বটতলার ঘাট থেকে মাছহাটির ভেতর দিয়ে তমিজ ঘাড়ে করে কাঠের আলনা নিয়ে যাচ্ছে কাঠপট্টির দিকে, তো হুরমতুল্লার সঙ্গে দেখা। ক্যা রে, তমিজ, হামার জাময়ে দেখছিলু?
তোমার জামাই? কেটা? ও কেরামত? উঁই তো তামাম দিন মেলার মদ্যেই।
কেরামতেক মাছ কিনবার দেখিছু?
না তো। মাছহাটির দিকে কেরামতকে তমিজ কৈ একবারো তো দেখে নি। অথচ, হুরমতুল্লা জানায়, মেলা দেখতে হুরমতুল্লা তাকে পুরো চারটা টাকা দিয়েছে। তার আশা, জামাই ভালো দেখে যমুনার একটা রুই কি কাৎলাহার বিলের এক কুড়ি পাবদা কিনবে। তা হলে হুরমতুল্লাকে খালি খালি মাছ কিনতে পয়সা নষ্ট করতে হয় না। তা সেদিকে কি আর তার গুণধর জামাইয়ের কোনো খেয়াল আছে? যুধিষ্ঠিরের কাছে তমিজ কয়েকবার শুনলো, কেরামত খালি ঘোরাফেরা করছে সার্কাসের আশেপাশে আর সার্কাসের তাঁবুর পেছনে মেলার মাঠের একেবারে উত্তরে চাটাইয়ের বেড়ার ওধারে। আলনা কাঁধে দাঁড়াতে একটু কষ্ট হলেও তমিজ ইচ্ছা করেই বলে, তোমার জামাই শুনলাম ঐদিকে আছে। দেখো, ঐ বেড়ার দিকে উটকাও। তা সেদিকে আর হুরমতুল্লা যায় কী করে? হুরমতুল্লার অন্ধকার মুখ দেখে তমিজ খুশি হয়ে ফের বলে, ঐ তো তাম্বুর ওটি না হয়–।
হুরমতুল্লা আর দাঁড়ায় না। সে ঘুরছিলো দশরথের সঙ্গে। দশরথ কর্মকারও নিজের জামাইয়ের ওপর একটুও প্রসন্ন নয়। সারা বছর কোনো যোগাযোগ রাখে না, যুধিষ্ঠিরের মা মরার আগে মেয়েকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে উঠলো, চণ্ডাল জামাই শাশুড়ির মরার খবর না পাওয়া পর্যন্ত বৌটাকে আসতেই দিলো না। আবার দেখো, সন্ন্যাসীর মেলা লাগার তিন দিন আগে এসে হাজির একেবারে গুষ্টিশুদ্ধ। বোন বোনাইকে পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। জামাইকে ধুতি দাও, তার বোনাইকে ধুতি দাও, মেয়েদের শাড়ি দাও। হ্যান দাও ত্যান দাও। দুই সন্ধ্যা মাছ দিয়ে ভাত খাওয়াও, পিঠা বানাও, পায়েস করো। আবার মেলার দিন জামাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে নগদ সাতটা টাকা। যুধিষ্ঠির দেখে এসেছে, জামাইবাবু তার বসে গেছে জুয়ার আসরে। মাছ কি দৈ কিছুই কেনে নি, কেনার কোনো আশাও নাই।
দশরথ ও হুরমতুল্লা নিজের নিজের জামাইয়ের কীর্তি সবটাই পরস্পরকে না বললেও নিজেদের কপালের দোষ দেয়। দুজনে একসঙ্গে জিলেপির দোকানে ঢোকে এবং একই আক্ষেপে একেকজন অন্তত আধ সের করে জিলেপি খায়।
সার্কাসের তাঁবুর ওপারে বাঁশের নতুন বেড়া চোখে পড়ে আর তমিজের মেজাজটাও খিচড়ে আসে, সে কি অন্তত একবার ঐ জায়গাটা ঘুরে আসতে পারে না? এতো খাটনি যাচ্ছে, একটু ফুর্তি করবে না?
তা সন্ধেবেলা কাঠ বইবার সুযোগ কম, এদিক ওদিক তাকিয়ে তমিজ সেখানে একবার গিয়েছিলো বৈ কি। নতুন বাঁশের দরজা ভেজানো, ঝোঁকের মাথায় তমিজ একটু ঠেলতেই খুলে গেলো। ভেতরে জনাচারেক মানুষ। গলা শোনা যায় কেরামত আলির। সুর করে সে গাইছে,
লাল ভুগাজুগ কুসুমলটি নাকে তাহার তিনটি খুঁটি গাড়া।
সেই পুরুষের সবই বিৰ্থা যে দিলো না তার দুয়ারে পাড়া।।
কেরামত আলি আসর জমিয়ে রেখেছে দেখে তমিজের বুকে ছোটো একটি কাঁটা। বেঁধে : শালা এই মানুষটা যেখানেই যায়, কেবল শোলোক বেঁধে বেঁধেই সবাইকে মাত করে রাখে। তবে তমিজের বুকের কাটাটা ছিলো একটি কাটার কুঁড়ি, ফোঁটার আগেই বিনাশ ঘটে অঙ্কুরেই। হাজার হলেও মানুষটা কেরামত আলি, আবদুল কাদেরের সভায় এর গান শুনে সেদিন তমিজ কেমন চাঙা হয়ে উঠেছিলো। তাকে দেখে কেরামত চিৎকার করে ওঠে, আরে তুমি? আসো আসো। ও কুসুম, কুসুমরানী, কুটুম্ব আসিছে ঘরত। বসবার দাও গো, পান দাও, তামুক সাজো।
মেঝেতে সতরঞ্চির ওপর চাদর পেতে বসা সবারই পরনে ফর্সা ধুতি, গায়ে জড়ানো শাল। একজনের গায়ে কালো কোট, তবে নিচে ধুতি। কেরামতও ধুতি পরে এসেছে, তাকে রীতিমতো ভদ্দরলোকের মতো দেখায়। লাঠিডাঙা কাচারির এক কর্মচারীর পাশে বসে থাকা রোগাপটকা মেয়েটির মস্ত উঁচু বুক দেখে তমিজ থতমত খায়, আবার তাকে তো কেউ বসতেও বলে না। আর বললেই বা সে বসে কী করে? দাঁড়িয়ে থাকতেও তার পা কাঁপে। এখন ভরসা কেরামত আলি। কেরামত আলির চোখ দুটি তার নয়নতারা, রসিক নাগর পাগলপারা কথাগুলি তার সারা গায়ে বিলি কেটে দেয়, তার মাথায় সে পায় কাঁচা শুপারি খাবার আমেজ। কেরামত আলি যখন আছে, সেই যখন এখানকার গায়ক, তখন বোধহয় ফরাসে না হলেও অন্তত মাটিতে বসা যায়, তমিজ এরকম ভাবছে এমন সময় কেরামত গেয়ে ওঠে, সে আমারে ডেকে নিলো, তিতা মিঠা পান খাওয়ালো, পান খাওয়ালো, তিতা মিঠা পান খাওয়ালো। কাছারির কর্মচারী হেসে উঠলে সবাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে এবং একজন হাসতে হাসতেই বলে, পানও বলে তিতা হয়? কবি হামাগোরে কতো কথাই কবার পারে গো! সবার হাসি ও একজনের তারিফের কথায় সায় দিয়ে তমিজ হাসতে চেষ্টা করে, কিন্তু সাহস পায় না। তবে আরেকটু এগিয়ে দাঁড়ায়। সবার হাসি ও তারিফে কেরামত একটু মাথা নুয়ে হেসে দ্বিগুণ বেগে গান চড়ায়,
নাগর হলো মাঝির বেটা তারে এখন বোঝায় কেটা
কুসুমরানীর আধমণি বুক ধরা তো নয় মাছটি মারা।
বিশসেরি বুক ধরা তো নয় বেড়জালে বাঘাড়টি ধরা।।
লোকজনের প্রবল, হাসিতে তমিজের শরীর থেকে বিলি কাটা গান সম্পূর্ণ ঝরে পড়ে এবং ঐ গানই সমবেত হাসির দমক হয়ে ধাক্কা দিয়ে তাকে বার করে দেয় ঘর থেকে। বাঁশের দুয়ার ঠেলে বেরিয়ে আসতে আসতে তমিজ শোনে সবার প্রবল হাসি ছাপিয়ে উঠছে কেরামতের গানের পরের কলিটি, লটির পাওনা ফাঁকি দিলো মাঝির বেটার কেমন ধারা?
