-ঝাপটি করতে করতে বলবে তুমি এমন মাছের মতো পড়ে থাক কেন? তোমার অসুবিধাটা কি? বকুল শুধু মনে মনে বলবে, আহ আজকের রাতটা পার হোক। এক সময় সেই রাত পার হয়। কিন্তু আবার নতুন একটি রাত আসতে শুরু করে। একটি বিবাহিত মেয়ের জীবন মানেই কী একের পর এক গ্লানিময় ক্লান্তির দীর্ঘ রজনী?
কাউকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কাকে করবে? টিনা ভাবী নেই। তাকে চিঠি লেখা যায়। কিন্তু চিঠি লিখতে ইচ্ছা করে না। ইদানীং তার বারবার মনে হয় সবাই ইচ্ছা করে তাকে জলে ফেলে দিয়েছে। সবাই জানত তার এই অবস্থা হবে কিন্তু কেউ তাকে বলেনি।
বিশাল এই বাড়িতে তার শুধু হাঁফ ধরে। প্রায়ই মনে হয় নিঃশ্বাস নেবার মতো বাতাস নেই কোথাও। অথচ কি খোলামেলা বাড়ি। তাদের শোবার ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালা খুলে দিলে বাতাসে বিছানার চাদর সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। টানা বারান্দা এত প্রশস্ত যে নেট টানিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা যায়।
একতলার বেশির ভাগ ঘরই তালাবদ্ধ। থাকার লোক নেই ব্যবহার হয় না। তার শাশুড়ি প্রথম দিনেই সব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। সারাক্ষণই কথা বললেন–
এই যে দেখ মা। পাশাপাশি দুই ঘরা। তোমার শ্বশুর বলতেন অতিথি ঘর। অতিথি এলে থাকবে। কত বড় ঘর দেখলে? ইচ্ছা করলে বাইজী নাচানো যায়। তোমার শ্বশুর সাহেবের মাথাটা ছিল খারাপ। টাকা-পয়সা যা ছিল সব ঢেলেছ এই বাড়িতে। তা না করে যদি জমিজমা করত তাহলে আজ তোমরা পায়ের ওপর পা তুলে থাকতে পারত। বুঝলে মা এই বংশই হচ্ছে পাগলের। আমার ছেলেও পাগল। এখন বুঝতে পারছি না, কয়েক’দিন যাক বুঝবে। এই যে দেখ এটা দেখ। লাইব্রেরি ঘর। রাজ্যের বই আছে। এখানে। পোকায় কেটে সব শেষ করেছে। একটা বই আস্ত নেই। বই পড়ার অভ্যাস আছে? থাকলে আমার কাছ থেকে চাবি নিয়ে যেও। তবে মা রাতের বেলা একা একা। এ ঘরে আসবে না। সবাই বলে কী সব নাকি দেখে। আমি নিজে কোনোদিন দেখি নাই। তোমার শ্বশুর সাহেবকে নাকি দেখে ইজিচেয়ারে শুয়ে বই পড়ছে। যত বানানো কথা। শুনলে রাগে গা জ্বলে যায়।
জহির নিজেও বাড়ি প্রসঙ্গে অনেক কথাটথা বলল। বকুলকে খানিক ঘুরিয়ে দেখাল, ছাদে নিয়ে গেল। হৃষ্টচিত্তে বলল, বাড়ি কেমন দেখলে?
ভাল।
একুশটা ঘর আছে। অথচ দু’টা মাত্র বাথরুম, তাও একতলায়। বাবার একটা নেশাই ছিল ঘর বানানো। কি করে রুমের সংখ্যা বাড়ানো যায়। অথচ মানুষ মাত্র তিনজন।
এ রকম অদ্ভুত সখা হল কেন? কে জানে কেন। গৌরীপুরের মহারাজার বাড়ি দেখে বোধ হয় এই নেশা চেপেছিল। লোকজনের বাড়ির সামনে পেছনে খোলা জায়গা-টায়গা থাকে, বাগান-টাগান করে। এইসব কিছু নেই। সবটা জায়গা জুড়ে বাড়ি। কিছুদিন পর এটা হবে ভূতের বাড়ি। কেউ থাকবে না।
বকুল ক্ষীণ স্বরে বলল, মা আমাকে লাইব্রেরি ঘরে একা একা যেতে নিষেধ করেছেন। জহির বিরক্তমুখ বলল, যত ফালতু ব্যাপার। যেখানে যেতে ইচ্ছা হয় যাবে। ভূত-প্রেতি গল্পের বই ছাড়া অন্য কোথাও নেই। তুমি আবার ভূত বিশ্বাস কর না তো?
অল্প অল্প করি।
এখন থেকে আর করবে না। তবে শোন, রাতের বেলা বাথরুমে যেতে হলে আমাকে ডেকে তুলবে। একা একা যাবার দরকার নেই। আমি দোতলায় বাথরুমের ব্যবস্থা করছি। কালই রাজমিস্ত্রী লাগাব!
সত্যি সত্যি ভোর হতেই রাজমিস্ত্রী চলে এল। বকুলের শাশুড়ি মুখ কালো করে ফেললেন। এত টাকা খরচ করে বাথরুম বানানোর তার কোনো ইচ্ছা নেই। দিন তো চলে যাচ্ছে। ওদের দোতলায় অসুবিধা হলে একতলায় চলে এলেই পারে। ঘর তো সব খালিই পড়ে থাকে।
মা এবং পুত্রের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা লড়াই হয়ে গেল। এ জাতীয় লড়াই বকুল আগে দেখেনি। সে কী করবে। বুঝতে পারল না। শাশুড়ি তার ঘরে শুয়ে কাঁদছেন। জহির চায়ের কাপ হাতে রাজমিস্ত্রীদের কাজের তদারক করছে হাসিমুখে। বকুল শুকনো মুখে একবার যাচ্ছে শাশুড়ির কাছে একবার আসছে জহিরের কাছে।
বাড়িতে আর লোকজন বলতে দু’টি কাজের মেয়ে এবং শমসের নামের একজন গোমস্তা ধরনের মানুষ। যার একমাত্র কাজ হচ্ছে বাজার করে এনে রোদে পিঠ মেলে বসে থাকা। বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন যা এসেছিল তারা এক’দিন পরই বিদেয় হয়েছে। বকুলের শাশুড়ির তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়ার কারণ হচ্ছে বিয়েতে দেয়া উপহার।
তিনি বকুলের চাচি শাশুড়িকে সবার সামনেই বললেন, দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র ছেলে আমার। তার বৌয়ের জন্যে যে শাড়ি আনলেন সেই শাড়ি তো আমার কাজের মেয়েও পরে না। আমার একটা ইজ্জত নেই। ছেলের বৌয়ের কাছে আমার মুখ ছোট হল না? আপনি দুমেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এদের প্রত্যেকের বিয়েতে আমি সোনা দিয়েছি। দেইনি? আমার ছেলে কী নদীর পানিতে ভেসে এসেছে?
কঠিন কঠিন কথা খুব সহজ মুখে বলে যাচ্ছেন। রোগা ফর্সা ও সুন্দর মহিলাটি কাঁদতে লাগলেন। কী অস্বস্তিকর অবস্থা।
