আপনি বড্ড বিরক্ত করেন বাকের ভাই।
বিরক্ত করব না। এক মিনিটের মামলা। তুমি নাটক দেখতে যাওনি।
যাইনি। সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। শুধু শুধু কথা বলা আপনার একটা বদ অভ্যাস।
তা ঠিক। নাটকে মিনিসটার সাহেব আসছেন জানো নাকি?
না জানি না। আসুক যার ইচ্ছা।
সিদ্দিক সাহেবের চাল। ব্যাটা ইলেকশন করবে। ফিল্ড করছে। বুঝলে মুনা? লোকজনদের খেলাচ্ছে।
খেলাক। আপনি চুপ করে বসুন। চা এনে দিচ্ছি খেয়ে বিদেয় হোন।
নাটক যদি দেখতে চাও নিয়ে যেতে পারি। ঘরে তালা দিয়ে চলে যাব। নো প্রবলেম।
কিচ্ছু দেখতে চাই না।
মুনা ভেতরে চলে গেল। বাকের সিগারেট বের করল। পকেটে দেয়াশলাই আছে। তবু সে রান্নাঘরে উঁকি দিল ম্যাচ আছে? সিগারেট ধরাতে পারছি না। মুনা নির্বিকার ভঙ্গিতে দেয়াশলাই এগিয়ে দিল।
কাজের একটা মেয়ে ছিল না? সেও নেই?
না। দেশের বাড়ি গেছে। আপনি এখানে বসছেন কেন? বসার ঘরে গিয়ে বসুন।
তুমি একা একা আছ!
।বাকের ভাই, বসার ঘরে গিয়ে বসুন তো।
বাকের উঠে গেল।
মিনিস্টার সাহেব চলে এসেছেন। অনেক মাইকী-টাইক লাগানো হয়েছে। এখান থেকেও পরিষ্কার শুনা যাচ্ছে। সব মিনিস্টাররা এক ধরনের ভাষায় বক্তৃতা দেন। গলা উঠানামা করে এক ভঙ্গিতে। এক এক সরকারের মন্ত্রীদের এক এক ধরনের বক্তৃতা। শেখ মুজিবের মন্ত্রীরা আঙুল দেখিয়ে বক্তৃতা করতেন। রেসকোর্স ময়দানে মুজিবের ভাষণের নকল করতেন। এরশাদ সাহেবের মন্ত্রীরা সবাই খুব আল্লাহ ভক্ত। সবাই কোরান শরীফ থেকে উদ্ধৃতি দেন। তাদের বক্তৃতায় ইহকালের চেয়ে পরকালের কথা বেশি থাকে। বক্তৃতা শুনলে মনে হয় ওয়াজ করছেন।
বাকের শুনল মিনিস্টার সাহেব বলছেন–যুবকদের সমাজের প্রতি দায়িত্ব আছে। যুবকদের অনুসরণ করতে হবে রসুলুল্লাহর নির্দেশিত পথ। কারণ সেই পথেই ইহকাল ও পরকালের জন্যে
মুনা চা এনে সামনে রেখে ক্লান্ত গলায় বলল, বাকের ভাই, আমার শরীরটা ভাল না। চা খেয়ে আপনি চলে যান।
হয়েছে কি?
কি জানি কি! বমি বমি লাগছে।
নো প্রবলেম দু’টি এভোমিন ট্যাবলেট নিয়ে আসছি।
আপনাকে কিছু আনতে হবে না, প্লিজ।
বাকের চায়ে চুমুক দিল। মুনা তার সামনেই বসে আছে। চোখ ঈষৎ রক্তাভ। সন্ধ্যা বেলাতেই ঘন ঘন হাই তুলছে। কেমন কঠিন একটা ভঙ্গি তার চারদিকে। মেয়েরা এমন কঠিন হলে ভাল লাগে না।
রাত সাড়ে এগারটার দিকে শেষবারের মত চা খাবার জনো বাকের বের হল। ভাইয়ের বাসায় থাকার সময় তাকে এই কষ্টটা করতে হত না। শোবাব আগে এক কাপ চা খাওয়া যেত। এখন বাইরে থেকে খেয়ে আসতে হয়। অস্বস্তিকর ব্যাপার। বিছানায় বসে চা খাওয়া আর দোকানের চেয়ারে বসে চা খাওয়া একটা বড় রকমের পার্থক্য আছে।
জলিল মিয়া তার সন্টল বন্ধ করে দিয়েছে। সাধারণত বারোটার দিকে বন্ধ হয়। আজ সকাল সকাল বন্ধ হল। বাকের এগিয়ে গেল মেইন রোডের দিকে। সেখানে হোটেল আকবরিয়া সারারাত খোলা থাকে।
বাকের ভাই। বাকের ভাই।
বাকের থমকে দাঁড়াল। জসীম লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসছে। তার মধ্যে ব্যস্ত একটা ভঙ্গি। মনে হচ্ছে বেশ ফুর্তিতে আছে।
কি খবর জসীম?
জি খবর ভাল।
তোমাদের নাটক কেমন?
জসীম খানিকটা চুপসে গেল। নিচু গলায় বলল, ভাল হয়েছে।
ভাল হলেই ভাল। মিনিসটার এসেছিল নাকি?
হুঁ।
গুড, ভেরি গুড।
আমি আপনাকে খুঁজছিলাম বাকের ভাই। দু’বার আপনার ঘরে গিয়ে খুঁজে এসেছি
কি জন্যে?
জসীম ইতস্তত করতে লাগল। যেন কোন একটি অপ্রিয় প্রসঙ্গ তুলতে চায়। কিন্তু সাহসে কুলুচ্ছে না। সে অকারণে কাশতে লাগল।
বলে ফেল কি ব্যাপার।
আপনি জোবেদ আলিকে কি বলেছেন?
বাকেরের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আজ সন্ধ্যার কথা বলছ?
হুঁ।
তা দিয়ে তোমার কি? জোবেদ আলির সঙ্গে তোমার কি? জোবেদ আলি বেশ্যার দালাল। তুমি করা দোকানদারি। তাকে কি বললাম না বললাম তাতে তোমার গায়ে লাগছে কেন বুঝলাম না।
না। আমার কিছু না। সিদ্দিক সাহেবের কাছে ওরা গিয়েছিল। সিদ্দিক সাহেব আমাকে খবর দিয়ে আনলেন। আমাকে আর মাখনা ভাইকে। বললেন…
জসীম থেমে গেল। বাকের গভীর স্বরে বলল, কি বললেন?
বললেন আপনাকে সাবধান করে দিতে। ঝামেলা করলে অসুবিধা হবে।
কি অসুবিধা হবে?
জসীম চুপ করে রইল। বাকের কড়া গলায় বলল, তোমরা সিদিকের সঙ্গে গিয়ে জুটেছ?
তা না। উনি পাড়ার একটা মাথা।
কবে থেকে পাড়ার মাথা হল? কি, কথা বলছি না যে? গিয়ে বলবে তোমার পাড়ার মাথাকে, আমি তার মুখে পেচ্ছাব করে দেই।
জসীম রুমাল দিয়ে তার ঘাম মুছতে লাগল। বাকের বলল, কি বলতে পারবে না?
এটা কেমন করে বলি বাকের ভাই?
অসুবিধা কি? আমি যেমন বললাম। সে রকম বলবে। তোমাদের কাজই তো হচ্ছে একজনের কথা অন্যজনকে বলা।
আপনি যাচ্ছেন কোথায়?
চা খেতে যাই। হোটেল আকবরিয়ায়। খাবে নাকি?
জি না।
না খেলে চলে যাও। সিদ্দিক সাহেবকে খবরটা দাও। মুখে পেচ্ছাবের কথাটা গুছিয়ে বলবে। ওটা বাদ দি ও না।
জসীম শুকনো মুখে চলে গেল। হোটেল আকবরিয়ার মালিক দিলদার মিয়া খুবই যত্ন করল। নিজে উঠে গিয়ে চা নিয়ে এল। বসল মুখোমুখি। দিলদার মিয়ার মুখে বসন্তের দাগ। চিবুকের কাছে এক গোছা কুৎসিত দাড়ি। তবু বাকেরের দিলদার মিয়ার সঙ্গে গল্প করতে বেশ লাগল। সে ঘরে ফিরল রাত একটায়। রাত দুটায় পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল। অভিযোগ গুরুতর। বেআইনি অস্ত্র রাখা। জনগণের ওপর জোরজবরদস্তি। সে ধরা পড়ল। গুণ্ডা আইনে। তার কাছে অস্ত্রশস্ত্র কিছুই ছিল না। কিন্তু পরদিনের পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হল। তার সঙ্গে যে সব অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে তার ছবিও উঠল। একটি পিস্তল, দু’টি ন’ইঞ্চি ড্যাগার এবং তিনটি তাজা হাতবোমা।
এক সপ্তাহ অনেক লম্বা সময় নয়
বকুলের বিয়ে হয়েছে এক সপ্তাহ হয়ে গেল। এক সপ্তাহ অনেক লম্বা সময় নয়। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে সে বৌ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতে ঘুমুতে যাচ্ছে একজন পুরুষ মানুষের সঙ্গে। মানুষটিও যেন তার সঙ্গে অনন্তকাল ধরেই ঘুমুচ্ছে! গায়ে ঘামের গন্ধ। সে বলে উঁচু গলায়। রেগে ওঠে। অল্পতে। বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই সে বলল, পিঠটা একটু চুলকে দাও তো বকুল। কী অদ্ভুত কথা! ঘর ভর্তি মানুষজন। সে বসে আছে টানা বারান্দায়। লোকজন আসা-যাওয়া করছে এর মধ্যে পিঠ চুলকে দেবে কী? কিন্তু জহির শার্ট তুলে খালি গায়ে বসে আছে। অসহিষ্ণু গলায় বলল, আহ দেই করছ কেন?
