বাড়ির মানুষজনের মধ্যে নতুন বৌটিকেই বরং ভাল লাগল। তাকে মোটেই মিচকা শয়তান বলে মনে হল না। কথাবার্তা চমৎকার। বেশ বুদ্ধিাশুদ্ধি আছে। মুনাকে তার ঘরে নিয়ে চা বানিয়ে খাওয়ালো। এই ছোট একটুখানি ঘরে চায়ের সরঞ্জাম এবং কেরোসিন কুকার।
বুঝলেন আপা, এই সংসারে কিছুদিন থাকলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আলাদা যে বাসা করব সে উপায়ও নেই। ও যা টাকা-পয়সা পায় তাতে সকলের নাশতার খরচটাই ওঠে না।
করে কি সে?
সিনেমায় ছোটখাটো পার্ট করে।
বল কি?
হুঁ। বেশির ভাগ গুণ্ডার পার্ট পায়। মাথা কামিয়ে অভিনয় করতে হয়।
মুনা বড়ই অবাক হল। তার ধারণা ছিল না। আত্মীয়দের মধ্যে কেউ সিনেমায় অভিনয় করে।
সংসার চলে কিভাবে?
চলে কোথায়? চলে না। দেশ থেকে চাল-ডাল আসে। বাবা টুকটাক কিছু ব্যবসা করেন। এখন অসুখে পড়ে সেই ব্যবসার খুব খারাপ অবস্থা। কি যে হবে ভাবতেও পারি না।
মুনাকে দুপুর বেলা খেয়ে তারপর আসতে হল। খাবার আয়োজন বেশ ভাল। মাছ, গোসত ভাজাভুজি। অনেক কয়টা পদ। বুঝাই যাচ্ছে এটা বিশেষ করে তার জন্যেই করা।
খাওয়া শেষ হবার পর মবিন চাচা নিজেই তাকে রিকশায় উঠিয়ে দিতে এলেন, তোর খোঁজখবর নেই মা! নেবার মত অবস্থা আমার না। নরকে বাস করি বুঝলি। ছেলে বিয়ে দিয়ে ডাইনি। ঘরে এমেছি। সব ছারখার করে দিচ্ছে। এমনি তো খুব মিষ্টি কথাবার্তা। কিন্তু আসলে বিষকন্যা। আসিস মাঝে-মধ্যে। তোর কথা মনে হয় প্রায়ই। ঐদিনও তোর চাচিকে বলছিলাম।
রিকশা ছুটে চলেছে। মুনার ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। বেশ কষ্ট করে তাকে জেগে থাকতে হচ্ছে। আগামীকাল কোথায় যাওয়া যায়। তাই ভাবতে ভাবতে মুনার ঘুম ভাঙাবার চেষ্টা করতে লাগল।
মামুনের মন খারাপ হয়ে গেল
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মামুনের মন খারাপ হয়ে গেল।
শার্টের পকেটের কাছে এক পয়সার সাইজের একটা ফুটো তেলাপোকার কাণ্ড। এই শার্ট গায়ে দিয়ে বেরুনো যাবে না। সবাই তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু বদলে অন্য কিছু পরতেও ইচ্ছা করছে। না। এটা মুনার পছন্দ করে কিনে দেয়া শার্ট। মামুন ভেবে রেখেছিল ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলেই এটাই পরবে। তাতে মুনার উপর এক ধরনে মানসিক চাপ তৈরি হবে। লাল স্ট্রাইপের এই শার্ট নিঃশব্দে সারাক্ষণ বলবে।–মুনা, তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে ভালবাসি। মেয়েদের মনস্তত্ত্বে ছেলেমানুষী একটা ব্যাপার আছে। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী মেয়েরাও এ ধরনের হালকা জিনিস পছন্দ করে।
কিন্তু এটা পরে কী খাওয়া যাবে? ফুটোটা বেশ বড়। সাদা গেঞ্জি দেখা যায়। মামুন আয়নার সামনে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে মন ঠিক করল। থাকুক ফুটো। এতে একটা সুবিধা পাওয়া যাবে। মুনা এক সময় নিশ্চিত বলবে ১ পকেটের ওখানে কি? সে তখন মুখ কালো করে বলবে হৃদয়ের কাছাকাছি ফুটো হয়ে আছে। খুবই হালকা ধরনের কথা। তবে হালকা ধরনের কথাবার্তাও মাঝে মাঝে শুনতে ভাল লাগে।
মামুন মুনার অফিসে ঢুকে আকাশ থেকে পড়ল। মুনা নেই। সে নাকি দুমাসের ছুটি নিয়েছে। আজ নিয়ে পাঁচ দিন হল। কিন্তু অদ্ভুত কথা! পাল বাবু চোখ কপালে তুলে বলবেন, সে কী আপনি জানেন না?
জি না, জানি না।
বলেন কি? কেন জানেন না?
মামুন বিরক্ত হয়ে বলল, আমাকে বলেনি। তাই জানি না।
কিন্তু আপনাকে বলবে না কেন? হোয়াই? ঝগড়া চলছে নাকি?
না কিছু চলছে না।
বিরক্তিতে মামুনের চোখ সরু হয়ে গেল। পাল বাবু তার বিরক্তিকে মোটেও আমল দিলেন না। জোর করে তাকে ক্যান্টিনে নিয়ে আলুর চাপ এবং চায়ের অর্ডার দিয়ে বসলেন। মামুন শুকনো গলায় বলল, খামোকা এসব আনছেন। আমি কিছুই খাব না।
না খেলে না খাবেন। আমার সঙ্গে দুমিনিট বসতে তো অসুবিধা নেই। আরাম করে বসুন এবং ধীরে-সুস্থে বলুন ব্যাপারটা কি? ঝগড়াটা কি নিয়ে করলেন?
ঝগড়া হয়েছে আপনাকে কে বলল?
এসব বলার দরকার হয় না। আপনার চোখে-মুখে পরিষ্কার লেখা আছে। মান-অভিমানপর্ব বোঝা যায়। হা হা হা।
মামুন কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল। আগে এই লোকটিকে ভালই লাগত। আজ কেমন গ্ৰাম্য লাগছে। কথার ফাঁকে থুথুর কণা ছিটকে আসছে। কিছু কিছু নিশ্চয়ই পড়েছে চায়ের কাঁপে এবং আলুর চাপে। কুৎসিত দৃশ্য। সহ্য করা মুশকিল। মামুন সাহেব।
বলুন।
রাগ ভাঙবার বুদ্ধি আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। সোজা বুদ্ধি। জটিল সমস্যা গুলি সলভ করতে হয় সহজ বুদ্ধি দিয়ে। কঠিন বুদ্ধি খরচ করলে সমস্যটা আরো জট পাকিয়ে যাবে। চা খাচ্ছেন না। তো। ঠাণ্ডা হচ্ছে।
হোক ঠাণ্ডা। দুপুরে আমি চা খাই না।
তাহলে ঠাণ্ডা কিছু খান–লাচ্ছি আছে। এই ইনাকে ভাল করে লাচ্ছি দাও।
আপনি শুধু শুধু ব্যস্ত হচ্ছেন আমি কিছুই খাব না।
আরে ভাই খান। খেতে খেতে আমার বুদ্ধিটা শুনুন। কিছু না যাবেন, সোজাসুজি পায়ে ধরে ফেলবেন এবং কান্না কান্না গলায় বলবেন ক্ষমা চাই।
রাগে মামুনের গা জ্বলে গেল। কি রকম ইডিওটিক কথাবার্তা। এ ধরনের কথাবার্তা একজন শিক্ষিত মানুষ বলে কি করে?
বুঝলেন মামুন সাহেব, এপ্রোচটা নাটকীয় কিন্তু এর নাম হচ্ছে কোরামিন ইনজেকশান। এটাতেই রোগের আরাম হবে। আর যদি কাজ না হয় তাহলে আপনি অফিসে এসে আমার ডান গালে একটা চড় দিয়ে যাবেন। হা হা হা।
এখানে বসে সময় নষ্ট করার আর কোনো মানে হয় না। যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণই এর বকবকানি শুনতে হবে।
উঠলেন নাকি?
জি উঠলাম।
লাচ্ছি। তো মুখেই দিলেন না।
