ভেতরের দিকে দরজা খোলার শব্দ হচ্ছে। মামা জেগেছেন। বারান্দার ইজিচেয়ারে তিনি এখন বসে থাকেন। রাত তিনটা সাড়ে তিনটার দিকে তিনি জেগে ওঠেন। তারপর তার ঘুম হয় না। বুড়ো বয়সের কত রকম সমস্যা। কিংবা কে জানে এটা হয়ত তেমন কোনো সমস্যা নয়; বুড়োদের হয়ত জেগে থাকতেই ভাল লাগে। মামা আজ ইজিচেয়ারে শুয়ে নেই। হাঁটাহাঁটি করছেন। সাড়ে তিনটা কি বেজে গেছে? মুনা ঘড়ি দেখতে চেষ্টা করল। আগের ঘড়িটায় অন্ধকারে সময় দেখা যেত। এটাতে দেখা যায় না। রেডিয়াম ডায়াল নেই। বাতি জ্বালাতে হবে। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকার চেয়ে বাতি জ্বালিয়ে ঘড়িটা দেখা যেতে পারে। কিছুক্ষণ গল্প করা যেতে পারে মামার সঙ্গে।
শওকত সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, তুই এখনো জেগে? মুনা মাথা নাড়ল।
প্রায়ই জেগে থাকিস নাকি? বাতি জ্বালা দেখি।
হুঁ থাকি।
শরীর ঠিক আছে তো?
হুঁ আছে।
একটা চেয়ার এনে আমার কাছে বাস তো দেখি।
না মামা, আমি এখন শুয়ে পড়ব। ঘুম আসছে।
পাঁচ-দশ মিনিট বাস।
মুনা চেয়ার নিয়ে এল। শওকত সাহেব মুনার পিঠে হাত রেখে কোমল স্বরে বললেন, শুনলাম অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিস। কি হয়েছে?
কিছু হয়নি। হবে কি? শরীরটা খারাপ তাই ছুটি নিলাম।
মামুনকে তো আর এ বাড়িতে আসতে দেখি না।
আমি আসতে নিষেধ করেছি। তাই আসে না। মামা, তোমাকে তো একবার বলেছি। ওকে আমি এখন পছন্দ করি না। ঐ প্রসঙ্গ থাক।
একটা মানুষকে এত দিন ধরে পছন্দ করে আসছিস। বিয়ে ঠিকঠাক। এখন হঠাৎ করে…।
মামা, ঐ প্রসঙ্গ বাদ দাও।
বাদ দেব কেন? জানতেও পারব না?
না পারবে না? এত জেনে কি করবে? বেশি জানা ভাল না। মুনা হাসতে চেষ্টা করল। তার ইচ্ছে করছে উঠে চলে যেতে। কিন্তু যেতে পারছে না। কারণ মামা তার পিঠে হাত দিয়ে রেখেছেন। পিঠ থেকে হাত নামিয়ে উঠে চলে যাওয়া যায় না।
মামুনকে একবার আসতে বলিস। ওর সঙ্গে কথা বলব।
মামা, পিঠ থেকে হাত নামাও আমি এখন ঘুমুতে যাব।
এখন আর ঘুমিয়ে কি কারবি। ভোর তো হয়ে গেল। তোর তো অফিসও নেই। আয় গল্প করে সারারাত কাটিয়ে দেই।
কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব। চোখ জ্বালা করছে।
শওকত সাহেব হাত নামিয়ে নিলেন। তার নিজেরও কেমন ঝিমুনী এসে যাচ্ছে। বয়স হয়ে যাচ্ছে। একটা বয়সের পর সবাই খুব ঝিমুতে পছন্দ করে। ঝিমুনোর মত বয়স কি তার হয়েছে? রিটায়ারমেন্টের এখনো তিন বছর বাকি। বরুণ বাবুরও তিন বছর বাকি রিটায়ারমেন্টের। কিন্তু এখনো তাকে জোয়ান বলে মনে হয়। জুলপির কাছে কিছু চুল পাকা ছাড়া মাথার সব চুল কালো। ঝিমুতে ঝিমুতে শওকত সাহেব একসময় সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়লেন।
তাকে ডেকে তুলল। বকুল। তিনি দেখলেন রোদে চারদিক ঝলমল করছে। এত বেলা হয়ে গেছে। তিনি কল্পনাও করেননি।
ক’টা বাজে রে?
দশটা।
কি সর্বনাশ! আগে ডাকিসনি কেন?
মুনা আপা নিষেধ করে গিয়েছে।
নিষেধ করলেই হল? আমার কি অফিস-টফিস নেই?
শওকত সাহেব অসম্ভব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যে ভাবেই হোক এগারটার আগে অফিসে পৌঁছতে হবে। বড় সাহেব এগারটার সময় আসেন। এসেই একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে যান। কে কে এখনো আসেনি সেটা মনে মনে নোট করেন।
বকুল!
জি।
মুনাকে ডেকে আন।
আপা তো বের হয়ে গেছে।
কোথায় গেছে? অফিস থেকে তো ছুটি নিয়েছে শুনলাম।
কোথায় গেছে জানি না বাবা। কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
জিজ্ঞেস করিাসনি কেন?
কাল জিজ্ঞেস করেছিলাম তাতে খুব রেগে গেল।
রাগলে রাগবে। রোজ জিজ্ঞেস করবি। ওর ব্যাপারটা কি?
জানি না বাবা।
জানি না বললে তো হবে না। জানতে হবে।
মুনা কাঁধে কালো ব্যাগ ঝুঁলিয়ে হাঁটছে। ক’দিন ধরেই সে এ রকম করছে। উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটা। কোনো একটি দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানো তারপর আবার হাঁটা।
আকাশে গানগনে সূৰ্য। ঘামে মুনার মুখ চটচট করছে কিন্তু ভাল লাগছে হাঁটতে। মনে হচ্ছে কোথাও কোনো বন্ধন নেই। অফিসের তাড়া নেই। ঘর ফেরার আকর্ষণ নেই। শুধু হেঁটে বেড়ানো।
মুনা এগারটার সময় রিকশা নিয়ে নিল। যাবে যাত্রাবাড়ি। যাত্রাবাড়িতে তার এক চাচা থাকেন–মনিব চাচা। তার সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ নেই। হঠাৎ করেই তার কথা মনে পড়ল। মুনার দুঃসময়ে তিনি কোনো রকম দায়িত্ব নেননি। মুখ শুকনো করে বলেছিলেন, নিজের ছেলেমেয়েই মানুষ করতে পারি না। আর অন্যের মেয়ে মানুষ করব কি ভাবে? অসম্ভব। মেয়ের মামারা আছে তারা দেখুক। আমি গরিব মানুষ। নিজের চলে না।
মনিব সাহেব বাড়িতেই ছিলেন। তিনি মুনাকে দেখে খুবই অবাক হলেন। ভারী গলায় বললেন, কি রে তুই কি মনে করে? ভাল আছিস?
ভালই আছি। আপনি কেমন আছেন?
আর আমার থাকা। ব্লাড প্রেসার, নড়তে-চড়তে পারি না।
আপনি একা নাকি? আর কেউ নেই?
আছে সবাই আছে যা ভেতরে যা।
সবাই যথেষ্ট খাতির-যত্ন করল। চাচি মুনাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেক দুঃখের কথা বললেন। বড় ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। বেঁটা মিচকা শয়তান। এর কথা তাকে লাগাচ্ছে তার কথা ওকে লাগাচ্ছে। বড় মেয়ের এখনো বিয়ে হয়নি। কিন্তু ছোটটা বিয়ে করে ফেলেছে। তার একটা বাচ্চাও আছে। জামাইয়ের কোনো চাকরি-বাকরি নাই। শ্বশুর বাড়িতে থাকে। মুরুব্বিদের সামনে সিগারেট খায়। হায়া-শরম কিছুই নাই। আদব-কায়দা তো নাই-ই।
মুনা অবাক হয়ে লক্ষ্য করল কেউ তার কথা বিশেষ জানতে চাচ্ছে না। সবাই নিজেদের সমস্যা বলতে ব্যস্ত। অন্যের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই। মুনা থাকতে থাকতেই ছোট মেয়ে তার স্বামীর সঙ্গে একটা কুৎসিত ঝগড়া করে ফেলল। তুই-তুকারি গালিগালাজ বিশ্ৰী কাণ্ড। বাইরের একজন মানুষ আছে। এ নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়। অন্যদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে যাবে।
