পাঁচ দিনের মাথায় বাবু এসে উপস্থিত। একা একা চলে এসেছে। হাতে নতুন কেনা সুটকেস। বকুলের বিস্ময়ের সীমা রইল না। বিস্ময় এবং আনন্দ। তার ইচ্ছা করছিল ছুটে গিয়ে বাবুকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ খুব কাঁদে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। শাশুড়ি বাবুর সঙ্গে কথা বলছেন। জহির দোতলা থেকে নেমে এসেছে।
বাবুর শোবার জায়গা হল একতলায়। বকুল অবাক হয়ে লক্ষ্য করল বাবুর ঘর গোছগাছ করে দেবার জন্যে জহির নিজেই উদ্যোগী হয়েছে। বকুল এটা ঠিক আশা করেনি। তার কেন জানি মনে হচ্ছিল জহিরের এখন আর তার বা তার পরিবারের কারোর প্রতি কোন আগ্রহ নেই। রাতের বেলা বকুলকে খানিকক্ষণ কাছে পেলেই তার হবে। সমস্ত ভালবাসাবাসি রাতের খানিকক্ষণ সময়ের জন্যে। সে ভেবে পাচ্ছে না। এই ব্যাপারটি শুধু কী তার ক্ষেত্রেই সত্যি না পৃথিবীর সব মেয়েদের বেলাতেও সত্যি।
বকুলের আনন্দের সীমা রইল না। যখন জহির বলল, তুমি বরং আজ তোমার ভাইয়ের সঙ্গে ঘুমাও। বকুল তাকিয়ে রইল। জহির বলল, বেচারা একা একা ভয়টয় পেতে পারে। তাছাড়া তোমার নিজেরও ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছা করছে নিশ্চয়ই। রাত জেগে গল্প কর।
আনন্দে বকুলের চোখে পানি এসে গেল। সে কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার ইচ্ছা করছে এমন কিছু বলতে যাতে জহির খুব খুশি হয়। কিন্তু তেমন কোনো কথা তার মনে আসছে না। সে শুধু বলল, তোমার অসুবিধা হবে না তো?
অসুবিধা? অসুবিধা হবে কেন?
ঠিকই তো তার অসুবিধা হবে কেন। বকুল কথাটা বলেছে খুব বোকার মতো। জহির বলল, এক কাজ করলে কেমন হয়? বাবুকে এখানে রেখে দেয়া যায় না?
এখানে রেখে দেব?
হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে থাকবে। পড়াশোনা করবে। বিরাট বাড়ি খালি পড়ে আছে। তাছাড়া ও থাকলে তোমার একজন সঙ্গী হবে।
সত্যি বলছ?
সত্যি বলছ মানে?
না মানে তুমি চাও ও এখানে থাকুক?
না চাইলে শুধু শুধু বলব কেন? চাই বলেই তো বলছি। তাছাড়া আমি যখন এখানে থাকব না তুমি তখন খুবই লোনলি হয়ে পড়বে।
বকুল অবাক হয়ে বলল, তুমি এখানে থাকবে না। মানে? মা যে বলল, তুমি এখানেই থাকবে।
আমি কি এই মফস্বলে পড়ে থাকব নাকি? কি যে তুমি বল। ঢাকা ছাড়া আমি থাকতে পারি না।
তুমি ঢাকা থাকলে আমিও ঢাকা থাকব।
জহির নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলল, পাগল হয়েছ। মা যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন তোমার এখানেই থাকতে হবে।
কেন?
এই শর্তেই মা তোমাকে বিয়ে করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন।
বকুল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জহির হৃসতে হাসতে বলল, মা বড় কঠিন জিনিস। যত দিন যাবে ততই বুঝবে। তুমি শোবার আগে এক জগ পানি এবং একটা গ্লাস দিয়ে যাবে। জহির ঘুমুবার আয়োজন করল।
রাতে বাবুর সঙ্গে তেমন কোন কথাবার্তা হল না। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। তাছাড়া এমনিতেও তার বোধ হয় কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। সে ঘাড় বাকিয়ে বলল, এই ঘরে ঘুমাতে হবে না।
বকুল বলল, ঘুমালে কি অসুবিধা?
বাবু তার জবাবে মুখ অন্ধকার করে বসে রইল।
বাসার খবর কি?
একবার তো বললাম। বাসার খবর।
মুনা আপা কোন চিঠি দেয়নি?
না দেয়নি। দিলে তো তোমার কাছেই দিতাম। লুকিয়ে রাখতাম নাকি?
চিঠি দিল না কেন?
আমি কী জানি কেন দেয়নি।
বকুল ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার কথা বোধ হয় সবাই ভুলেটুলে গেছে। বাবু চুপ করে রইল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে বকুলের এই কথা সমর্থন করছে। বকুল বলল, তোর মাথাব্যথা এখনো হয়?
হয়।
এখন হচ্ছে?
না।
হলে বলিস। তোর দুলাভাইয়ের কাছ থেকে ওষুধ এনে দেব।
আমার কোন অষুধ-টুষুদ লাগবে না।
বাবু চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে ফেলল। বকুল নরম গলায় বলল, তুই আমার সঙ্গে কথা বল বাবু। এর রকম করছিস কেন? তুই এসেছিস আমার এত ভাল লাগছে।
বাবু মুখের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে ফেলল। বকুল হঠাৎ বলে ফেলল, আমি এখানে খুব কষ্টে আছি রে বাবু। আমার কিছু ভাল লাগে না; মরে যেতে ইচ্ছা করে।
কেন?
তাও জানি না।
বিয়ে করার জন্যে তুমি তো পাগল হয়েছিলে।
বকুল চুপ করে রইল। অনেক রাত পর্যন্ত তার ঘুম এল না। একবার ইচ্ছে করল জহিরের কাছে ফিরে যেতে। এই ইচেছটা কেন হল তাও সে ঠিক ধরতে পারল না। সব কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অর্থহীন সব চিন্তা-ভাবনা আসছে মাথায়। বাইরে কাক ডাকছে। কাকের ডাকের সঙ্গে নানান রকম পাখ-পাখালির ডাকও কানে আসছে। ভোর হয়ে যাচ্ছে বোধ হয়। ঘুমহীন রাত একটি কেটে গেল। তার কেন যেন মনে হল এ রকম নিদ্রাহীন রজনী আরো অনেক আসবে তার জীবনে। সে খানিকক্ষণ কাঁদল। এই কান্নাও কেমন অন্য রকম। আগে কাঁদলে মন হালকা হয়ে যেত। ভাল লাগত। এখন লাগছে না। মন ভারী হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে কি মানুষকে এমন ভাবে বদলে দেয়?
টিনা ভাবী বিয়ে নিয়ে কত গল্প করেছে। এ রকমও যে হয় তা তো কখনো বলেনি। এটি সে লুকিয়ে রাখল কেন? নাকি সবার জীবনে এ রকম হয় না? বেছে বেছে বকুলদের মতো মেয়েদের বেলাতেই এ রকম হয়? বকুলের ধারণা হল সে নিশ্চয়ই খুব খারাপ মেয়ে। খারাপ মেয়েদের এ রকম শাস্তি হয়। হওয়াই উচিত।
ভোরবেলা এক কাণ্ড হল। জহির এসে বলল, এই বাবু ঘোড়ায় চড়বে?
বাবু অবাক হয়ে বলল, ঘোড়া পাবেন কোথায়?
কোথায় পাব সেটা আমি দেখব। তুমি চড়বে কি না বল?
না নড়ব না।
দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। আমরা ছোটবেলায় চড়তাম। একটা বেতো ঘোড়া আছে। নড়েচড়ে না।
বাবু হাসিমুখে বলল, আপনার ছোটবেলার ঘোড়া সেটা কি আর এখনো আছে? মরে ভূত হয়ে গেছে।
